শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৩১

থেমে নেই নারী নির্যাতন

বিদেশফেরত অনেক প্রবাসী স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করছে কোর্ট থেকে বিশেষ হেল্পলাইন সুবিধা চালুর আহ্‌বান

জিন্নাতুন নূর

থেমে নেই নারী নির্যাতন

করোনা মহামারীতে নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যে, এ সময় নারীর ওপর যেমন সব ধরনের পারিবারিক নির্যাতন করা হচ্ছে একই সঙ্গে তার ওপর থেমে নেই যৌন হয়রানিও। যৌতুকের জন্য একদিকে যেমন নারীকে প্রাণ দিতে হচ্ছে অপরদিকে শিকার হতে হচ্ছে ধর্ষণের। সংশ্লিষ্টরা জানান, আদালত বন্ধ থাকায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো মহামারীতে মাঠে না থাকায় নারীর প্রতি সংঘটিত নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না। আবার মহামারীতে একটি সমাজ তার নাগরিকদের অপরাধ করার সুযোগ তৈরি করে দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এই অবস্থায় নারী নির্যাতন রোধে আদালতে বিশেষ ধরনের হেল্পলাইন সুবিধা চালু করার আহ্‌বান জানিয়েছেন তারা।

কেস স্টাডি ১ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামে যৌতুকের জন্য কয়েক দিন আগে প্রাণ দিয়েছেন দেড় মাস বয়সী শিশু সন্তানের মা রুমি আক্তার (২৫)। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে রুমির ভাই মো. আশরাফুল হোসেন জানান, গত ২৩ মার্চ স্বামী আনোয়ার মিয়া ও তার পরিবার রুমির কাছে যৌতুকের টাকা চেয়ে না পেয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিয়ের পরপরই রুমির পরিবারের কাছে যৌতুক হিসেবে ফার্নিচার চায় আনোয়ার মিয়া ও তার পরিবার। প্রথমে দিতে না চাইলেও রুমির ওপর লাগাতার নির্যাতন চালালে একপর্যায়ে ফার্নিচার তৈরি করে দেয় রুমির অভিভাবকরা। কিন্তু সে সময় ফার্নিচারের বদলে রুমির পরিবারের কাছে বিদেশ যাওয়ার জন্য ৫ লাখ টাকা দাবি করে আনোয়ার মিয়া। রুমির পরিবার দিতে রাজি না হলে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। গুরুতর অবস্থায় তাকে প্রথমে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল এবং শেষে ঢাকা মেডিকেল বার্ন ইনস্টিটিউটে এনে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩ এপ্রিল রুমির মৃত্যু হয়। তার ভাইয়ের করা মামলায় আনোয়ার মিয়া, তার বাবা ইউছুব মিয়া, শাশুড়ি রুনু বেগমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আশরাফুলের অভিযোগ আসামি পক্ষের কাছ থেকে পুলিশ আর্থিক সুবিধা নিয়ে রুমির জা রাহেলাকে এখনো গ্রেফতার করেনি।

কেস স্টাডি ২ : রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় মাদকের টাকা না দেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার টিটু তালুকদার নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রী সাজেদা বেগম সাজুকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪৬ জন নারী তাদের স্বামীর নির্যাতনের কারণে মারা যান। এ সময় মোট পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন ৬৮ জন। স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১১ জন। এই তিন মাসে মোট ২৩৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় ১০ জনের। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেন চারজন নারী। একই সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হন ২২ জন। আর যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যা করেন তিনজন নারী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশফেরত প্রবাসী শ্রমিকরা এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। তারা বিভিন্ন ছলে স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করছে। আবার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জড়িত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলোও মহামারীর কারণে সেভাবে মাঠে নেই। এর ফলে নারী নির্যাতনের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোর্ট বন্ধ থাকায় মামলার কাজও অগ্রসর হচ্ছে না। মহামারীর কারণে পুরনো মামলাগুলোর জটও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার মামলা করার পর সমনকারকের কাছে রিপোর্ট করার পর সহজে একটি সমনজারি করা হচ্ছে না। এ জন্য তাকে টাকা দিতে হচ্ছে, তা না দিলে তিনি সমনজারি করছেন না। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, আমাদের মানবিক মূল্যবোধের গঠন এখনো হয়নি অন্যদিকে মহামারী মানুষকে ঘরবন্দী করে ফেলায় নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা যায় নারীরা কোথাও শান্তিতে নেই। এখন যেহেতু কোর্ট বসছে না, ভার্চুয়ালি কাজকর্ম পরিচালিত হচ্ছে সেখানে সবার যাওয়ার সুযোগও নেই এক্ষেত্রে কোর্ট থেকে বিশেষ ধরনের হেল্পলাইন সুবিধা চালু করার আহ্‌বান জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই নারীর প্রতি নির্যাতন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এখনো নারীবান্ধব নয়। নারীর যে অবস্থা তা নারীর সার্বিক ও সামাজিক অবস্থার দিক থেকে নারীকে অনেক বিপর্যস্ত করে তুলে। এ জন্য বিভিন্ন কারণে অপরাধ সংঘটিত হয়। যখন সমাজে কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি হয় তখন সমাজ কিছু অপরাধ তৈরির করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। নারী-পুরুষ এখন লকডাউনের কারণে ঘরবন্দী আছেন। এ কারণে অপরাধ করার সুযোগও বেশি। আবার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আমরা দেখছি মানুষ প্রান্তিক হচ্ছে। করোনার কারণে আয় কমে যাচ্ছে। আর মানুষের অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছে। এ জন্য নারী নির্যাতনের মতো অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে।