Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মে, ২০১৯ ২২:৫১

বিমানের লিজে কত মধু

নতুন ক্রয়ে আগ্রহ নেই, ছাড়ে না সময়মতো, টিকিটের কৃত্রিম সংকট, অনিচ্ছা লাভজনক রুটে, ট্রেড ইউনিয়নের আধিপত্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিমানের লিজে কত মধু

আত্মঘাতী চুক্তির মাধ্যমে উড়োজাহাজ লিজে (ভাড়া) এনে ফ্লাইট চালাতে গিয়ে বার বার তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে। লিজে আনা বিমানে দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটিকে। সেই লোকসানকে বাড়িয়ে বিমানকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে উড়োজাহাজ ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে দুর্নীতি, টিকিট বিক্রি নিয়ে কারসাজি, কার্গো শাখায় লুটপাট, শিডিউল বিপর্যয়, অপ্রয়োজনীয় জনবল, লাভজনক রুটে ফ্লাইট কম চালানোসহ নানা অব্যবস্থাপনা। এসব কারণে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটি এখন মূলধন সংকটে পড়েছে। তবু অজ্ঞাত কারণে আবারও লিজের পথে হাঁটছে বিমান।

২০১৪ সালে ৫ বছরের জন্য মিসরের ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি উড়োজাহাজ (বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর) ভাড়ায় আনার খেসারত এখনো গুনতে হচ্ছে বিমানকে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বহরে না থাকলেও উড়োজাহাজ ফেরত দিতে না পারায় প্রতি মাসে ভাড়াবাবদ গুনতে হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। প্রায় এক বছর ধরে উড়োজাহাজ দুটি মেরামতের জন্য ভিয়েতনামে পড়ে আছে। কবে তা মেরামত করে ফেরত দেওয়া যাবে সে ব্যাপারে বিমানের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। এটা বাদেও বর্তমানে ভাড়াবাবদ বিমানকে ১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি গুনতে হচ্ছে প্রতি মাসে। এরই মধ্যে গত ১৬ মে কুয়েতের আলাফকো হতে লিজে আনা হয়েছে একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০। বিমান সূত্র জানায়, উড়োজাহাজটির জন্য প্রতি মাসে গুনতে হবে দুই লাখ ৬৭ হাজার ডলার বা প্রায় দুই কোটি ২১ লাখ টাকা। একই ভাড়ায় আগামী জুনের শুরুতে আরেকটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বহরে যোগ হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া হজকে সামনে রেখে এয়ার এশিয়া থেকে আড়াই মাসের জন্য দুটি মাঝারি পরিসরের উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিমান। সূত্র বলছে, বহরে থাকা উড়োজাহাজগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার না করে একের পর এক উড়োজাহাজ ভাড়া আনায় বিমানের একটি পক্ষ খুবই আগ্রহী। তাই বিমানের ফ্লাইট না বাড়লেও বাড়ছে বহর। বাড়ছে লিজের সংখ্যা। সূত্র জানায়, বিমানের বহরে বর্তমানে মোট উড়োজাহাজ আছে ১৪টি। এর মধ্যে ৮টি নিজস্ব, ৬টি লিজে আনা। ইয়াঙ্গুনে সম্প্রতি লিজে আনা একটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ায় চালু আছে ১৩টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, দুটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ নিজস্ব।  এ ছাড়া লিজে আনা বোয়িং ৭৩৭-৮০০ তিনটি ও ড্যাশ-৮ দুটি (ইয়াঙ্গুনে বিধ্বস্তটি বাদে)। আগামী জুনে যোগ হবে লিজের আরেকটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০। জুলাই ও সেপ্টেম্বরে আসছে নিজস্ব ক্রয়ে দুটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। ২০২০ সালের মাঝামাঝি আসবে নিজস্ব ক্রয়ে আরও তিনটি ড্যাশ-৮।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিমান বাংলাদেশের সেই পরিমাণ আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে লিজে বিমান আনতে হয়। অধিকাংশ বিমান ক্রয় করতে ঋণের প্রয়োজন হয়। যাত্রী চাহিদা মেটাতে বিমান কেনার পাশাপাশি আমরা লিজে বিমান আনতে বাধ্য হচ্ছি। বাংলাদেশের অন্য সব কোম্পানিই লিজে আনা বিমানে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বিশ্বব্যাপী এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। আমরা চেষ্টা করছি ক্রমেই লিজের পরিমাণ কমিয়ে আনতে। বিমানের শিডিউল বিপর্যয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রী ভোগান্তি কমাতে ও শিডিউল বিপর্যয় ঠেকাতে আশাব্যঞ্জক উন্নয়ন হয়েছে। এতে যে সব সময় আমাদের দায় থাকে এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈরী আবহাওয়া, ইমিগ্রেশনে যাত্রীর চাপ বেশি থাকা, রানওয়ে ক্লিয়ার না থাকলে শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। আমাদের যাত্রী চাহিদা ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইটগুলোতে টিকিটের তুলনায় দ্বিগুণ যাত্রী চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়টি চিন্তা করে ২০ ও ২৭ মে মধ্যপ্রাচ্যে আরও দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এদিকে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনায় দেনায় ডুবেছে বিমান। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী, বিমানের ২ হাজার ৮২ কোটি টাকা মূলধনের বিপরীতে ঋণ ৫ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। নতুন চার উড়োজাহাজ কিনতে নেওয়া ঋণ যুক্ত করলে এটা বেড়ে দাঁড়াবে ৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বিমানকে বাঁচাতে দেরিতে হলেও শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়। একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠে নেমেছে দুদকও। গত ৩ এপ্রিল অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিমানের বিপণন ও বিক্রয় শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আশরাফুল আলম এবং উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলামকে এমডির দফতরে সংযুক্ত বা ওএসডি করা হয়। শফিকুল ইসলাম চার বছর বিমানের যুক্তরাজ্যে কান্ট্রি ব্যবস্থাপক থাকাকালীন ২ হাজার ৪৭২টি টিকিট বিনামূল্যে বিক্রি দেখিয়ে ১৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বিপণন ও বিক্রয় শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষে টিকিট ব্লক করে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফলে যাত্রীরা টিকিট কাটতে গেলে দেখানো হতো আসন খালি নেই। অথচ আসন খালি রেখেই আকাশে উড়ত বিমান। দুদকের তালিকায় বিমানের দেড় শতাধিক ব্যক্তির নাম এসেছে, যাদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। সদ্য বিদায়ী এমডি ও সিবিএ নেতাসহ ১০ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুদক।

