বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

ঢাকা মহানগরী বিএনপির কমিটিতে উপেক্ষিত নারী

অনেক পুরনো নেতার ঠাঁই মেলেনি, নতুন মুখের ছড়াছড়ি, আহ্বায়ক কমিটির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি, আছেন ছাত্রদল নেতারাও

মাহমুদ আজহার

তিন দিন আগে ঢাকা মহানগরীর দুই শাখায় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে মহানগর উত্তর শাখায় একজন মাত্র নারী ঠাঁই পেয়েছেন। একইভাবে দক্ষিণ শাখার ৪৯ সদস্যের কমিটিতে মাত্র তিনজন নারী সদস্যের ঠাঁই মিলেছে। তবে কেউই গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে পারেননি। সবাইকে রাখা হয়েছে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে। এর আগেও মহানগরীর কমিটিতে উপেক্ষিত ছিল নারী। এমনকি বিএনপির সর্বশেষ ঢাউস কেন্দ্রীয় কমিটিতেও নারী নেত্রীর সংখ্যা ছিল নগণ্য।

কমিটিতে নারী নেত্রীর সংখ্যা কম থাকা প্রসঙ্গে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের অনেক যোগ্য নারী নেত্রী আছেন। তারা মূল দল ও অঙ্গ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার মতো যোগ্যতা রাখেন। মহানগরীর বিএনপির দুই শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে আরও নারী নেতৃত্ব থাকা উচিত ছিল। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে এটা বিবেচনা করা হবে বলে আমি আশা করছি।’ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের শর্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই সেই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এর আগে নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালে নিবন্ধিত দলগুলোকে চিঠি দিয়ে তাদের নারী নেতৃত্বের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়েছিল। ওই সময় চিঠি দিয়ে বেশিরভাগ দলগুলো তাদের অবস্থা জানানোর পাশাপাশি ২০২০ সালের মধ্যে শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সর্বশেষ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ৩৩ শতাংশ শর্ত পূরণের সময় বাড়াতে নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধনী খসড়া করেছে। ওই খসড়ায় নারী নেতৃত্বের ৩৩ শতাংশ নিশ্চিত করার সময় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।

ঘোষিত কমিটির নানা অসঙ্গতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি একটা বিশাল রাজনৈতিক দল। সেই দলের যখন একটি কমিটি তৈরি করা হয় তখন ছোটখাটো সমস্যা থাকতেই পারে। আমরা যেটা দেখছি, পরীক্ষিত নেতাদের দিয়েই এই কমিটি করা হয়েছে। প্রবীণ এবং নবীনের সমন্বয়ে করা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা কার্যকরী কমিটি হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’

জানা যায়, বিএনপি ঘোষিত মহানগরীর দুই শাখার কমিটিতে অনেক নতুন মুখের ছড়াছড়ি। অনেক যোগ্য নেতার জায়গা হয়নি কমিটিতে। তাছাড়া ছাত্রদলের সদ্য বিদায়ী নেতারাও জায়গা পেয়েছেন। মহানগরীর রাজনীতি করেননি এমন অনেকেই জায়গা পেয়েছেন এই কমিটিতে। আবার মহানগরীর অলি-গলি চেনা অনেক নেতারই ঠাঁই হয়নি এতে। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা কমিটির সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবও। তিনি দলের ত্যাগী ও যোগ্য নেতা। এ ছাড়া আগের কমিটির ত্যাগী নেতা কাজী আবুল বাশার, হাবিবুর রশীদ হাবিব, নাসিমা আক্তার কল্পনা, হামিদুর রহমান হামিদ, মীর হোসেন মিরু, শেখ রবিউল আলম রবি, তানভীর আদেল খান বাবু, মীর আশরাফ আলী আজম, সাইফুল ইসলাম পটু, আলমগীর হোসেন, রফিকুল ইসলাম রাসেল, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম কিবরিয়া, জাফর সাদেক, খবিবুর রহমান খোকন, হামিদুল হক, জয়নাল আবেদীন (রতন চেয়ারম্যান), মোস্তাফিজুর রহমান হিরু, আলী রেজাউল করীম রিপন, মোয়াজ্জেম হোসেন খান, শাহেদা মোর্শেদ, বাদল কমিশনারসহ অনেক নেতারই ঠাঁই হয়নি নতুন কমিটিতে।

আবার ঢাকা মহানগরীর নতুন কমিটিতে আনা হয়েছে অনেক নতুন মুখ। এর মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ, সদস্য হিসেবে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, আরিফা সুলতানা রুমা, রাজন, আবুল খায়ের লিটন, নাছরিন রশীদ পুতুল, নাদিয়া পাঠান পাপন, জামশেদুল আলম শ্যামল প্রমুখ। একইভাবে মহানগর উত্তর শাখায় মুন্সি বজলুল বাসিত আঞ্জু, শামীম পারভেজ, মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেক পুরনো নেতার ঠাঁই হয়নি। সেখানেও একঝাঁক নতুন মুখ এসেছেন। এর মধ্যে বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক রাজনীতিতেও নতুন। খেলা থেকে অবসর নিয়ে গত ৫ বছর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। এর মধ্যে সাবেক এই তারকা ফুটবলার বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদকের পাশাপাশি জায়গা করে নিলেন মহানগরীর উত্তর শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, আমিনুল একজন ক্লিন ইমেজের তারকা নেতা। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক আছে। দলের জন্যও তিনি নিবেদিত। ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণ শাখার আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দলের হাইকমান্ড যাদের যোগ্য মনে করেছেন, তাদের নেতৃত্বেই মহানগরীর আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছেন। এটাকে আমি স্বাগত জানাই। আমি মনে করি, দায়িত্ব পাওয়া নেতারা পদ-পদবির দিকে না তাকিয়ে আমাদের কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

এ দিকে আহ্বায়ক কমিটিকে কাউন্সিলের মাধ্যমে পরবর্তী কমিটি করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ঘোষিত কমিটির বেলায় তা হয়নি। এ ছাড়া কমিটিতে পদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও যোগ্যতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া ছাত্রদলের কয়েকজনকে মহানগরীর বিএনপিতে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি থেকে বহিষ্কৃত নাদিয়া পাঠান পাপনকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটি ঘোষণার দিন সকালে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমাকেও সদস্য করা হয়েছে। এত জুনিয়র দুজনকে মহানগর বিএনপির কমিটিতে সদস্য করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

বিএনপির দফতরের দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, কমিটি ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় না। এটা দুই চার দিন পরে আলাদা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। খুব শিগগিরই দায়িত্বশীল নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হবে, কত দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে হবে।

সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নতুন কমিটির নেতাদের সাক্ষাৎ : এ দিকে সদ্য ঘোষিত ঢাকা মহানগরীর বিএনপির দুই শাখার কমিটির নেতারা গতকাল দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সকালে নতুন কমিটির নেতারা রাজধানীর উত্তরার মির্জা ফখরুলের বাসায় সাক্ষাৎ করেন। এরপর নেতারা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নবনির্বাচিত কমিটির নেতাদের নানা পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান ও সদস্য সচিব আমিনুল হক এবং দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম ও সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু প্রমুখ।

গত সোমবার ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ শাখার কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালামকে আহ্বায়ক করে দক্ষিণ শাখায় ৪৯ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। একইভাবে চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানকে উত্তরের আহ্বায়ক করে ৪৭ সদস্যের কমিটি করা হয়। দক্ষিণের সদস্য সচিব হয়েছেন রফিকুল আলম মজনু এবং উত্তরের সদস্য সচিব হয়েছেন আমিনুল হক। রফিকুল আলম মজনু মহানগরী দক্ষিণ যুব দলের সভাপতি এবং ফুটবলার আমিনুল হক হচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক।