Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ জুন, ২০১৯ ২৩:১০

বিএনপি অফিসে ছাত্রদলের তালা, পিটুনি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি অফিসে ছাত্রদলের তালা, পিটুনি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন

বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। তিন বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে এবং নতুন কমিটির নেতাদের জন্য নির্ধারিত বয়স সীমা বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দলটির ভেঙে দেওয়া কমিটির শতাধিক নেতা-কর্মী বিক্ষোভ করেন। গত রাত পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের কার্যালয়টিকে ঘিরে রাখতে দেখা যায়। এর মধ্যে দল ও অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মীসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে কার্যালয়ের মূল গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে প্রথমে বিদ্যুৎ ও পরে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে রাখতে দেখা যায়। এ সময় কার্যালয়ের ভিতরে তৃতীয় তলায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ অসুস্থ ও রুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে বিকালে দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তাকে দলীয় কার্যালয়ে দেখতে যান। পরে বিকাল ৪টার দিকে সংগঠনটির বিলুপ্ত কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এজমল হোসেন পাইলট ও যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন নেতা ভিতরে প্রবেশ করে ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের (পূর্ব) সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নসহ আরও ১০ জনকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে অফিস থেকে বের করে আনেন।     

এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রদলের সাবেক নেতারা বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা কারও কোনো কথা শোনেননি। এমনকি তারা মিডিয়ার কোনো সদস্যকেও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকতে দেননি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের ১২ সদস্যের সার্চ কমিটির সদস্যরা।

এর আগে গত ৩ জুন রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। এতে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। নতুন কমিটিতে নেতা হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী যে কোনো বছরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে বলে জানানো হয়। জানা যায়, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী যে কোনো বছরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রার্থী করার বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবি জানান। একাধিক নেতা চিৎকার করে বলেন, একা দুটি পদ নিয়ে কার্যালয় দখল করে বসে আছেন রিজভী আহমেদ। তিনি দলীয় কার্যালয়কে বাড়ি বানিয়ে বসে আছেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন এলে তাদের কাউকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নেতারা কার্যালয়ের পাশে দলের প্রচারসামগ্রী বিক্রির দোকানে বসতে চাইলে সেখানেও তাদের বসতে বাধা দেওয়া হয়। কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও বরকতউল্লাহ বুলু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, ড. আসাদুজ্জামান রিপন।

তারা বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের দাবির কথা শোনার চেষ্টা করেন। এ সময় ক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা দলীয় হাইকমান্ডের (তারেক রহমানের) সিদ্ধান্ত ‘মানি না, মানব না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন এবং বিএনপির এসব নেতাদের ফিরিয়ে দেন। পরে বিএনপি নেতা শরাফত আলী সপু এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদকেও একইভাবে ফিরে যেতে দেখা যায়। গণমাধ্যম কর্মীদের সেখান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। গত মার্চ মাসে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এমন ১২ জন নেতার সমন্বয়ে সার্চ কমিটি করা হয়। তারা হলেন- শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আজিজুল বারী হেলাল, আমিরুল ইসলাম খান আলীম, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদির ভূঁইয়া, হাবিবুর রশীদ হাবিব। এর মধ্যে এই কমিটি কয়েক দফা বৈঠকও করেছে।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের অক্টোবরে রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই বছরের জন্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি করা হয়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। এরপরও প্রায় আড়াই বছর এ কমিটি বহাল ছিল।

১০ জনকে ব্যাপক মারধর : তালাবদ্ধ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভিতর থেকে ছাত্রদলের ১০ জন নেতা-কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে বের করে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ ছাত্রনেতারা। এর মধ্যে ভিতরে থাকা ছাত্রদল ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নকে বিক্ষুব্ধরা  বেধড়ক মারধর করে তৃতীয় তলা থেকে নামিয়ে সিএনজিতে উঠিয়ে দেয়। মারধরের চিত্র ধারণ করতে গেলে ক্যামেরাম্যানদেরও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দেখা যায়।

বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে কার্যালয়ের তালা খুলে ভিতরে ঢোকেন বিক্ষুব্ধ নেতারা। এদের মধ্যে ছিলেন বিলুপ্ত কমিটির আজমল হোসেন পাইলট, আসাদুজ্জামান, ওমর ফারুক মুন্না, মফিজুর রহমান আশিক, আবুল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, বায়েজিদ আরেফিন প্রমুখ। একই সময়ে বিএনপির দফতরের প্রবীণ স্টাফ দলিল উদ্দিনকেও কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধরা। বিক্ষুব্ধরা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকে। তবে তারেক রহমানের নির্দেশে ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা তারা মানেন না বলেও স্লোগান দেন।  তৃতীয় তলায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ তখন অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে দুজন অফিস কর্মী ও চিকিৎসকরাও ছিলেন। এ অবস্থাতেই বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয় তালাবদ্ধ কার্যালয়ে।

রিজভীকে দেখতে গেলেন মির্জা অব্বাস ও গয়েশ্বর : বিএনপি কার্যালয়ে থেকে বেরিয়ে এসে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেছেন, এটা মান-অভিমান, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। বিকাল ৫টার দিকে প্রথমে মির্জা আব্বাস এবং সাড়ে ৫টার পর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নয়া পল্টনের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের তালা খুলে দিয়ে প্রবেশ করতে দেন। দুই নেতাই তৃতীয় তলায় অসুস্থ দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে দেখতে যান এবং চিকিৎসকের কাছে তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। এ সময় তাদের সঙ্গে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম আজাদ, মীর সরফত আলী সপু, রফিকুল ইসলাম মজনুও ছিলেন। মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, এটা কিছু না।

 ওরা মান-অভিমান করেছে, এটা ঠিক হয়ে যাবে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, এটা তেমন কোনো পরিস্থিতি না, যদি আপনারা ফলাও করে প্রচার না করেন। কেউ ব্যথা পেলে চিৎকার দেয়- এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দীর্ঘদিন দলের কতগুলো পদ্ধতিগত কারণে অথবা নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় যোগ্য ছেলেরা তাদের আরাধ্য লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। সে বিষয়টা আমাদের বিবেচনা করতে হবে, তারা দলের জন্য পরিশ্রম করে, তারা বাইরের নয়, সবাই দলের মঙ্গল চায়। অসুস্থ রিজভী আহমেদকে কার্যালয়ের ভিতরে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে বলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান।


আপনার মন্তব্য