রবিবার, ৮ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

ফিরতি যাত্রায়ও অতিরিক্ত ভাড়া

ফেরিঘাটে গাড়ির দীর্ঘ সারি, মহাসড়কে গাড়ির চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফিরতি যাত্রায়ও অতিরিক্ত ভাড়া

সদরঘাটে গতকাল ঢাকামুখী মানুষ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

এবারের ঈদযাত্রার শেষটা ভালো হলো না। ঈদের ছুটি শেষে ঢাকা ফেরার শেষ দিনে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। ফিরতি যাত্রায় সংকট ছিল বাস-ট্রেন-লঞ্চের কেবিন ও ডেকের টিকিটের। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল যাত্রীদের। এ ছাড়া ফেরিঘাটে ছিল গাড়ির দীর্ঘ সারি, মহাসড়কে গাড়ির চাপ ছিল বেশি। অনেক এলাকায় থেমে থেমে গাড়ি চলেছে। এদিকে সকাল থেকেই রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট লাগে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা যাত্রীবাহী শত শত পরিবহন সড়কে আটকে ছিল। গাবতলী বাস টার্মিনালে যাত্রী ও কাউন্টার ম্যানেজাররা বলেন, ফেরিঘাটে যানজট লাগায় যেসব বাস সকাল ৮টা থেকে ১০টায় পৌঁছায় সেগুলো গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। কাউন্টার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেরিঘাট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দের জমিদার ব্রিজ পর্যন্ত যানজট প্রায় ৮ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে গাড়ির সারি আরও দীর্ঘ হয়। শুক্রবার রাতে যেসব গাড়ি চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, যশোর, কুষ্টিয়া ছেড়েছে তাদের ফেরিতে উঠতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪-৫ ঘণ্টা। দৌলতদিয়া ছাড়াও আরিচা, পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ছিল যানবাহনের চাপ।

বাংলাবাজার ঘাটে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি : ঈদ শেষে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুট দিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে নদী পারের অপেক্ষায় ঢাকামুখী যাত্রী, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

বিআইডব্লিউটিসি জানায়, শুক্রবার সকাল থেকেই যাত্রী ও যানবাহনের চাপ রয়েছে। বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ঘাটে পারাপারের জন্য ৫ শতাধিক পণ্য ও যাত্রী বাহী গাড়ি এবং হাজারো মোটরসাইকেল অপেক্ষায়   রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে সচল রয়েছে মাত্র পাঁচটি ফেরি। ফলে যাত্রীবাহী গাড়িগুলোকে দীর্ঘক্ষণ ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। বিআইডব্লিউটিসির কাঁঠালবাড়ী ঘাট ম্যানেজার সালাউদ্দিন বলেন, ‘সকাল থেকে ব্যক্তিগত ও মোটরসাইকেলের বেশ চাপ ছিল। বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটে মোট পাঁচটি ফেরি চলাচল করছে। বাংলাবাজার ঘাটে ৫ শতাধিক পণ্য ও যাত্রী বাহী গাড়ি পদ্মা পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা অ্যাম্বুলেন্স, রোগীবাহী যানবাহন জরুরি ভিত্তিতে পার করেছি। তবে ফেরি কম থাকায় কিছুটা দুর্ভোগ থেকে যাচ্ছে।’ ‘ভিআইপি’ সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সিরিয়াল মেনে ঘাটে আসা গাড়িগুলো পার করা হয়। কোনো গাড়ি আগে পার করার সুযোগ নেই।’

দৌলতদিয়া প্রান্তে থমকে ছিল যানবাহন : কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট চরম ভোগান্তি নিয়ে পার হতে হয়েছে। গতকাল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ১২ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত যানজটে আটকে থেকে ফেরি পার হতে হয়। বাসযাত্রী ও চালকেরা অভিযোগ করে বলেন, যাত্রী ও মোটরসাইকেলের কারণে বাসযাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাসযাত্রীরা বলেন, হাজার হাজার মোটরসাইকেলের কোনো সিরিয়াল না থাকায় বাসগুলো ফেরিতে যেতে পারছিল না। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পার হতে আসা বিভিন্ন যানবাহনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। এ অভিযোগে সুবহানা এন্টারপ্রাইজের চারজন কালেক্টরকে আটক করে পুলিশ। জরিমানা আদায়ের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়।

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. শিহাব উদ্দীন বলেন, ‘যাত্রী ও যানবাহনের ব্যাপক চাপ রয়েছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বর্তমানে ২১টি ফেরি চলাচল করছে। যাত্রী ও যানবাহনের চাপ থাকায় বাসযাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যাত্রী ও যানবাহনের চাপে দৌলতদিয়া প্রান্তে থমকে গেছে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার। দেখা গেছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ৯ ও রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ৩ কিলোমিটার এলাকায় সিরিয়ালে ছিল যানবাহন। এর মধ্যে ৫ শতাধিক যাত্রীবাহী বাস ছিল। ১০ ঘণ্টার অধিক সময় পর্যন্ত সিরিয়ালে থেকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় বাসযাত্রীদের। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।’

লঞ্চঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ : ঈদ উদ্যাপন শেষে কর্মস্থলে ফিরতে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে রাজধানীমুখী যাত্রীর চাপ ছিল বেশি। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শিডিউল লঞ্চগুলো পর্যাপ্তসংখ্যক যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসে। চাঁদপুর-ঢাকা, চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জে চলাচলকারী নিয়মিত লঞ্চের পাশাপাশি যাত্রীদের সুবিধার্থে অতিরিক্ত লঞ্চের ব্যবস্থা রেখেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ।

কর্মস্থলমুখী মানুষের ঢল মানিকগঞ্জে

বরিশাল নদীবন্দরে যাত্রীর চাপ : বরিশাল নদীবন্দরে ছিল ঢাকামুখী যাত্রীর সর্বাধিক ভিড়। গতকাল এবারের ঈদে সর্বাধিকসংখ্যক ১৯টি লঞ্চ বরিশাল থেকে টইটম্বুর যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। অতিরিক্ত ভিড় হওয়ায় প্রায় প্রতিটি লঞ্চকেই নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনাল ত্যাগ করতে বাধ্য করে প্রশাসন। বরিশাল রুটের লঞ্চগুলো ছেড়ে যাওয়ার পরও টার্মিনালে অবশিষ্ট থাকা কিছু যাত্রী ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেছেন বিভিন্ন রুটের ভায়া লঞ্চে। লঞ্চগুলোয় ডেক ভাড়া আদায় করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। অন্যদিকে কিছু মানুষ কাউন্টার থেকে প্রথম শ্রেণির কেবিন টিকিট পেলেও দ্বিগুণ দামে কালোবাজারে কেবিন টিকিট মিলেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ১৯টি বিলাসবহুল বৃহদাকার যাত্রীবাহী নৌযান বরিশাল নদীবন্দর ত্যাগ করে। সন্ধ্যার মধ্যে সব লঞ্চ পরিপূর্ণ হয় যাত্রীতে। ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ যাত্রী নেওয়ার পরও আরও যাত্রী তোলার আশায় টার্মিনালে নোঙর করে রাখা লঞ্চগুলোকে একে একে ঘাট ত্যাগ করতে বাধ্য করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ কারণে কিছু যাত্রী নির্ধারিত লঞ্চে যেতে পারেননি। ঢাকা-বরিশাল রুটের ১৯টি লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পরও টার্মিনালে থাকা কিছু যাত্রী অন্যান্য ভায়া রুটের লঞ্চে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। লঞ্চগুলোয় বরিশাল-ঢাকা রুটে ৩৫০ টাকা ডেক ভাড়া আদায় করা হয়। ২ হাজার ৮০০ টাকার ডবল কেবিন গতকাল সর্বাধিক ৪ হাজার ৫০০ এবং সিঙ্গেল কেবিন ৩ হাজার টাকায় কেনাবেচা হয়েছে বলে যাত্রী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

