শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০

কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

কার্যকর হচ্ছে ব্রেক্সিট

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

প্রায় তিন বছর ধরে চলতে থাকা নানা টানাপড়েনের পর অবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে গেল ব্রিটেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ ৩১ জানুয়ারি থেকে ব্রেক্সিট কার্যকর হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে : ব্রিটেন তো বেরিয়ে যাচ্ছে, এখন দেশটিতে বাংলাদেশের প্রাপ্ত এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) অর্থাৎ অস্ত্র ব্যতীত সব পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার কী হবে? এজন্য কী যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হবে? নাকি ইইউ-এর নীতি অনুসারে বাংলাদেশকে ইবিএ সুবিধা দিয়ে যাবে দেশটি?

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্রেক্সিট নিয়ে এই প্রশ্নগুলো বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণটি হচ্ছে : যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পর তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় আসে যুক্তরাজ্য থেকে। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় আসে যুক্তরাজ্য থেকে, গত অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১৭ কোটি মার্কিন ডলার। ফলে কোনো কারণে দেশটিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা  বাধাগ্রস্ত হলে দেশের রপ্তানি আয়ে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে ব্রেক্সিটের প্রভাব নিয়ে ২০১৭ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল অর্থনীতিবিষয়ক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য কেমন বাণিজ্য শুল্ক নির্ধারণ করে, তা নিয়েও উদ্বেগের কারণ আছে বাংলাদেশের। সিঙ্গাপুরভিত্তিক অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ ভার্তি ভার্গাভা ওই সময় বলেছিলেন, ব্রেক্সিট যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে  সেটা বড়ই উদ্বেগের কারণ। এমনো হতে পাওে যে, নতুন চুক্তি সম্পাদনের আগে যুক্তরাজ্য সাময়িক সময়ের জন্য বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ করে দিল।’ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গণভোটের পরপরই বেশ কয়েকটি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশের ওপর ব্রেক্সিটের প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যার মধ্যে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) একটি। ‘বাংলাদেশ এবং অন্য উন্নয়নশীল দেশসমূহের ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট কী অর্থবহন করে শীর্ষক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেছিলেন, ‘ব্রেক্সিট কার্যকর হলে স্বল্পোন্নত দেশ এবং সাব-সাহারান দেশের মধ্যে বাংলাদেশই রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাবে রপ্তানি আয় কমতে পারে অন্তত ৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। মোট রপ্তানি আয় কমতে পারে প্রায় ১ শতাংশ। জিডিপি শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ হারে কমে যেতে পারে।’ তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়া নিয়ে তারা এখন আর খুব বেশি চিন্তিত নন। কারণ গত তিন বছরে বিষয়টি নিয়ে তারা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সভা-সেমিনার করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আলাপ-আলোচনাও করেছেন। দেশটি একাধিকবার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে, ইইউ- তে বাংলাদেশ বর্তমানে যে সুবিধা পাচ্ছে ব্রেক্সিট কার্যকর হলেও সেই সুবিধা দিয়ে যাবে যুক্তরাজ্য। এমনকি এ বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের একজন মন্ত্রী চিঠি পাঠিয়ে  ব্রেক্সিটের পরও বাংলাদেশের জন্য ইবিএ সুবিধা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন, তবে এক্ষেত্রে তারা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা চেয়েছেন। করপোরেট কর হার কমানোর বিষয়েও চাপ দিয়েছেন। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির কাছে এই চিঠিটি পাঠান যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রী ড. লিয়াম ফক্স। সেই চিঠিতেই তিনি জানান, তার দেশ ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশকে বর্তমানে প্রাপ্ত ইবিএ সুবিধা দেবে। তবে...। এই ‘তবে’-এর অর্থ হচ্ছে : এক্ষেত্রে তারাও কিছু সুবিধা চান বাংলাদেশের কাছে। কী ধরনের সুবিধা সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। চীনের পর বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ এই তথ্যটি উল্লেখ করে ড. লিয়াম ফক্স ওই চিঠিতে জানান, ২০১৮ সালে তার দেশ ৩৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে। তবে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরো বাণিজ্য বৈষম্য রয়েছে, যা বাংলাদেশের অনুকূলে। আর এই বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্রিটেনের মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাণিজ্য খাতে এই বৈষম্য কমাতেই তিনি চান বাংলাদেশে তাদের কোম্পানিগুলো আরও বেশি বিনিয়োগ করুক, যার জন্য দরকার শুল্ক ও কর বিষয়ে বিশেষ সুবিধা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. সেলিম রায়হান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর প্রথমে যে প্রশ্নটি ছিল : বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে ইইউ-এর মতো ইবিএ সুবিধা কার্যকর রাখবে কিনা? আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তখনকার প্রতিবেদনে রপ্তানি ও জিডিপি কমার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছিল। কারণ তখন বিষয়টি নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা ছিল। এখন এ বিষয়ে যদি ব্রিটেনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয় যে, তারা ইবিএ সুবিধা অব্যাহত রাখবে তবে আমি মনে করি রপ্তানি খাতে আপাতত ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তারপরও একটি বিষয় কিন্তু সরকারকে মনে রাখতে হবে, সেটি হলো : আপাতত সুবিধা অব্যাহত রাখলেও ব্রিটেনে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রচলিত সুবিধার জন্য বাংলাদেশকে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে সরকারের দও কষাকষির সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, ব্রিটেন যদি তাদের কোম্পানির এদেশে বিনিয়োগের জন্য কোনো সুবিধা চেয়েও থাকে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকার সেই সুযোগ দিতেই পারে। আমাদের ইকোনমিক জোনগুলোতে সেই সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর