শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৯

ঢাবি ভর্তিতে জালিয়াতি

পরীক্ষার আগেই হাতে উত্তর

আকতারুজ্জামান

পরীক্ষার আগেই হাতে উত্তর
ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর। ফেসবুক মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছে যায় পরীক্ষার্থীর হাতে

ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার উত্তর। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে পরীক্ষার উত্তর পাঠিয়ে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা শুরুর প্রায় ৪২ মিনিট বা তারও আগেই পৌঁছে যায় শিক্ষার্থীদের কাছে উত্তর। ভর্তিচ্ছুদের কাছে পাঠানো প্রশ্নের স্ক্রিনশর্ট বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এ প্রতিবেদকের কাছে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্রের উত্তর পাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে দাবি করেন, পরীক্ষা শুরুর পর জালিয়াত চক্র ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র বাইরে পাঠিয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাইরে প্রশ্ন পাঠানো ঠেকানো যায় না অনেক সময়। অনেক ভর্তিচ্ছু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছে শিক্ষার্থীদের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য বলেন, এমন তথ্যপ্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেব। কিছু অভিভাবক জানান, পরীক্ষা শুরুর পর শিক্ষার্থীরা দলে দলে হলে প্রবেশ করেছে। প্রশাসন ছিল অনেকটাই উদাসীন। কেউ কেউ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন কেন্দ্রে প্রবেশের পর। ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে গতকাল নয়জন ভর্তিচ্ছুকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এদের মধ্যে সাতজনকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। আটকদের কাছে মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস (কানের ভিতরে) পাওয়া যায়। উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি দাবি করে বাকি দুজনকে ছেড়ে দিয়েছে প্রশাসন। এদিকে গতকাল বিকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে জালিয়াতির অভিযোগে ৫ জনকে আটক করেছে প্রশাসন। গতকাল ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা ছিল সকাল ১০টায়। সকাল ৯টার পর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ভাইরাল হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে থাকা লেখা স্ক্রিনশর্টে দেখা যায় সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে ‘এস কে আবদুল আলম’ নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী বিভিন্ন ভর্তিচ্ছুর ইনবক্সে হাতে লেখা প্রশ্নের উত্তর পাঠান। তার ফেসবুক টাইম লাইনে গিয়েও দেখা গেছে গতকাল দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে তিনি ফেসবুকেও হাতে লেখা কিছু উত্তরের স্নাপশর্ট আপলোড দেন। ঢাবির ঘ ইউনিটের একশ ভাগ প্রশ্ন তিনি ভর্তিচ্ছুদের কমন দিয়েছেন বলেও ফেসবুকের পোস্টে দাবি করেন। এ ছাড়া তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন। এই জালিয়াত চক্রের কাছে পরীক্ষার আগেই উত্তর নেওয়া এক ভর্তিচ্ছু এ প্রতিবেদককে বলেন, এস কে আবদুল আলম প্রশ্ন না দিয়ে শুধু উত্তর পাঠিয়েছেন। পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরগুলো হুবহু মিলে গেছে। ঢাবিতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হলে তাকে এক লাখ টাকা দিতে হবে বলেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ভর্তিতে জালিয়াতির দায়ে আটকরা হলেন- তারিকুল ইসলাম, আজিজুল আবিদ খান রিফাত, আবদুল্লাহ আল মহসি, মিলন, রাব্বিক হাসান মুন, তাসকিনুর রায়হান তমাল, তাওহিদুল ইসলাম ও এনামুল হক। পরে তমাল ও রাব্বিক হাসান মুনের তথ্যের ভিত্তিতে আবু সাঈদ নামে এক জালিয়াত চক্রের সদস্যকে আটক করা হয় এবং তাদের দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে অভিযুক্তদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান শাস্তি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে আগ্রহী ছিলেন না। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিতে অপারগ। কারণ মূল হোতারা কখনো ধরা পড়ে না। পরে ম্যাজিস্ট্রেট শাস্তি না দিয়েই ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষার তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন সহকারী প্রক্টর এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, তোমরা থাকলে আমাদের প্রাইভেসি নষ্ট হয়। সহকারী প্রক্টর রবিউল ইসলাম ও অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমানও সাংবাদিকদের তথ্য না দিয়ে বের হতে বলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, জবিতে ভর্তি জালিয়াতিতে আটকদের সূত্রাপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের মোবাইলে উত্তরপত্রের খুদে বার্তাসহ আটক করা হয় এবং একজন মেয়ে পরীক্ষার্থীকে ইলেকট্রিক ডিভাইসসহ আটক করা হয়েছে। আটকরা হলো মেহেদী হাসান, রাজন খান, হৃদয় হাসান, আল মাসুম ও তাহমিনা ইসলাম। ভ্রাম্যমাণ আদালত উপস্থিত না থাকায় তাদের সাজা প্রদান না করে সূত্রাপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান প্রক্টর নূর মোহাম্মাদ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস থেমে নেই। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার কখনো ভর্তি পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্ন চলে যাচ্ছে জালিয়াত চক্রের হাতে। স্বল্প সময়ে প্রশ্ন সমাধান করে তা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভর্তিচ্ছুদের মুঠোফোনে অথবা ব্ল-টুথ ডিভাইসের মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রশ্নের সমাধান। মাঝে-মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর