শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৩৯

বিচার পেতে ভোগান্তির শেষ নেই শ্রমিকদের

কোর্ট চলে তিন ঘণ্টা, সময় বাড়ানোর দাবি আইনজীবীদের ঝুলে আছে সাড়ে ১৭ হাজার মামলা

আরাফাত মুন্না

বকেয়া মজুরি আদায়ে ২০০৮ সালে বাচ্চু মিয়া ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করেছিলেন ফুয়াং ফুডস্্ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ১১ বছর বিচারিক কার্যক্রম চলার পর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এসেছে। বিচারিক কার্যক্রম চলার সময় অনেক ভোগান্তি সইতে হয়েছে বাচ্চু মিয়াকে। কখনো সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত দিনে সাক্ষী না আসা আবার কখনো মালিক পক্ষের সময় আবেদন। অন্তত ৩০ বার আদালতে হাজির হতে হয়েছে তাকে। গার্মেন্টসকর্মী লাভলী আক্তারও নিজের প্রাপ্য মজুরি আদায়ে শ্রম আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ২০১২ সালে ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে যাওয়ার পর আবার ইউটার্ন নিয়ে জবাব পর্যায়ে চলে আসে। অর্থাৎ আবার প্রথম থেকে শুরু। লাভলী আক্তার জানান, সাত বছর মামলা চালানোর ফল শূন্য। এখন আবার সব কিছুই নতুন করতে হবে।

শুধু বাচ্চু মিয়া বা লাভলী আক্তার নন, শ্রম আদালতে প্রতিকার চাইতে আসা প্রায় সব শ্রমিকেরই সইতে হয় চরম ভোগান্তি। শ্রম আদালতগুলোতে বিচারিক কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় সমাজের অপেক্ষাকৃত আর্থিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে। বিচার চাইতে আসা শ্রমিক ও শ্রম আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতসহ দেশের প্রায় সব কটি শ্রম আদালতেই বিচারিক কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার হয় না। গড়ে ৩ থেকে চার ঘণ্টা বিচারকাজ চলে এসব আদালতে। শ্রমিকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও শ্রম আদালতের সংখ্যা কম হওয়া, শ্রম আইনের দুর্বলতা, অবকাঠামোর অভাব ও বিচারিক কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার না হওয়াকেই শ্রমিকদের ভোগান্তির জন্য দায়ী করছেন শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী ছাড়া অন্য কোনো জেলায় শ্রম আদালত না থাকায় দেশের ওইসব জেলার শ্রমিকদের ভোগান্তি আরও বেশি। আর একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল ঢাকায় হওয়ায় ঢাকার বাইরের শ্রম আদালতে কোনো শ্রমিক নিজের পক্ষে রায় পেলেও আপিলের কারণে তাকে নতুন করে হয়রানির শিকার হতে হয়। সাতটি শ্রম আদালতের মধ্যে রাজধানীতে তিনটি, চট্টগ্রামে দুটি, খুলনা ও রাজশাহীতে একটি আদালত রয়েছে। এই সাতটি আদালতের দেওয়া আদেশ ও রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধপক্ষের করা আপিল নিষ্পত্তির জন্য ঢাকায় একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালও রয়েছে। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশের সাতটি শ্রম আদালত ও একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ১৭ হাজার ৬০৮টি। এর মধ্যে দেশের একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৪৭টি মামলা বিচারাধীন, যার মধ্যে ২৫৪টি মামলা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে বিচার কাজ বন্ধ রয়েছে। ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৬, দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৫ হাজার ২৬৩ এবং ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে ৪ হাজার ৫টি মামলা। চট্টগ্রামের প্রথম শ্রম আদালতে ১ হাজার ৫১০টি এবং দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৫৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়া খুলনার শ্রম আদালতে ২১৪টি এবং রাজশাহীর শ্রম আদালতে ৪১৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. সেলিম আহসান খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শ্রম আদালতে একজন শ্রমিক মামলা করার পর রায় পর্যন্ত যেতে তাকে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। দিনের পর দিন আসতে হয় আদালতে। অধিকাংশ সময়ই মালিক পক্ষের অনীহার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন শ্রমিক। তিনি বলেন, আমাদের শ্রম আদালতগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্য বিচারিক কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার না হওয়া। অধিকাংশ শ্রম আদালতেই তিন ঘণ্টার বেশি বিচার কাজ হয় না। অথচ দেশের অন্য আদালতগুলোতে অন্তত ছয় ঘণ্টা বিচার কাজ চলে। শ্রম আদালতগুলোরও বিচার কাজের সময় বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। শ্রমিকের ভোগান্তির জন্য আইনি নানা জটিলতাকেও দায়ী করেন এই শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ।

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকটে মো. সফিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যদি ময়মনসিংহের চাতালের কোনো শ্রমিক তার দেনমোহরের দাবি করতে চান, তবে তিনি সেখানেই এর প্রতিকার পেতে পারেন। তবে সেই শ্রমিকই যখন তার মালিকের কাছে পাওনা সংক্রান্ত কোনো দাবি করতে চান, তবে তাকে ঢাকায় আসতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কম শক্তিশালী, সেখানে আইনের আশ্রয় নেওয়ার জন্য শ্রমিকের শেষ জায়গা আদালত। সেখানেই যদি তাকে এত ঝামেলায় পড়তে হয়, তবে তা হতাশাজনক।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ছয়টি শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ঢাকায় তিনটি এবং চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে তিনটি আদালত স্থাপিত হয়। ১৯৯৪ সালে এ চট্টগ্রামে আদালতের সংখ্যা একটি বেড়ে মোট আদালত হয় সাতটি। ওই সময়ে দেশে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫ কোটি ৮১ লাখ মানুষ কাজে নিয়োজিত আছে। তবে এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কোনো আইনি সুবিধা পেতে ওই সাত আদালতেরই দ্বারস্থ হতে হয়। শ্রমিক বাড়লেও বাড়েনি শ্রম আদালত।


আপনার মন্তব্য