শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

খুন ও পরিত্যক্ত রিকশা

মির্জা মেহেদী তমাল

খুন ও পরিত্যক্ত রিকশা

আর মাত্র তিন দিন পরই কোরবানির ঈদ। ট্রাকে ট্রাকে কোরবানির পশু আসছে ঢাকায়। ঈদকে কেন্দ্র করে পুলিশেরও তৎপরতা বেড়েছে। এর মধ্যেই মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের কাছে খবর আসে বেড়িবাঁধ ফিউচার টাউনের একটি খালি প্লটে কাশবনের ভিতরে এক যুবকের লাশ পড়ে আছে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সেখানে মানুষের ভিড়। পচে যাওয়া লাশটি কেউ চিনতে পারছেন না। লাশের গলায় একটি গামছা পেঁচানো। পুলিশের ধারণা, হতভাগ্য ওই ব্যক্তিকে শ্বাস রোধে হত্যা করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর থানায় এ বিষয়ে মামলা হয়। লাশটি উদ্ধার হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট। পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করে। কিন্তু কোনো কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশ পরদিন ঘটনাস্থলের আশপাশে খোঁজ করতে থাকে। পুলিশের চোখ খুঁজছে এমন কোনো সূত্র যে সূত্র দিয়ে ক্লু-লেস এ খুনের তদন্ত এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা হতাশ। তেমন কোনো সূত্রই খুঁজে পেলেন না। ওই প্লট থেকে বেরিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটি রিকশা। দেখেই মনে হলো রিকশাটি বেশ কদিন ধরেই পড়ে আছে। ধুলার আস্তর রিকশার ওপর। পুলিশ কর্মকর্তা আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলেন রিকশা সম্পর্কে। রিকশাটির মালিক কে কেউ বলতে পারছেন না। তবে বেশ কদিন ধরে রিকশাটি পড়ে আছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তাকে। পুলিশের এবার সন্দেহ হয়। তবে কি খুনের ঘটনাটির সঙ্গে রিকশার কোনো যোগসূত্র আছে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন রাখেন। উত্তর খুঁজতে আর দেরি করেননি।

পরিত্যক্ত রিকশা থেকে খুনের সূত্রের সন্ধান করতে থাকেন তদন্ত কর্মকর্তা। ওই রিকশার পেছনে ‘ঢাকা সিটি মুক্তিযোদ্ধা রিকশা-ভ্যান মালিক কল্যাণ সোসাইটি’ নামে একটি টিনের প্লেট লাগানো ছিল, যাতে একটি নম্বর ও কার্যালয় হিসেবে ফার্মগেট ও মগবাজার লেখা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা ওই সমিতির মগবাজার কার্যালয়ে যান খোঁজ নিতে। জানতে পারেন রিকশার ওই নম্বরটি মোহাম্মদপুরের নবীনগরের তোফাজ্জল নামে একজনকে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা ছুটতে থাকেন নবীনগরের দিকে। পেয়ে যান তোফাজ্জলকে। পুলিশ কর্মকর্তা তাকে রিকশাটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তোফাজ্জল জবাবে বলেন, ওই নম্বরটি কাকে দিয়েছেন তা তার মনে নেই। পুলিশ এবার হতাশ। অনেকটা কাছাকাছি এসে এভাবে তদন্ত শেষ হতে পারে না। জিদ চাপে পুলিশ কর্মকর্তার। যেভাবেই হোক খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করবেনই। তখন বিভিন্ন রিকশার গ্যারেজে খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি। ২৫ আগস্ট নবীনগরের একটি গ্যারেজ থেকে খবর পান তাদের এক চালক রিকশাসহ নিখোঁজ।

পুলিশ ওই গ্যারেজে গিয়ে রিকশার ছবি দেখায়। রিকশা মালিক তার রিকশা দেখেই চিনতে পারেন। তিনি বলেন, রিকশাটি তিনি লাল বাবুকে দিয়েছিলেন। পুলিশ প্রায় নিশ্চিত লাশটি লাল বাবুর। পুলিশ এরপর রিকশাচালক লাল বাবুর বাসায় যায়। বাসায় গিয়ে স্ত্রী পূর্ণিমাকে লাশের ছবি দেখালে পরনের কাপড় দেখে তিনি চিনতে পারেন। পুলিশ পুরোপুরি নিশ্চিত হয় লাশটি লাল বাবুর। কিন্তু তখন পর্যন্ত জানা যায়নি খুনি কারা, আর কেনই বা এ হত্যাকান্ড।

পুলিশ কর্মকর্তা এসআই নয়ন মিয়া রিকশাচালক লাল বাবুর বাড়ি গেলে ওই এলাকার অনেকেই তার স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন। ফলে এসআই নয়ন তার ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে পূর্ণিমার মোবাইল ফোন নম্বর ধরে অনুসন্ধান চালান। একটি নম্বরে পূর্ণিমার দীর্ঘ সময় কথা বলার প্রমাণ পেয়ে তাকে সন্দেহের তালিকায় নেন এসআই নয়ন মিয়া। ১ সেপ্টেম্বর তাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তোতা মিয়া নামে একজনের সঙ্গে পরকীয়া এবং তাকে নিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেন। এরপর তোতা মিয়াকে মধ্যরাতে চন্দ্রিমা উদ্যানের একটি বাড়ির ছাদ থেকে কৌশলে গ্রেফতার করা হয়। থানায় আনার পর তোতা মিয়া পূর্ণিমার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও হত্যার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

তোতা মিয়ার সঙ্গে প্রেমের কথা জানতে পেরে পূর্ণিমাকে বকাঝকা করেন তার স্বামী। তখন তোতা মিয়ার সঙ্গে সালিশ করার কথা বলে নিরিবিলি জায়গায় স্বামীকে নিয়ে যান পূর্ণিমা। সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী কথা বলার ফাঁকে স্বামীর অ-কোষ চেপে ধরেন। লাল বাবু জ্ঞান হারান। তখন পূর্ণিমা লাল বাবুর পা চেপে ধরেন আর তোতা মিয়া গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাস রোধে হত্যা করেন। ২ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন এবং পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন। তোতা মিয়া ৭ সেপ্টেম্বর আদালতে জবানবন্দি দেন।

এই রকম আরও টপিক