শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩২

ফেনী-বিলোনীয়া যুদ্ধ কাহিনী

লে. কর্নেল জাফর ইমাম (অব.) বীর বিক্রম

ফেনী-বিলোনীয়া যুদ্ধ কাহিনী

ফেনীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী-বিলোনীয়া যুদ্ধ ছিল মুক্তিবাহিনী ও পাক হানাদার বাহিনীর জন্য সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয়ের জন্য ছিল একটি মর্যাদার লড়াই। ফেনীর বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ, যা ঢাকা পর্যন্ত প্রসারিত। মার্চ ’৭১-এ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাড়তি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রেরিত) ফেনীর ওপর দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানিদের। আমাদের ওপর দায়িত্ব ছিল ফেনীর ওপর দিয়ে বাড়তি সৈন্য ও গোলাবারুদ যেন দেশের অন্য অঞ্চলে যেতে না পারে। সেই লক্ষ্যে আমরা ফেনীর মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিই।

বৃহত্তর নোয়াখালীর সাব-সেক্টর কমান্ডার ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক হিসেবে আমার ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়। আমার সঙ্গে শুরুতে ক্যাপ্টেন ইমাম-উজ জামান (পরে মেজর জেনারেল), ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ (পরে মেজর জেনারেল), ক্যাপ্টেন শহীদ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল), ক্যাপ্টেন মজিবর, লে. দিদার, লে. মিজান, ক্যাপ্টেন মজিবুর, ক্যাপ্টেন মোকলেসুর রহমান, জনাব গোলাম মোস্তফা আই.ও.টু অধিনায়ক ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (যুদ্ধকালীন) এরা সবাই এ যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ফেনীর ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে কোনো বাড়তি সৈন্য ও গোলাবারুদ বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করে তারা যেন বাংলাদেশে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল অবলম্বনে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলি। ক. ফেনী শহরের চার পাশে প্রতিরোধের পাশাপাশি ফেনী হয়ে নোয়াখালী বেগমগঞ্জের চৌরাস্তায় চতুর্মুখী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় যেন শত্রুপক্ষ বেগমগঞ্জের চৌরাস্তা হয়ে লাকসাম কুমিল্লার দিকে না যেতে পারে। অথবা ঢাকা-কুমিল্লা থেকে লাকসাম হয়ে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়  হয়ে শত্রুপক্ষ উল্টো ফেনীতে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য কোনো সহযোগিতা না পেতে পারে। এই লক্ষ্যে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় চতুর্মুখী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। নোয়াখালী বেগমগঞ্জ চৌরাস্তাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। এ চার অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয় যথাক্রমে— ১) সুবেদার লুত্ফর রহমান ও গাজী আমিন উল্লাহ ২) সুবেদার ওয়ালিউল্লাহ ৩) শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ও ৪) সুবেদার সামছুল হক ও সুবেদার এসহাককে। আমার সঙ্গে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমন্বয়ে ছিলেন ওই অঞ্চলের তৎকালীন এমএনএ নুরুল হক সাহেব। নোয়াখালী জেলার মুক্তিযোদ্ধারা ছাড়াও ওই জেলার মুজিব বাহিনীর জেলা কমান্ডার ছাত্রনেতা বেলায়েত গংদের ছিল এই যুদ্ধে সহযোগিতা। যেমনি করে আমাদের ফেনী জেলার মুজিব বাহিনীর জেলা কমান্ডার ছিলেন ভিপি জয়নাল ও সহকারী কমান্ডার ছিলেন আবদুল মোতালেব।

খ. ফেনী জেলার প্রত্যেকটি উপজেলাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমরা ফেনী শহরের উপকণ্ঠে কালীরবাজার নামক স্থানে পাকবাহিনীর শক্ত ডিফেন্স ঘাঁটি থেকে মাত্র ৮০০-১০০০ গজ দূরে মুন্সিরহাট নামক স্থানে কালির বাজারে। ওই ঘাঁটির মুখোমুখি আমরাও প্রায় তিন মাইলব্যাপী ডিফেন্স স্থাপন করি। কালীরবাজার থেকে মুন্সিরহাটে আমাদের ঘাঁটির মাঝে আমরা প্রায় ৬-৭শ গজ ঘন এন্টিট্যাঙ্ক ও এন্টিপার্সোনাল মাইন ফিল্ড স্থাপন করি। শত্রুপক্ষের কালীরবাজার ঘাঁটির পক্ষে পাক হানাদারদের ছিল ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, জঙ্গিবিমান ও হেলিকপ্টার এবং ফেনীতে ছিল এক রেজিমেন্টের অধিক সৈন্য অনুকূল সমর্থনে। তাদের এই সক্ষমতার বিরুদ্ধে আমাদের তথা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল অসীম মনোবল, শত্রু নিধন করে দেশ মুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প ও শপথ। একাত্তরের এপ্রিল, মে, জুনের ১৭ তারিখ পর্যন্ত এই আড়াই মাসে তারা আমাদের বিরুদ্ধে ৯টি আক্রমণ পরিচালনা করেছিল। তবে আমাদের সম্মুখে স্থাপিত ঘন মাইন ফিল্ড ও আমাদের ভারতীয় আর্টিলারির সমর্থনে ব্যাপক মর্টার ও ভারী অস্ত্র ফায়ারিংয়ের মুখে তারা আমাদের পাতানো ফাঁদ মাইন ফিল্ড অতিক্রম করতে পারেনি। আমরা প্রত্যেকটি আক্রমণে প্রত্যক্ষ করেছি তারা যখন মাইন ফিল্ড সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা করত, তখন মাইনগুলো খৈইয়ের মতো ফুটত আর তারা ওই মাইন ফিল্ডে কাতরাত। আড়াই মাসের এই সম্মুখযুদ্ধে তাদের প্রায় ৩০০ জন হতাহত হয়েছিল। এ. এ. কে জেনারেল নিয়াজী তার বই “THE BETRAYAL OF EAST PAKISTAN (Page 209) এ স্বীকার করেছেন এই বলে যে, A Brigade action which launched at Belonia was repulsed; এটা ছিল প্রথম বিলোনিয়া সম্মুখযুদ্ধে গণযোদ্ধা ও নিউক্লিয়াস অব ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঐতিহাসিক সামরিক অভিযান। পরে অবশ্য রণকৌশলগত কারণে এই ডিফেন্স আমরা মুহুরি নদীর পাড়ে প্রতিষ্ঠা করি এবং দ্বিতীয় বিলোনিয়া যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। সেদিনের সেই সফল উইথড্রয়াল প্রাণ রক্ষা করেছিল প্রায় ৫০০-এর অধিক। গণযোদ্ধা এবং পুরো একটি ব্যাটালিয়ন-সর্বমোট প্রায় ১ হাজার ৭০০ মুক্তিযোদ্ধার। উইথড্রয়াল একটি সামরিক অভিযান/অপারেশন। এই রণকৌশল ও আমাদের সফল উইথড্রয়ালে সেদিন আমাদের সহযোগী বিএসএফ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীও প্রশংসা করেছিল।

গ. এর পাশাপাশি ফেনী শহরের চারপাশে আমাদের গেরিলা তৎপরতা ও রেইড ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে বিভিন্ন স্থানে ওতপাতা মুক্তিযোদ্ধারা পাকহানাদার বাহিনীর চলাচলের ওপর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় অ্যাকশনে যেতে বিলম্ব করত না।