এদিকে দূরপাল্লায় উড্ডয়নের সক্ষমতা ও যাত্রী চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ বিমান আঞ্চলিক রুটেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ৫৩টি দেশের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল চুক্তি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৬টি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। সপ্তাহে আন্তর্জাতিক রুটে ৯৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। এদিকে ২০০৯ সালের পর থেকে ৬ বছরে বিমান লোকসান দিয়েছে ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। ৩ বছরে লাভ করেছে ৫৫৬ কোটি টাকা। ৯ বছরে লোকসান ৯০০ কোটি টাকা। মূলধনের চেয়ে এখন বিমানের ঋণ বেশি। লোকসানের সাদা হাতির লাগাম টানতে গত বছর ডিসেম্বর  থেকে মন্ত্রণালয় মনিটরিং শুরু করে। ফল পাওয়া যায় হাতে হাতে। এ বছর জানুয়ারি মাস থেকে বিমানের টিকিট বিক্রি বেড়ে যায়। গত ফেব্রুয়ারিতে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয় ২৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। মার্চে ৩৪৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এপ্রিলে ৪১৩ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় প্রতি মাসে এটা বাড়ছে। শুধু গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এ বছরের এপ্রিলে বেড়েছে ১৪৩ কোটি টাকা। সিভিল এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিমান পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা এবং দূরদর্শিতার কারণে বিমান লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। লিজ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সব সময় চেষ্টা করে লিজের চুক্তি যতটা সম্ভব নিজেদের অনুকূলে রাখার। চুক্তির আগে কারিগরি বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বিশ্লেষণ করে বিমান লিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা উচিত। যেন লিজ এনে উড়োজাহাজ বসিয়ে রেখে অর্থ দিতে না হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত যতবার লিজ এনেছে প্রতিবারই নাকে খত দিয়ে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে ফেরত দিতে হয়েছে।  তিনি আরও বলেন, ইজিপ্ট এয়ারের কাছ থেকে লিজ আনার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেল। ওই উড়োজাহাজ যে প্রয়োজনে আনা হয়েছিল তার কিছুই বিমান পেল না। উল্টো ক্ষতিপূরণসহ প্রতি মাসের ভাড়া পরিশোধ করতে হলো। তাহলে প্রশ্ন আসে ওই বিমানের কারিগরি মূল্যায়ন কতটা স্বচ্ছ ছিল। ধোঁয়াশা রেখে লিজ এনে কার স্বার্থ উদ্ধারে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। বিমানকে লাভে আনতে লাভজনক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে।


আপনার মন্তব্য