শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫২

রানার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রানার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি (টাঙ্গাইল-৩, ঘাটাইল) আমানুর রহমান খান রানার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের অসংখ্য অভিযোগ। বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও এমপি রানা ও তার ভাইদের কাছে জিম্মি অবস্থায় ছিল। তাদের ভয়ে এখানকার মানুষের মুখ খোলা ছিল বারণ। খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে এমপি আমানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ৪৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার ছাড়াই ৪৪টি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। ফলে গত কয়েক বছর ধরে এই পরিবারের তাণ্ডব ক্রমশই বাড়ছিল। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেকটা অঘোষিতভাবেই টাঙ্গাইল জেলার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন এমপি আমানুর রহমান খান রানা এবং তার তিন ভাই। রানা এবং তার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সারনিয়াত খান বাপ্পা ও স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ঠিকাদারি থেকে শুরু করে পরিবহন খাত পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাদ ছিল না টাঙ্গাইল শহরের পতিতাপল্লীও। তবে রানা সাম্রাজ্যের সবকিছু বদলে যায় ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি। এদিন টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকায় খুন হন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ। নিজ বাসার কাছ থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে এই ত্যাগী নেতা প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে এমপি রানা ও তার ভাই মুক্তি, কাকন, বাপ্পাসহ ১০-১২ জন অভিযুক্ত হন। খুনের সঙ্গে জড়িত গ্রেফতারকৃত আনিসুল ইসলাম রাজা ও মোহাম্মদ আলী ফারুকের জবানবন্দিতে জানা যায়, এমপি রানা ঘটনার দিন রাতে রাজাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ফারুক আহমেদকে জেলা আওয়ামী লীগ অফিস থেকে কলেজপাড়া এলাকায় তার গ্লোবাল ট্রেনিং সেন্টারে ডেকে আনার জন্য। আওয়ামী লীগ অফিসে যাওয়ার সময় পথেই রাজার সঙ্গে ফারুক আহমেদের দেখা হয়। রাজা তখন নিজের রিকশা ছেড়ে দিয়ে ফারুক আহমেদের রিকশায় উঠেন এবং তাকে গ্লোবাল ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হওয়া নিয়ে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের একজন ফারুক আহমেদকে জানান, সাধারণ সম্পাদক পদে মেয়র সাহেব (এমপি রানার ভাই মুক্তি) প্রার্থী হবেন। এমপি রানার ছোট ভাই সারনিয়াত খান বাপ্পা ফারুককে এ পদে প্রার্থী হতে নিষেধ করেন। কিন্তু ফারুক তাতে রাজি নন বলে সাফ জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, সব পদ তোমরাই দখল করে নিয়েছ। আমি মাত্র জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের প্রার্থী হতে চেয়েছি। এতেই তোমরা আমার ওপর ক্ষেপে গেলে। যাক তোমরাই সব গিলে খাও। এসব কথা বলতে বলতেই ফারুক আহমেদ ওই ট্রেনিং সেন্টার থেকে বের হতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসী কবির পেছন থেকে তার পিঠে গুলি করেন। বাকিরা তার মুখ চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে নেতাদের নির্দেশে তাত্ক্ষণিকভাবে সেখানকার রক্ত মুছে ফেলা হয়। পরে একটি অটোরিকশায় লাশ বসিয়ে রাজাসহ দুজন দুই পাশে বসেন এবং ফারুক আহমেদের বাসার কাছে তার লাশ ফেলে রেখে চলে যান। এদিকে আটক আসামিরা এমপি রানা ও তার ভাইদের নাম বলে দেওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই তারা টাঙ্গাইল ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতারে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। এদিকে শুধু আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ নন, টাঙ্গাইল সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও এমপি রানার ভাইয়েরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। বহুল আলোচিত এই খান পরিবারের ছোট ছেলে ও এমপি রানার ভাই ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সারনিয়াত খান বাপ্পার নির্দেশেই তার দেহরক্ষী শাহজাহান মিয়া আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই বিএনপি নেতাকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্ত শাহজাহান মিয়া টাঙ্গাইল বিচারিক হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা উল্লেখ করেছেন। এমপি রানার ছোট তিন ভাইও পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব চালাত। ধর্ষণ, জমি দখল, নারী নির্যাতন, মাদক ব্যবসা, জুয়া, হাউজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে টাঙ্গাইলবাসীকে জিম্মি করে রাখে এই পরিবারটি। ঠিকাদারি থেকে শুরু করে পরিবহন খাত সর্বত্র প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে চাঁদার ভাগবাটোয়ারার নিয়ন্ত্রণ করেছেন এই চার ভাই। এক সময়ে এই পরিবারের সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করতেন টাঙ্গাইল শহরের পতিতাপল্লী। এখানে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমপি রানা ও তার ভাইয়েরা। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা জানান, গত তিন-চার বছরে চার ভাই তাদের সন্ত্রাসী দিয়ে অনেকগুলো খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা খোকন, শামীম, ফারুক, মামুন, দিপু, সীমানার পিলারের ব্যবসায়ী উজ্জ্বল সূত্রধর, বিএনপি নেতা আ. রউফ, রুমি, যুবলীগ নেতা শামীম, মামুন, বক্সসহ অনেককে খুন করে লাশ গুমের ঘটনাও ঘটান। এমনকি পঙ্গু করে দিয়েছেন শত শত নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর শহরের ভিক্টোরিয়া রোডে সাদিকুর রহমান দিপু নামে এক ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। নিহত দিপু এমপি রানার ছোট ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকনের ইয়াবা ব্যবসা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। একপর্যায়ে দিপুর সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব হলে তাকে খুন করা হয়। ২০১২ সালের ২৪ অক্টোবর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী শাহীন শিকদারকে একইভাবে খুন করা হয়। এ খুনের নেতৃত্ব দেন এমপি রানার পালিত সন্ত্রাসী কোয়ার্টার রনি। ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সামনে আরেক ওষুধ ব্যবসায়ী কবীর হোসেনকেও গুলি করে হত্যা করে। একই বছরের মে মাসে শহরের সুপারি বাগান রোডে তুহিন নামে এক যুবককে এমপি রানার আশ্রিত সন্ত্রাসী মোর্শেদ প্রকাশ্যে পিটিয়ে খুন করে। নিহত তুহিন এমপি রানার ছোট ভাই কাকনের ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতেন। একই বছর ১ এপ্রিল শহরের ঘারিন্দা রেলস্টেশন রোডে আজম নামের এক অটোরিকশা শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্যে খুন করা হয়। এ খুনের নেতৃত্বে ছিলেন এমপি রানার ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসী ডন সোহেল। এমপি রানা তার বিরুদ্ধাচরণ করা লোকদের নিজস্ব টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করাতেন। এমপি রানা ও তার ভাইদের নিয়ন্ত্রণে শহরের নিরালামোড় এলাকায় শ্রমিক লীগের কার্যালয়ের পেছনে একটি, ছাত্রলীগের কার্যালয়ের পেছনে একটি এবং পানির ট্যাংকির কাছে একটি টর্চার সেল রয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের এক হেভিওয়েট নেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, এমপি রানার বিরুদ্ধে কথা বলায় আমি দীর্ঘ সময় এলাকাছাড়া ছিলাম। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। ২০১২ সালের ২৪ অক্টোবর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ওষুধ ব্যবসায়ী শাহীন শিকদারকে খান পরিবারের ক্যাডার কোয়ার্টার রনির নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী গুলি করে হত্যা করে। ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই একই সন্ত্রাসীরা টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সামনে আরেক ওষুধ ব্যবসায়ী কবীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে। শহরের উত্তর এলাকায় খান পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে টাঙ্গাইল শহরের সুপারি বাগান রোডে তুহিন নামক এক যুবককে খান পরিবারের ক্যাডার মোর্শেদ প্রকাশ্যে দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করে। একাধিক সূত্র জানায়, তুহিন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। সে খান পরিবারের নিয়ন্ত্রিত ইয়াবা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ইয়াবা না নিয়ে ঢাকার অন্য সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ইয়াবা এনে বিক্রি করত। তাই খান পরিবারের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। এ বছর ১ এপ্রিল টাঙ্গাইল শহরের ঘারিন্দা রেলস্টেশন রোডে আজম নামক এক অটোরিকশা শ্রমিক নেতাকে খান পরিবারের ক্যাডার ডন সোহেলের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আজমের ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ, ওই এলাকার আধিপত্য বিস্তার করতেই খান পরিবার তাদের পালিত সন্ত্রাসী দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে শহর ছাত্রলীগের সভাপতি  খোরশেদ আলম খুন হন। তিনি খান পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু দরপত্র নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে খান পরিবারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। খোরশেদের মা মাজেদা বেগম বাদী হয়ে এমপি ও তার তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু পুলিশ খান পরিবারের তিন ভাইয়ের নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এর বিরুদ্ধে মাজেদা বেগম নারাজি জানালেও কোনো লাভ হয়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর