প্রতি বছর বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এক সময় ডেঙ্গুর মৌসুম বলতে শুধু বর্ষাকালকেই বোঝানো হতো। কিন্তু এখন সে ধারণা পাল্টে গেছে। এডিস মশার জীবনচক্রের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে এখন শীত-গ্রীষ্মেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়। এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলার মতো বগুড়াতেও চোখ রাঙ্গাতে পারে ডেঙ্গু বা এডিস মশা। সুস্থ
ডেঙ্গুমুক্ত ও বর্জ্যমুক্ত আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন। এ লক্ষ্যে মহানগরে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেনতনতামূলক র্যালিসহ মশক নিধনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এদিকে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, মশক নিধনে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের ২১টি ওয়ার্ডে ৪২টি ফগার মেশিন প্রয়োজন। সেখানে রয়েছে ১২টি মেশিন। এই ১২টি মেশিন দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল ও ফগার মেশিনের অভাবে প্রাচীন এই মহানগরীর ২১টি ওয়ার্ডে নার্ভানাশক ওধুষ স্প্রে করতে সমস্যা হচ্ছে।
জানা যায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল সময়। এই সময়ে জমে থাকা পানিতে মশার ডিম দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয় এবং থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে প্রজনন আরো বাড়ে। বর্ষাকাল আসলে বগুড়া মহানগরের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা পানির কারণে এডিস মশার সংখ্যাটা বেড়ে যায়। তখন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ে। এডিম মশা মূলত পরিচ্ছন্ন পানি থেকে হয়। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পানিতে তারা ডিম পাড়ে এবং সেখানেই তাদের জন্ম হয়। এ জন্য বাড়ির আশে-পাশে, আনাচে-কানাচে যত টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার রয়েছে সেগুলো পরিস্কার করতে হবে। শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বগুড়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য মহানগরের বিভিন্ন স্থানে ফেলা হলেও আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা ও জলাশয়ে আবর্জনা নিক্ষেপ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবগঠিত বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রথম প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন নগরীকে বর্জ্যমুক্ত ও ডেঙ্গুমুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রাম, বালতি বা পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি পরিষ্কারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মহানগরের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা রোধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার জানান, ডেঙ্গু হচ্ছে একটা ভাইরাস। এটি মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আর মশাটা হচ্ছে এটার একটা বাহক। এই বাহকটা যখন একটা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কামড় দেয়। কামড় দেওয়ার পরে ওই ব্যক্তির শরীর থেকে ভাইরাসটা তার শরীরে নিয়ে নেয়। এ মশাটা যখন আবার একটা সুস্থ মানুষের শরীরে কামড়ায় তখন ওই ভাইরাসটা সুস্থ মানুষের শরীরে চলে যায়। বগুড়া সিটি কর্পোরশনের এখন বড় দায়িত্ব মশক নিধন। মশক নিধনের ওষুধ সঠিকভাবে মহানগরের বিভিন্ন স্থানে স্প্রে করতে হবে।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী জানান, মশক নিধনে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের ২১টি ওয়ার্ডে ৪২টি ফগার মেশিন প্রয়োজন। সেখানে রয়েছে ১২টি মেশিন। এই ১২টি মেশিন দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে। বর্তমানে নার্ভানাশক ওধুষ (কীটনাশক) রয়েছে ৯০০ কেজি, যা দিয়ে চলতি বর্ষায় মশক নিধন করা সম্ভব। কিন্তু জনবলের অভাবে সময়মত মশক নিধন নার্ভানাশক স্প্রে করা যাচ্ছে না। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। প্রতিদিন এসব সমস্যা নিয়ে মাইকিং, পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ চলমান রয়েছে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মনজুর মোর্শেদ জানান, এখন পর্যন্ত বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ ভর্তি নেই। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে হাসপাতালে আলাদা ইউনিট প্রস্তুত রয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিডি-প্রতিদিন/এমএল