বিশেষ করে ফেনী থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সামরিক কায়দায় তাদের চলাচল ও অস্ত্র/সৈন্য ভর্তি সামরিক যানবাহনের ওপর আমরা রেইড ও অ্যাম্বুসের মাধ্যমে তাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন ও চলাচলে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হই। একাত্তরের মের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের পিণ্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে নেই। সেই মুহূর্তে এক বিদেশি সাংবাদিক ইয়াহিয়া খানকে প্রশ্ন করেন এই বলে যে, আমি মাত্র কয়েকদিন আগে ফেনীর বিলোনীয়া মুক্ত অঞ্চল ঘুরে এসেছি। সেখানে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া এই তিনটি উপজেলা সম্পূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে মুক্ত অঞ্চল দেখেছি। পাকিস্তানের কোনো খবরদারি ও আধিপত্য এই অঞ্চলে নেই। সেই  বিদেশি সাংবাদিক আরও বলেন, ‘আমি আরও শুনে এসেছি। এই তিনটি মুক্ত উপজেলা যার তিন দিকে ভারত সীমান্ত দ্বারা বেষ্টিত প্রায় ৮ থেকে ১৩ মাইল চওড়া ও প্রায় ১৯ মাইল দীর্ঘ এই জনপদ যদি এইভাবে মুক্ত অঞ্চল হিসেবে থাকে তাহলে স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাজধানী/হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হবে। আসলে আমার সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ যখনই এই রণাঙ্গন পরিদর্শনে আসতেন তখন আমাকে এই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খান ওই সাংবাদিক থেকে এই কথাগুলো জানার পর তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডার জেনারেল হামিদকে ফেনী যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বশক্তি নিয়োগ করে এই যুদ্ধে তাকে সরাসরি তদারকি করার পরামর্শ দেন। পাক জেনারেল হামিদ ফেনী সার্কিট হাউস থেকে এই যুদ্ধ আমাদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছিল। এই যুদ্ধে ফেনীর প্রত্যেকটি মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মুখ ও গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সবার অবদান আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। এই পর্যায়ে আমি ফেনীর তৎকালীন নেতা খাজা আহম্মদকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকার জন্য শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

একাত্তরের ১০ নভেম্বর পাকহানাদার বাহিনী চিথলীয়া ও পরশুরাম ২য় বিলোনীয়া যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয়। এই সম্মুখযুদ্ধে ১০০ এর উপরে তাদের লোক হতাহত হয়। রণকৌশলে ভরপুর এই যুদ্ধে এই রণাঙ্গনে এই পরাজয়ের পর অবশিষ্ট দুজন অফিসারসহ মোট ৭২ জন সৈনিক ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই আত্মসমর্পণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তথা ফেনীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিরাট গর্ব ও ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১০ নভেম্বর পরশুরামের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত করা পর্যন্ত আমাদের সময় লেগেছিল ২৬ দিন। পরশুরাম চিথলিয়া থেকে ফেনী পর্যন্ত এই সামরিক অভিযানে ফেনীর উপকণ্ঠে পৌঁছবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ফুলগাজী, গাবতলী পশুরহাট, কালীরবাজার, পাঠাননগর পর্যন্ত তাদের এই ঘাঁটিগুলো মুক্ত করতে প্রায় ২৫ দিন ব্যাপক সম্মুখ সমরে লিপ্ত ছিলাম। এই সম্মুখ সমরগুলো ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে তাদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যামবুশ রেইড অব্যাহত ছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে আসছিল। ঠিক এই সময়ে আমাদের ফেনীর সোনাগাজী, দাগনভূইয়া ও ফেনীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের স্থানীয় গেরিলা যোদ্ধারা তাদের অভিযান ও গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শত্রুর ওপর চাপ অব্যাহত রাখে। আমরা ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী যখন ফেনী শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে শহরের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করি, তখন পাকহানাদার বাহিনী ৫ তারিখ রাত থেকে ফেনী শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। কেউ বেগমগঞ্জ ও লাকসাম হয়ে কুমিল্লার দিকে আবার আরেকটি অংশ চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। তখন পালিয়ে যাওয়া এই পাক হানাদারদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়।

৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত হওয়ার পর ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি অংশ পাইওনিয়ার প্লাটুন ও গণযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে আমি ও লে. দিদার নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দিই। নোয়াখালী ঢোকার মুখে নোয়াখালী টেকনিক্যাল কলেজে আমাদের সঙ্গে শত্রুপক্ষ ও তাদের দোসরদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে তাদের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর আমাদের আক্রমণের তীব্রতার মুখে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরে আমরা নোয়াখালী সার্কিট হাউসে ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হই ও শুভেচ্ছা বিনিময় করি। নোয়াখালী জেলার তৎকালীন ছাত্রনেতা ও জেলা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার মাহমুদুর রহমান বেলায়েত তখন উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন আমরা ফেনী ফিরে আসি। ফেনী ও নোয়াখালী মুক্ত হবার পরও আমাদের দায়িত্ব ও করণীয় তখনো শেষ হয়নি। ৯ ডিসেম্বর ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল হীরার সার্বিক নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মুক্ত করার অভিযানে ফেনী থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হই। এখানে উল্লেখ্য, এই অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেড অংশগ্রহণ করে। এই অভিযানে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভ্যানগার্ডের দায়িত্ব পালন করে। আমাদের মুক্তিবাহিনীর আরেকটি বড় অংশ মিরসরাই থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সড়ক দিয়ে হাটহাজারী চট্টগ্রাম অভিমুখে একই সময়ে যাত্রা শুরু করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যার অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন গাফফার বীর উত্তম। তার সহযোগী ছিলেন ক্যাপ্টেন কবির, লে. জামিল (দুজনই পরে মেজর জেনারেল)। গাফফার গংদের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন কিলো ফোর্স কমান্ডার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনান্দ সরূপ। জেনারেল হীরার নেতৃত্বে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে এবং আনান্দ সরূপের নেতৃত্বে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট হাটহাজারী থেকে চট্টগ্রাম এই উভয় গ্রুপ চট্টগ্রাম শহরে ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছার আগে শত্রুপক্ষের সঙ্গে অনেকগুলো বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়। এই মিত্রবাহিনীর চাপ সইতে না পেরে তারা পিছু হটে চট্টগ্রাম শহরের চট্টগ্রাম সেনানিবাসের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই সংঘর্ষগুলোতে উভয় পক্ষের অনেক হতাহত হয়।

আমরা ৬ ডিসেম্বর বীরদর্পে ফেনীতে প্রবেশ করি। তখন ফেনী সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত। এই যুদ্ধে আমাদের প্রায় ১৩৭ জন সম্মুখযুদ্ধে শহীদ ও প্রায় ২০০ জন আহত হন। ৬ ডিসেম্বর সেদিন ফেনী শহরে সৃষ্টি হয়েছিল এক আনন্দঘন পরিবেশ। জয় বাংলা-জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে ফেনীর আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিল। ফেনী শহরে সেদিন নেমেছিল মুক্তিকামী জনতার ঢল। এদের মধ্যে আমরা দেখেছি আনন্দ উল্লাস, তেমনি আবার লক্ষ্য করেছি তাদের মাঝে স্বজন হারানোর বেদনা। আমরা দেখেছি অশ্রুসজল নয়ন আর স্বজন হারানোর বেদনার ছাপ। এর মধ্যেও তারা বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের হাত নেড়ে ফুল দিয়ে বরণ করে। সেই এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি যাকে ভোলা যায় না কিছুতেই। আমরা সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা সর্বস্তরের জনতার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। তাদের আবেগ অনুভূতি আনন্দ উল্লাসের মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছিলাম ফেনীর সেদিনের সেই জনগণ যেন মুক্ত আকাশের নিচে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

অনেক প্রতীক্ষিত মুক্তির পর সেদিন ছিল না কোনো দলীয় সংকীর্ণতা, ছিল না কোনো হানাহানি, ছিল না কোনো হিংসা-বিদ্বেষ। সবার মধ্যে সেদিন ছিল দুচোখ ভরা স্বপ্ন আর আকাশসম আশা, ছিল দৃঢ় সংকল্প ‘নিজের দেশকে নিজের হাতে গড়ব’। আমাদের মধ্যে থাকবে না কোনো হানাহানি। আমরা সবাই মিলে শহীদদের স্বপ্নসাধ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আনব। শহীদদের এই স্বপ্নসাধের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এক ও অভিন্ন। এই অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং প্রজন্মকে এই ইতিহাস উপহার দিয়ে যাওয়া। কারণ তারাই এই ইতিহাসকে ধারণ ও লালন করবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আজও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেনি। তাই বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলে ও রণাঙ্গনগুলোতে যুদ্ধকালীন সংঘটিত গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ করে ইতিহাসকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এই ব্যর্থতার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কোনো দিন ক্ষমা করবে না।

লেখক : বীর বিক্রম, সাব-সেক্টর কমান্ডার, বৃহত্তর নোয়াখালী এবং অধিনায়ক ১০ম ইস্ট বেঙ্গল (যুদ্ধকালীন) সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী।


আপনার মন্তব্য