শিমুলিয়া ঘাটে বাড়তি ভাড়া : মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে স্পিডবোট, বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে খেয়ালখুশিমতো বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিমুলিয়া ঘাটে লঞ্চ, স্পিডবোট ও বাসে ঢাকামুখী যাত্রীর উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এ সময় যাত্রীদের লঞ্চ ও স্পিডবোট থেকে নেমে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বাসের টিকিট কাটতে দেখা যায়। যাত্রীর চাপ বাড়ার সুযোগ নিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

যাত্রীরা জানান, স্পিডবোটে নদী পার হতে নির্ধারিত ভাড়া ১৫০ টাকা। অথচ তারা ভাড়া আদায় করছেন ২০০ টাকা। বাসস্ট্যান্ডেও ভাড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। ৮০ টাকার ননএসি বাসের ভাড়া ১২০ থেকে ১৫০ টাকা নিচ্ছে। ১৫০ টাকার এসি বাসের ভাড়া ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রশাসনের সামনে এ অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার পরও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ যাত্রীদের।

চাপ বেড়েছে মাঝিকান্দি ঘাটে : কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীর চাপ বেড়েছে শরীয়তপুরের মাঝিকান্দি ঘাটে। এ ঘাটে ২ শতাধিক গাড়ি আটকা পড়ে ছিল। পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় এসব যানবাহনকে। মাঝিকান্দি ঘাটে চারটির পরিবর্তে বর্তমানে পাঁচটি ফেরি চলছে। এর পরও ভোগান্তি কমেনি যাত্রীদের। শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি ফেরিঘাটটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সহজতর মাধ্যম হওয়ায় দিন দিন যানবাহনের চাপ বাড়ছে এ ঘাটে। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জসহ বরিশাল ও খুলনা বিভাগের যাত্রীরা এ ঘাট দিয়ে যাতায়াত করছেন। কিন্তু ঘাট এলাকার রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় যানজটে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

গতকাল এ ঘাটে ব্যক্তিগত যানবাহন চাপ অনেক বেশি দেখা গেছে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক যাত্রী লঞ্চে ঘাট পার হয়ে লোকাল বাসে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

উত্তরবঙ্গের মহাসড়কে ধীরগতি, নেই যানজট : উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। সড়কের কোথাও কোথাও ধীরগতিতে যানবাহন চলছে। তবে অন্যান্য ঈদের তুলনায় এবারের ফিরতি যাত্রা অনেকটাই স্বস্তির বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। গতকাল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনে যানবাহন বাড়তে থাকায় সড়কে ধীরগতি দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়ক থেকে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের চান্দাইকোনা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, যানবাহনের চাপে ধীরগতির সৃষ্টি হলেও কোথাও তেমন যানজট ছিল না।

গাজীপুরে ফিরছেন কর্মজীবীরা : ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে কর্মমুখী মানুষের গ্রাম থেকে কর্মস্থলে ফেরা গতকালও অব্যাহত ছিল। যাত্রাপথে পরিবহন বা যানজটের ভোগান্তি ছিল না বলে জানান যাত্রীরা। গতকাল দিনভর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রেন, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে গাজীপুর ফেরে মানুষ। সকাল ১০টার পর কর্মমুখী যাত্রী বেশি মাত্রায় ফিরতে শুরু করে। তবে এতে অন্যবারের মতো যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে স্বস্তির যাত্রা : গত কয়েক বছর ঈদের আগে ও পড়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে দীর্ঘক্ষণ যানজটে দুর্ভোগ পোহাতে হতো ঘরমুখী ও কর্মস্থলে যাওয়া মানুষদের। কিন্তু এবারের চিত্রটা ভিন্ন। ঈদের আগে এ মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ থাকলেও ছিল না কোনো যানজট। ঠিক তেমনি ঈদের ছুটি কাটিয়ে মানুষ এবার যানজট ছাড়াই ফিরতে শুরু করেছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর