শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মার্চ, ২০২১ ২৩:৩৭

ট্রেনের ধাক্কা নয়, আঘাত ছিল ধারালো অস্ত্রের

মির্জা মেহেদী তমাল

ট্রেনের ধাক্কা নয়, আঘাত ছিল ধারালো অস্ত্রের

লাকসামের পদুয়া গ্রাম। গাছ-গাছালিতে ছাওয়া এই গ্রামে ঝুপ করেই সন্ধ্যা নামে। লোকজনের চলাচল অনেকটাই কমে যায়। এক সন্ধ্যায় গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইনের কাছে বেশ হট্টগোল। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে কয়েকজন চিৎকার করছিলেন। চিৎকার শুনে গ্রামের কয়েক ব্যক্তি রেললাইনের দিকে ছুটতে থাকে। তারা দেখতে পান রক্তাক্ত এক তরুণকে ৪/৫ জন ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। সেই লোকজনই চিৎকার করছিল ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে। তারা বলছিলেন, ট্রেনের ধাক্কায় তরুণটি আহত হয়ে পড়ে ছিলেন। তারা তাকে সাহায্য করছে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য। ছুটে আসা গ্রামবাসীও রক্তাক্ত তরুণটিকে বয়ে নিতে সাহায্য করতে থাকে। কিন্তু তরুণটিকে জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে নিতে পারেননি তারা। পথিমধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় তরতাজা এক তরুণের মৃত্যুর খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরিচয় জানতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন হাসপাতালে ভিড় করতে থাকে। পুলিশ লাশ মর্গে পাঠায়। রেলওয়ে থানা পুলিশ এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। পরদিন সকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গোলাচৌ গ্রামের সিরাজুল হক মর্গে গিয়ে লাশটি তার পুত্র শরীফুল ইসলামের বলে শনাক্ত করেন। সিরাজ তার পুত্র শরীফুলের লাশ মর্গ থেকে নিয়ে এলাকায় যান। দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনাটি ২০১৬ সালের অক্টোবরের। ২২ বছরের শরীফুলের এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না বাবা সিরাজ। তার সন্দেহ শরীফুলকে হত্যা করা হয়েছে। নিছক কোনো দুর্ঘটনা এটি নয়। পুলিশের কাছে ধরনা দিয়ে, সুরতহাল রিপোর্ট দেখে তার মনে এক সময় বদ্ধ ধারণা, খুন হয়েছে তার সন্তান। তিনি জানতে পেরেছেন শরীফুলের শরীরে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন ছিল। একটি হাতও তার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। থানা পুলিশ কোর্ট করতে করতে পেরিয়ে যায় এক বছর। অবশেষে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

শরীফকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা করেন সিরাজুল। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ফের লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ তদন্তের পর শরীফ ট্রেনের ধাক্কায় অর্থাৎ দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে রেলওয়ে থানা পুলিশ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। সিরাজুল হতাশ। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন তিনি। রেলওয়ে পুলিশের ওই রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই কুমিল্লাকে নির্দেশ দেয় আদালত। পিবিআই তদন্ত শুরু করে। কী কারণে খুন হতে পারে শরীফুল, সেই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসে। এর মধ্যে একটি মেয়ের নাম ঘুরে ফিরে আসে পুলিশের তদন্তে। রহিমা আক্তার শিপা নামের এই মেয়েটির ব্যাপারে পুলিশ খোঁজখবর নিতে শুরু করে। পুলিশ জানতে পারে, এই মেয়েটির সঙ্গে শরীফের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। শরীফের মৃত্যুর পর এই মেয়ের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। এ কারণেই পুলিশের সন্দেহের তীর রহিমার দিকে। কিন্তু রহিমা ততদিনে আরেকজনের স্ত্রী। স্বামী সংসার নিয়ে বেশ সুখেই রয়েছে। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন টাকিয়াকদমা গ্রামে তার স্বামীর বাড়িতেই রয়েছেন। পুলিশের দল এক ভোরে সেখানে গিয়ে হাজির। রহিমাকে সেখানেই একটি ঘরে জেরা করতে থাকে পুলিশ। তার কথাবার্তায় সন্দেহ আরও বেড়ে যায় পুলিশের। আর দেরি করেনি পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করে সোজা কুমিল্লায়। সেখানে চলে জিজ্ঞাসাবাদ। মুখ খুলতে শুরু করে রহিমা। তার কাছ থেকে পুলিশ পুরো ঘটনা জানতে পেরে হতবাক। ঘটনার তিন বছর পর ২০১৯ সালে অক্টোবর বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। শরীফের সঙ্গে রহিমার মামা আবু তাহেরের মাধ্যমে পরিচয় ঘটে। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু কোনো ক্রমেই তাদের প্রেমের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি তার মামা আবু তাহের। এ জন্য বিভিন্নভাবে শরীফকে হুমকিও দেয় তাহের। ঘটনার কয়েকদিন আগে শরীফ প্রেমিকা রহিমার বাড়িতে দেখা করার জন্য গেলে তার আরেক মামা বিষয়টি দেখে ফেলে। এ সময় ওই মামাও শরীফকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরপর বেশ কয়েকদিন পর রহিমা শরীফকে দেখা করার জন্য উৎসব পদুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইনের পাশে আসতে বলে। ঘটনার দিন ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শরীফ প্রেমিকার কথানুযায়ী সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই রেললাইনের কাছে যায়। এরপর আগে থেকে সেখানে ওতপেতে থাকা রহিমার মামা আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজন শরীফকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তার ডান হাতও ভেঙে ফেলা হয়। এরপর শরীফকে তারা মুমূর্ষু অবস্থায় রাস্তায় নিয়ে আসে এবং ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়েছে বলে চিৎকার শুরু করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামি রহিমা আক্তারকে শুক্রবার কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এ ঘটনায় জড়িত রহিমা আক্তারের মামা আবু তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর