শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ জুন, ২০২০ ২৩:৪৯

স্বাস্থ্যবিধি মানছে না গণপরিবহন

বাসে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি, কাউন্টারে নেই শারীরিক দূরত্ব, ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বাস্থ্যবিধি মানছে না গণপরিবহন
স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বাস কাউন্টারে লঞ্চে। পিকআপে করে যাত্রীবহন আমিনবাজারে -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ বিরতির পর চলতে শুরু করা লোকাল ও আন্তজেলা পরিবহনগুলোর বেশির ভাগই মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। শুরুতে ‘লোকদেখানো’ স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও পরে আর তোয়াক্কা করেনি বেশির ভাগ পরিবহনই। ঢাকার লোকাল বাসগুলোতে ওঠানামার ধাক্কাধাক্কি ছিল উদ্বেগজনক। এর বাইরে বর্ধিত ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডা ছিল দেশব্যাপীই।

মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। হেলপাররা আগের মতো জোর করে টেনে টেনে যাত্রী তুলছেন। এ সময় কোনো পরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা যায়নি। বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের ছিল হুড়োহুড়ি অবস্থা। মিডলাইন সার্ভিসের একটি বাসের চালকের সহকারী রুবেল হোসেনের বক্তব্য, ‘সোমবার আমরা আমাদের সব বাস জীবাণুমুক্ত করেছি। যাত্রীদের আমরা ধীরে বাসে উঠাচ্ছি এবং নামাচ্ছি। কিন্তু বাস স্টপে দাঁড়ালে যাত্রীরা বাসে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি করে, সেটাই চিন্তার বিষয়। আমরা তাদের লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠার জন্য অনুরোধ করলেও অধিকাংশ যাত্রী তা মানছেন না।’  গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় আসছে বাস। গাবতলী থেকেও ছেড়ে গেছে দূরপাল্লার বাস। তবে বাস টার্মিনালে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় রয়েছে। টিকিট কাউন্টারগুলোতে মানা হচ্ছে না শারীরিক দূরত্ব। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে টিকিট বিক্রির কথা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা কাজে আসছে না। সরকারি নির্দেশনায় বাসে ওঠার আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করার কথা। তবে অনেক বাস কাউন্টারে নামে মাত্র স্যানিটাইজার রাখা হয়েছে। এসব স্যানিটাইজার ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না আগত যাত্রীরা। যাত্রী উঠানোর আগে তার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করার যন্ত্র নেই অনেক বাসে।

তবে রাজধানী থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার পরিবহনগুলোতে এক সিটে যাত্রী, অপরটি ফাঁকা রেখে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এসব বাসে লাইন ধরে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রী উঠানো হয়। যাত্রীদের মাস্ক ছাড়া বাসে ওঠতে দেওয়া হয়নি। যাদের মাস্ক নেই, তাদেরকে পরিবহন থেকে একটি করে মাস্ক দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় ট্রিপের শুরুতে এবং শেষে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ির অভ্যন্তর ভাগসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করার কথা থাকলেও কোথাও তা চোখে পড়েনি। টার্মিনালে বাস আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফের নতুন করে যাত্রী তুলে আবার ট্রিপ দিচ্ছেন চালকরা। এমনকি নেমে যাওয়া যাত্রীর বসা সিটও পরিষ্কার করছে না তারা। এক সিট পরপর যাত্রী বসানো হলেও ওঠানামার সময় শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না। এমন কি বাসস্ট্যান্ড ছাড়া যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করাতে দেখা গেছে। ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়াতে দেখা গেছে অনেক বাসশ্রমিককে।

বাসচালক হেমায়েত উদ্দিন জানান, ট্রিপ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা তড়িঘড়ি করে ওঠে যাচ্ছেন। এতে আমরা বাস পরিষ্কার করার সময় পাচ্ছি না। অনেক দিন পর বাস নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। এখন অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস চালাতে হয়। তারপরও আমরা সবাইকে সতর্ক করছি। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে বলছি। মাস্ক না পরলে বাসে উঠতে দিই না। সব নিয়ম কি আর মেনে চলা সম্ভব। সাভার থেকে আসা যাত্রী মো. কামাল হোসেন জানান, বাসে এক সিট পরপর যাত্রী বসানো হয়। তবে বাসের সিটগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে না। একজন যাত্রী নামানোর পর সেই সিটে নতুন করে আরেকজনকে বসানো হয়। অনেক দিন পর বাস রাস্তায় নেমেছে। আগের ময়লা সিটের বাসগুলো এখনো দেখা যাচ্ছে। এর ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। ফার্মগেট এলাকায় দেখা গেছে, গণপরিবহন চললেও যাত্রীর চাপ তেমন নেই। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, সাধারণ মানুষও খুব বেশি পরিবহনে উঠছে না। যাদের একান্ত প্রয়োজন তারাই গণপরিবহন ব্যবহার করছেন। রাজধানীর সিটি কলেজ এলাকার তরঙ্গ বাসে ওঠার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী বলেন, খুব জরুরি কাজ আছে, তাই বাধ্য হয়েই বাসে উঠেছি। আসলে যেসব স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি পালন করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু বাসে দেখলাম যাত্রীরা অনেক হুড়োহুড়ি করে উঠছে। অনেকে বাসের মধ্যে দাঁড়িয়েও রয়েছেন। আবার কেউ কেউ দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠছেন। প্রথম দিন সকালে ‘লোকদেখানো’ স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও এরপর থেকে তার বালাই নেই।’

এদিকে খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ৬০ শতাংশেরও বেশি বাড়তি ভাড়া আদায় করায় খুলনা-বাগেরহাট রুটের নিউ নূপুর পরিবহনকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে এখানকার বাসগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে দেখা গেছে। মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শিমুলিয়া-ঢাকা রুটের বিভিন্ন পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এমনকি বাসের হেলপারদের যাত্রীদের হাত ধরে টানাটানি করতে দেখা গেছে। কাউন্টারগুলোতেও ছিল যাত্রীদের জটলা। বর্ধিত ভাড়া নিলেও আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা মানেনি অনেক বাস। পাশাপাশি দুই সিটেও যাত্রীরা বসছেন। পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পটুয়াখালীতে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এতে খুশি সাধারণ যাত্রীরা। বর্ধিত ভাড়া পেয়ে খুশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই জেলা সদর থেকে সব রুটে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ার বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল যাত্রীদের। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে রাজধানীর দারুস সালাম জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, করোনার কারণে গণপরিবহন চলাচলের জন্য সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছে তা যেন পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা মেনে চলেন, সেই বিষয়ে আমরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নজর রাখতে বলেছি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আমরা সব বাস মালিককে বলে দিয়েছি তারা যেন তাদের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি বলে দেন।  যদি কোনো পরিবহন স্বাস্থ্যবিধি না মানে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।

যা আছে স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনায় : সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যে ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো হলো- স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব ও শারীরিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বাস টার্মিনালে কোনোভাবেই ভিড় করা যাবে না। তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীরা গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়াবেন এবং টিকিট কাটবেন। স্টেশনে পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাসে কোনো যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারবেন না। বাসের সব সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। ২৫-৩০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। পরিবারের সদস্য হলে পাশের সিটে বসানো যাবে অন্যথায় নয়। যাত্রী, চালক, সহকারী, কাউন্টারের কর্মী সবার জন্য মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক। ট্রিপের শুরুতে এবং শেষে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ির অভ্যন্তর ভাগসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। যাত্রী ওঠানামার সময় শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীদের হাত ব্যাগ, মালামাল জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করতে হবে।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর