Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মার্চ, ২০১৯ ২৩:১৩

ঢাকার চারপাশে পাঁচ পাতাল রেল

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

ঢাকার চারপাশে পাঁচ পাতাল রেল

রাজধানীকে যানজটমুক্ত করার পাশাপাশি সহজে ও স্বল্প সময়ে যোগাযোগ সুবিধা চালু করতে চারদিক দিয়ে অন্তত পাঁচটি পাতাল রুট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এর মধ্যে প্রথম পাতাল রেলের প্রস্তাবিত রুট ‘এমআরটি লাইন-১’ হবে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। এই লাইনের আরেকটি অংশ থাকবে মাটির উপর দিয়ে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত। দুই অংশের এই পুরো প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। অর্থায়ন করবে জাপান সরকার। আগামী জুনে এ বিষয়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)’র সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। একই মাসে অনুমোদন হতে পারে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব বা ডিপিপি। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমটিসিএল’র।

‘এমআরটি লাইন-১’-এর প্রকল্প পরিচালক সায়েদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক কার্যক্রমগুলো চলছে। আগামী জুনে নির্মাণ কাজের ডিপিপি অনুমোদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর দরপত্র আহ্বান করা হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে আমরা ডিপো নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রথম পাতাল রেলের নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করব। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের পিতলগঞ্জে এমআরটি লাইন-১ এর ডিপো নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি। প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, এরই মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এর সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ এবং পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা শেষ হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গত অক্টোবরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। ৯ ডিসেম্বর থেকে তারা প্রকল্পের নকশা প্রণয়নসহ সংশ্লিষ্ট কাজ শুরু করেছে। আনুষঙ্গিক এসব কাজ শেষ হলেই নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছি। ডিএমটিসিএল’র কর্মকর্তারা জানান, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের পুরোটাই জাপান থেকে পাওয়া যাবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে সরকারকে। ম্যাচিং ফান্ড হিসেবে স্থানীয়ভাবে কিছু তহবিল সংযুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে আগামী জুনে জাইকার সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। ইআরডি এ বিষয়ে কাজ করছে।

জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) আমেরিকা ও জাপান উইংয়ের চিফ, অতিরিক্ত সচিব শহীদুল ইসলাম বলেন, আগামী জুনেই জাইকার সঙ্গে ৪০তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে অর্থায়নে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে। ভূ-গর্ভস্থ এই রেললাইন নির্মাণে ঋণ সহায়তা দিতে সম্মতি দিয়েছে জাপান। জুনের ২য় অথবা ৩য় সপ্তাহের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জানা গেছে, ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১-এর দুটি অংশ হলো- বিমানবন্দর রুট এবং পূর্বাচল রুট। এর মধ্যে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল রুটটি হবে মাটির নিচ দিয়ে। এ রুটেই বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল বা পাতাল রেল রুট নির্মিত হতে যাচ্ছে। অন্য অংশ পূর্বাচল থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে রুটটি হবে এলিভেটেড অর্থাৎ মাটির উপর দিয়ে উড়াল রুট। বিমানবন্দর অংশের রুটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে শুরু করে বিমানবন্দর টার্মিনাল ৩ (নির্মিতব্য), খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর যাবে। সম্পূর্ন আন্ডারগ্রাউন্ড এই রুটে ১২টি  স্টেশন থাকবে। যার মধ্যে নতুন বাজার স্টেশনে এমআরটি লাইন-৫ এর সঙ্গে এই রুটের আন্তঃসংযোগ থাকবে। ‘এমআরটি লাইন-১’ এর পূর্বাচলগামী অংশটি নতুন বাজার  থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা হয়ে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, মাস্তুল, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল সেক্টর-৭ হয়ে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ পূর্বাচল রুটে বিমানবন্দর রুটের অন্তর্ভুক্ত নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচার পার্কের আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন দুটিসহ মোট স্টেশন থাকবে ৯টি। এর মধ্যে বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত ৭টি স্টেশন হবে এলিভেটেড। কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত ‘এমআরটি লাইন-১’ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডিএমটিসিএল-এর অধীনে নির্মিত পাঁচটি ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটি লাইনগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। ‘এমআরটি লাইন-৬’ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেল খ্যাত এই প্রকল্পটির কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ‘এমআরটি লাইন-১’ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল বা পাতাল রেলের কাজ শুরু করেছে ডিএমটিসিএল। ডিএমটিসিএল’র ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর খান মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রথম লাইনটি (এমআরটি লাইন-৬) ছাড়া আর বাকি যে লাইনগুলো হবে তার সবই আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থাৎ মাটির নিচ দিয়ে পাতাল রেল রুট থাকবে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প ছাড়া রাজধানীর চারপাশে অন্য যে আন্ডারগ্রাউন্ড ও এলিভেটেড মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে সেগুলো হচ্ছে- হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট), গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট), গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত এমআরটি লাইন-২ এবং কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৪। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ডিএমটিসিএল’র এই কর্মকর্তা। এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান) রুট : হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই রুটটির ১৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার হবে পাতাল রুট; বাকি ৬ কিলোমিটার হবে এলিভেটেড রুট। এই রুটে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই রুট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে ডিএমটিসিএল’র কর্মকর্তারা জানান। 

এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন) রুট : গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এই মেট্রোরেল রুটটিও আন্ডারগ্রাউন্ড এবং এলিভেটেড দুই ধরনের রুট হবে। এতে ১৭টি স্টেশন থাকবে। এই রুটের ডিপো ও কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে ঢাকা জেলার নাসিরবাদ ইউনিয়নের গজারিয়া মৌজার দাশেরকান্দি এলাকায় ৪০ হেক্টর ভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পটি নির্মাণে প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমটিসিএল-এর। এমআরটি লাইন-২ : ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত এই মেট্রোরেল রুটটিও হবে মাটির নিচ ও মাটির ওপর দিয়ে। প্রায় ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই রুট জি টু জি ভিত্তিতে নির্মাণের জন্য জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে সরকার। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এর স্টেশন সংখ্যা এবং কতটা পাতাল রুট ও কতটা এলিভেটেড হবে তা চূড়ান্ত করা হবে। এ ছাড়া এমআরটি লাইন-৪ প্রকল্প শিরোনামে কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে ট্র্যাকের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পাতাল রেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা খোঁজা হচ্ছে বলে জানান ডিএমটিসিএল’র কর্মকর্তারা। 


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর