শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

‘কেয়ারভিগার’ করোনা রোগীর দেবদূত

দেখভালে যাদের কেউ নেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে তাদের, পারিবারিক মমতায় সেবাদানের অনন্য নজির স্থাপন

জিন্নাতুন নূর

জাহানারা আক্তার (ছদ্মনাম) স্বামী মারা যান পাঁচ বছর আগে। তার দুই ছেলেই বিদেশে বউ-সন্তান নিয়ে থাকেন। ঢাকায় এক গৃহকর্মী নিয়ে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন জাহানারা। চলতি বছরের মে মাসে তিনি করোনায় আক্রান্ত হন। সন্তানরা বিষয়টি জানতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেও বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় দেশে আসতে পারেননি। সেই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে ‘কেয়ারগিভার’ সম্পর্কে জানতে পারেন জাহানারার বড় সন্তান। অতঃপর ‘সংযোগ : কানেক্টিং পিপল’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে মায়ের সার্বক্ষণিক সেবার জন্য একজন ফিমেল কেয়ারগিভারের সন্ধান পান। পরম মমতায় সেবা দিয়ে এই বৃদ্ধাকে সুস্থ করে  তোলেন সেই কেয়ারগিভার। জাহানারা মনে করেন- সেই কেয়ারগিভার দেবদূত হয়ে এসে তার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘কেয়ারগিভার’ ধারণাটি নতুন হলেও বাংলাদেশে কেয়ারগিভারের চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সেবাদাতারা করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ করে তুলছেন পরম মমতায়। জানা গেছে, নারী কেয়ারগিভারের চাহিদা বেশি। আবার বয়স্ক যেসব দম্পতি বা পিতামাতার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকেন, যারা একা থাকেন, যেসব মানুষের পরিবারের করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা প্রদানের লোক নেই- তাদের কাছে কেয়ারগিভারের চাহিদা বেশি। আরও জানা গেছে, সংযোগ নামের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে কেয়ারগিভার সার্ভিস। বেশ কয়েকজন রোগীর স্বজনের চাহিদার বিপরীতে এই সেবা শুরু হয়। যদিও দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কেয়ারগিভার নেই। এ জন্য সংযোগ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বেশ কিছু কেয়ারগিভার তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সংযোগ থেকে মোট ৪০ জন মানুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে কেয়ারগিভার হয়েছেন। এর মধ্যে নারী ১৩ জন, বাকিরা পুরুষ। এ ছাড়া আরও ১৫ জন কেয়ারগিভার হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি প্রশিক্ষণের জন্য অপেক্ষায় আছেন। এর মধ্যে কেউ আছেন যারা নার্সিং বিষয়ে অভিজ্ঞ, আবার কেউ কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিপ্রত্যাশী। এই কেয়ারগিভারদের অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করা, ইনসুলিন দেওয়া, ব্লাড প্রেসার মাপা, অক্সিমিটারের ব্যবহার, রোগীকে টয়লেটে নিয়ে যাওয়া, কভিড আক্রান্ত রোগীর ময়লা পরিষ্কার করা, রোগীকে সময় মেনে খাওয়ানো এই বিষয়গুলো শেখানো হয়। কেয়ারগিভাররা প্রয়োজন অনুযায়ী কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টা, আবার কেউ ১২ ঘণ্টার বেশি সময় রোগীর সেবা করেন। আবার কেউ মাসিক চুক্তিতেও দায়িত্ব পালন করছেন। কাজ শেষে নিরাপত্তার জন্য এই  কেয়ারগিভারদের করোনা পরীক্ষা করানো হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানীই নয় সারা দেশেই  কেয়ারগিভারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই সংযোগের কাছে ১০ থেকে ১২ জন রোগী বা তার স্বজন কেয়ারগিভার সেবা পাওয়ার জন্য ফোন করছেন। এখন করোনা আক্রান্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নারী রোগীদের অবস্থা পুরুষের তুলনায় সংকটাপন্ন হওয়ায় ফিমেইল কেয়ারগিভারের চাহিদা বেশি।  সংযোগের কেয়ারগিভার ইউনিটের সমন্বয়ক সাদিয়া শামীম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর লক্ষ্য করি, যে রোগীদের দেখাশোনা করার কেউ নেই, যাদের সন্তান বিদেশে এবং দেশে যাদের অভিভাবক একা থাকছেন- এমন মানুষ কভিডে আক্রান্ত হলে কেউ তাদের কাছে গিয়ে সেবা করতে ভয় পাচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবক হওয়ায় আমরা নিজেরা এই সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করি।

এর মধ্যেই জিল্লুর রহমান নামের আমাদের এক ভাই এমন রোগীদের সেবা দিতে এগিয়ে আসেন। এভাবেই কেয়ারগিভার  সেবা শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশ থেকেই কেয়ারগিভার সেবা নেওয়ার জন্য ফোন পাচ্ছি। এ ছাড়া আগ্রহী অনেকেই আছেন যারা কেয়ারগিভার হয়ে মানুষের সেবা করতে চান।  কেয়ারগিভারদের সাধারণত রোগীর পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করিয়ে দিয়ে দুই পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে সম্মানী ঠিক করা হয়। ধীরে ধীরে কেয়ারগিভার সেবা সম্পর্কে অনেকেই জানতে পারছেন। যারা দেশের বাইরে থাকেন এবং নিজের আপনজনের সেবা করার মতো লোক দেশে নেই- তাদের কাছে কেয়ারগিভারের প্রয়োজনীয়তা বেশি। তিনি জানান, কেয়ারগিভার সেবা পেতে ০১৯১১৫৪৯৫১৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর