শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:২১

প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার প্রকল্পে বাধা শ্রমিক লীগ নেতা

অভিযোগ সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতর ও বিআইডব্লিউটিএ’র

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার প্রকল্পে বাধা শ্রমিক লীগ নেতা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছার প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ। সরকারি দফতরের পাশাপাশি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে একাধিক জিডি ও মামলা হলেও থামানো যাচ্ছে না এই শ্রমিক নেতাকে। রিট, মামলা দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ৪০৩ কোটি টাকার গণপূর্ত অধিদফতরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্পের কাজ। তবে আদালত সব অভিযোগ খারিজ করে দিলেও রহস্যজনকভাবে থেমে গেছে প্রকল্পের কাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট লাঘব করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সদিচ্ছায় একটি প্রকল্প হাতে নেয় গণপূর্ত অধিদফতর। ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় ‘সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৮টি ১৫তলা ভবনে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ২২ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এ অনুমোদন করা হয়। পরের বছর ২৯ মার্চ এই প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ শুরু করে সরকার। প্রায় ৪০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ, ৪টি খেলার  মাঠ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টারসহ অনেক কিছুই। কিন্তু এই কাজটিতে বাধা হয়ে দাঁড়ান ফতুল্লার শ্রমিক লীগের নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ। জানা গেছে, গত বছরের ৫ মে ফতুল্লা পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে পলাশের বিরুদ্ধে জিডি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর। এ ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেও গত বছরই পলাশের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এ ছাড়াও ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর প্রকল্প কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ফতুল্লা থানায় একটি জিডি করেন। (জিডি নং-৬৩৫) করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি)। কিন্তু পুলিশ ওই সময় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। পরে প্রকল্পের কাজে বাধা, প্রাণনাশের হুমকি ও মালামাল লুটের অভিযোগ এনে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে গণপূর্ত বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষে উপ সহকারী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান ২০১৮ সালের ৩ মে ফতুল্লা থানায় অপর একটি সাধারণ ডায়েরি (নং ১১৯) করেন। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি) এর পক্ষ থেকে পুনরায় ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট প্রকল্পে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে জিডি করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সরকারি দফতর ও প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এতগুলো জিডির বিপরীতে পলাশ বা তার লোকজনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, প্রকল্পের বিরুদ্ধে আলীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ, ২য় আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি রিট করা হয়েছিল। ওই নিষেধাজ্ঞার আবেদনটি আদালত খারিজ করে দেয়। কাউসার আহমেদ পলাশ নিজেই বাদী হয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রিট করেছিলেন ২০১৬ সালে। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর ওই রিটটি খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির কারণে এই প্রকল্পের কাজ আটকে আছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

কে এই পলাশ? : বিআইডব্লিউটিএ সূত্র মতে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর বেশির ভাগই দখলে রেখে অবৈধ ইট বালু পাথরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন কাউসার আহমেদ পলাশ। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত  বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল। ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও ফল হয়নি। শুধু ফতুল্লাতেই কাগজ-কলম সর্বস্ব ৭৪টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। এসব শ্রমিক সংগঠনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত দেড় যুগে কানাডিয়ান নাগরিকের মালিকানাধীন র‌্যাডিকেল গার্মেন্ট, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর মালিকানাধীন গার্মেন্ট হামিদ ফ্যাশন, পাইওনিয়ার সোয়েটার, আর এস সোয়েটার, মিশওয়ার হোসিয়ারি, এন আর নিটিং, মাইক্রো ফাইবার, মেট্রো নিটের মতো প্রায় অর্ধশত গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে গেছে। নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউসার আহমেদ পলাশ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পিডব্লিউডি, বিআইডব্লিউটিসি এরা সবাই ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছে। আমার রিট ছিল কাজ বন্ধ করার জন্য নয়। জনসাধারণের জন্য খেলার মাঠের বরাদ্দ রাখার জন্য। হাই কোর্টও আদেশ দিয়েছেন উন্মুক্ত এবং পর্যাপ্ত খোলা মাঠ রেখে অথবা মিনি স্টেডিয়াম রেখে কাজ করার জন্য। পিডব্লিউডি এফিডেভিট করে জবাব দিয়েছে তারা সাড়ে চার একর জায়গা খেলার মাঠের জন্য রেখেছে। তবে আমরা এই জায়গা বুঝে পাইনি। এক পর্যায়ে পিডব্লিউডি বলছে, ২ লাখ ভোল্টের টাওয়ারের নিচে নাকি তারা মাঠের জন্য জায়গা রেখেছে। এত হেভি ভোল্টের কারেন্টের নিচে আমাদের বাচ্চারা খেলবে কীভাবে? পরে আমরা নি¤œ আদালতে মামলা করি, হাই কোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করার জন্য। গার্মেন্টে চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদকে বলেন, আমি নিজে একজন শ্রমিক নেতা। ৭৪টি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আমি সরাসরি যুক্ত। গার্মেন্ট ওয়ার্কার ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আমি। এ কারণে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা আমার কাজ। আর শ্রমিকদের পক্ষে কথা বললে তো মালিকদের বিপক্ষে যাবেই। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লা গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এ ছাড়া পলাশের কোনো নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয়  দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন। ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয়, তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর