শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

যৌন হয়রানির হাতিয়ার এখন প্রযুক্তি

১৮-৩০ বছর বয়সী নারীরা ভুক্তভোগী বেশি, ভুক্তভোগীর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে বেশি

জিন্নাতুন নূর

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট উইমেন-এর ফেসবুক পেজে কিছুদিন আগে এক নারী অভিযোগ করেন। ওই নারীর অভিযোগ, তার নাম ব্যবহার করে এবং অশ্লীল ছবি দিয়ে ফেসবুকে ফেক আইডি তৈরি করা হয়েছে। এরপর তাকে ভয়-ভীতি দেখানো হয় এবং ব্ল্যাকমেল করা হয়। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয় মৌলভীবাজারে। পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশনায় মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের সহায়তায় গত ২২ জুন সুজন রায় ও দীপন বিশ্বাস নামে দুই অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত সুজন রায়কে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় সুজনের কাছে বিভিন্ন নারীর এডিটকৃত ছবি এবং প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ভুয়া ফেসবুক আইডির সন্ধান পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই যুবক নারীদের ছবি সংগ্রহ করে তা আপত্তিকর ভাবে এডিট করে ফেসবুক আইডি তৈরি করে ব্ল্যাকমেল করে আসছিল। বাংলাদেশে সাইবার অপরাধগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুক্তভোগীই নারী। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় যৌন হয়রানি, বিকৃত যৌনাচার, আর যৌন নিপীড়নের মতো অসংখ্য ঘটনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যৌন হয়রানির জন্য অপরাধীরা এখন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে প্রযুক্তি তথা ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যমকে। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ‘বাংলাদেশে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যৌননিপীড়ন’ শীর্ষক গবেষনা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রযুক্তির অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সাইবার স্পেসে যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই

চলেছে। গবেষণায় দেখা যায় যে, যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে মোট ১৫৪ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ৯২ দশমিক ২০ শতাংশ ভুক্তভোগীই নারী। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (৫৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ)। এদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৪৭ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। প্রাপ্ত তথ্যে, সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের সংবাদ পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে (৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ)। এরপরেই অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগের (১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ)। আর অধিকাংশ যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে বিভাগীয় শহরে। দেখা যায় যে, অনলাইনে ৬২ দশমিক ৯৯ শতাংশই যৌন হয়রানির শিকার হন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ ধর্ষণের শিকার। ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ যৌনপণ, ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ আত্মহত্যা, ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা, শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ খুনের চেষ্টা এবং অন্যান্য যৌন হয়রানি করা হয় ১ দশমিক ৯৫ শতাংশকে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, সাইবার স্পেসে যৌন নিপীড়নমূলক অপরাধ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং ভুক্তভোগীকে হয়রানিমূলক পরিস্থিতিতে ফেলতে নিপীড়নকারী গোপনে চাপ প্রয়োগ করে কিংবা প্রতারণা-প্রলোভনের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর বিকৃত কনটেন্ট সংগ্রহ করে। দেখা যায় যে, এর মধ্যে ভিডিও এবং স্থির চিত্র আকারে ধারণকৃত কনটেন্টের সংখ্যা যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টগুলোর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রকাশ্যে সাইবার স্পেসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ৪০ দশমিক ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নকারী কনটেন্ট ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগীকে প্রদান করে তার উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পারস্পারিক সম্মতির ভিত্তিতে সর্বাধিক সংখ্যক কনটেন্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে কিন্তু এক্ষেত্রে নিপীড়নকারী আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন প্রকারের কূটকৌশল ও প্রতারণার। ভুক্তভোগী এবং অপরাধীর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী, ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত। এ ছাড়া প্রায় ৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী এবং অপরাধীর মধ্যে প্রেমঘটিত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়া অপরিচিত নিপীড়নকারীর দ্বারা আক্রান্ত ভুক্তভোগীর সংখ্যা শতকরা ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে অন্যতম মুখ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৬৩ দশমিক ০৭ শতাংশ ঘটনায়। এর পাশাপাশি কারণ হিসেবে প্রতিশোধমূলক প্রবৃত্তি ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয় ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ ছাড়া চাকরির বদলি সংক্রান্ত তদবির, খামখেয়ালিপনা এবং অনান্য কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার কোনো অন্তঃরঙ্গ ভিডিও অনলাইনে যদি ছাড়া হয় কিন্তু ভিডিওটি করার সময় দুজনের সম্মতিতেই তা ধারণ করা হয় এর জন্য এই ভিডিও স্বামী ও স্ত্রী যেই অনলাইনে তা ছাড়বেন তিনিই অপরাধী হবেন। তার মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন ভুক্তভোগীর ছবি বা ভিডিও জনসম্মুখে ছাড়া না হয় ততক্ষণ তারা বিষয়টি কাউকে জানায় না। মূলত ভুক্তভোগীর বিয়ে বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা, পরিবারের অন্য ভাইবোনদেরও বিয়ে বন্ধ হয়ে পড়ার ভয়সহ পারিবারিক চাপের জন্য বিষয়গুলো চেপে যান। আবার অপরাধীরাও ভয়-ভীতি দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে বিষয়টি চেপে যাওয়ার হুমকি দেয়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সাইবার ক্রাইমে অনেক কিছু এসেছে। দেখা যাচ্ছে স্বামী ও প্রেমিকরা প্রিয়জনের আপত্তিকর ছবি অনলাইনে দিয়ে দিচ্ছে। এগুলো পোস্ট দিয়ে একজন মেয়ের চরিত্র নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করা হচ্ছে। পর্নোগ্রাফির শিকার ভুক্তভোগীরা একই সঙ্গে পাবিারিক নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। এ জন্য এই অপরাধের শাস্তি আরও বৃদ্ধি করা দরকার। একই সঙ্গে আইনের ভিতর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নারীর আপত্তিকর ছবি পোস্ট করে তাকে ব্ল্যাকমেল করা সাইবার ক্রাইমের নতুন একটি ধরন। যাকে বলা হয় ‘সেক্সটোরশন’। এর মাধ্যমে একজনের আপত্তিকর ছবি দিয়ে যৌন হয়রানির নামে চাঁদাবাজি করা হয়। আর টাকা না দিতে চাইলে ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কম বয়সী তরুণ-তরুণীরা এর ফাঁদে পড়ে। ইন্টারনেটে এই ধরনের অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের বছর বছর মানসিক অশান্তির মধ্যে থাকতে হয়। দেখা যাচ্ছে যে যৌন হয়রানি সম্পর্কিত অপরাধগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্নোগ্রাফি আইনে ফেলছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে ফেলছে না। ইন্টারনেট সম্পর্কিত হওয়ার পরও এগুলো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে ফেলছে না। এক্ষেত্রে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের যে ধারা আছে সেগুলো পর্যালোচনা করে যদি কঠোর শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করে কিছু সংযোজন ও সংশোধনী আনা যায় তাহলে অপরাধ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।