Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:১৫

ভয়ঙ্কর বুলবুল ধেয়ে আসছে

উপকূলে সর্বোচ্চ সতর্কতা, চট্টগ্রাম, মোংলা ও নদীবন্দর বন্ধ, ৫-৭ ফুট জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভয়ঙ্কর বুলবুল ধেয়ে আসছে
উত্তাল সাগর। সতর্ক করে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাইকিং। বুলবুলের গতিপথ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ঘণ্টায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। বার বার দিক পাল্টাচ্ছে বুলবুল। আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে। গতি আরও বাড়ার আশঙ্কাও আছে। প্রতি ৬ ঘণ্টা পর ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সাত উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলায় নেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে বিভিন্ন মাত্রার বিপদসংকেত ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ উপকূলের ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে এলে এ সংকেত আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। অবশ্য ইতিমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে।

আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ওই সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি জানান, গতিবেগ আগের চেয়ে বেশি। ঝড়টি এখন যে গতিতে আসছে, তাতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। খুলনা অঞ্চল দিয়ে ঝড় প্রবেশের আশঙ্কা করেন তিনি। এ ছাড়া ঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল, নড়াইল ঝিনাইদহ, মাগুরা, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে ভারি থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক। বৈঠকে উপকূলবর্তী সব জেলা ও উপজেলায় প্রায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপকূলের ১৩ জেলার মধ্যে ৫টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝড়ের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। উপকূলবর্তী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুরসহ ১৩টি জেলায় ২ হাজার করে মোট ২৬ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি জেলায় নগদ ৫ লাখ টাকা করে আগাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৭ জেলার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় লোক সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় ২ হাজার প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটার যে গতি ও যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে তাতে আঘাত হানবে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা রয়েছে। গতি আরও বাড়লেও যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে ফসল ছাড়া বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা নেই। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীকাল (শনিবার) বেলা ১১টায় সচিবালয়ে প্রস্তুতি সভায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা-উপজেলার সংশ্লিষ্টদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন সব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলে ধেয়ে আসায় আবহাওয়া দফতর সন্ধ্যায় বুলেটিনে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলার পরপরই মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অ্যালার্ট-৩ ঘোষণা করে বন্দরে পণ্য বোঝাই ও খালাস বন্ধ করে দিয়েছে। এইসঙ্গে বন্দরে থাকা ১২টি জাহাজকে জেটি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএনএস মোংলা নৌঘাঁটি সব যুদ্ধজাহাজসহ নৌঘাঁটি ও মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিমাঞ্চলের সব পেট্রল জাহাজকে মোংলা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের দুবলারচরে শুঁটকিপল্লীতে অবস্থানরত ১৫ হাজার জেলেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত লোকালয়ে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সন্ধ্যা থেকেই সুপার সাইক্লোন সিডরবিধ্বস্ত শরণখোলা ও মোংলা উপজেলার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় আতঙ্কিত লোকজন আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফকর উদ্দিন জানান, মোংলা বন্দরে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেওয়ার পর বন্দরে অ্যালার্ট- ৩ ঘোষণা করে পণ্য বোঝাই ও খালাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এইসঙ্গে বন্দরে থাকা ১২টি জাহাজকে জেটি সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের পশুর চ্যানেল থেকে সব ধরনের লাইটার জাহাজও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দরে খোলা হয়েছে ২টি কন্ট্রোল রুম।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সুন্দরবনের দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি বনে ভ্রমণে থাকা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন বিভাগের ৮৩ বন অফিসের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা ও বনরক্ষীকে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলে প্রথমে নিজেদের জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পায়রা বন্দরের পরিচালক প্রশাসন যুগ্মসচিব মো. মহিউদ্দিন খান জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকেই আমরা সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টির খোঁজখবর রাখছি। সে অনুযায়ী শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে বন্দরের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো জাহাজগুলো নিরাপদে রাখা হয়েছে। বন্দরে নিয়োজিত ১৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে সবাইকে সর্তক থাকার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আগামীকাল (শনিবার) কয়লাবাহী একটি জাহাজ নোঙর করার কথা থাকলেও মেসেজ দিয়ে ওই জাহাজকে না আসার জন্য বলা হয়েছে। বুলবুলের আঘাত হানার বিষয়টি আমরা সর্বক্ষণ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছি।’

কুয়াকাটাসংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ জেলার সব উন্নয়ন কর্মকা  স্থগিত রেখে শ্রমিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টানা তিন দিনের ছুটি থাকায় কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গতকাল দুপুর ১২টায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে সিবিচসহ পুরো কুয়াকাটায় সতর্কতার মাইকিং করার পর পর্যটকরা তড়িঘড়ি যে যার গন্তব্যের জন্য স্থান ত্যাগ করেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আজ (শুক্রবার) বিকালে বন্দর ভবনে প্রস্তুতি সভা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সাধারণত ৪ নম্বর সংকেত পর্যন্ত বন্দরের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সংকেত বাড়লে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে।’

জেএসসি-জেডিসির শনিবারের পরীক্ষা স্থগিত : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর কারণে সারা দেশে আজ শনিবার অনুষ্ঠেয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক গতকাল রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন। মু. জিয়াউল হক জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর কারণে শনিবারের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থগিত হওয়া জেএসসি পরীক্ষাটি আগামী ১২ নভেম্বর ও জেডিসি পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শনিবারের পরীক্ষা স্থগিত : এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শনিবার (৯ নভেম্বর) অনুষ্ঠেয় সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আজ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ এবং এলএলবির পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা  ফয়জুল করিম শুক্রবার বলেন, স্থগিত পরীক্ষার তারিখ পরে জানানো হবে।

বুলবুলে বন্ধ সুন্দরবনের রাস উৎসব : ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলে ধেয়ে আসার খবরে রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে সুন্দরবনের আলোর কোলে শত বছরের ঐতিহ্য রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১০ নভেম্বর আলোর কোলে তিন দিনব্যাপী এ উৎসব শুরু হওয়ার কথা ছিল। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের হ্যারিটেজ সাইড এই ম্যানগ্রোভ বনে প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করে বর্তমানে ভ্রমণে থাকা শত-শত পর্যটককে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। মোংলা আন্তর্জাতিক বন্দরে জারি করা হয়েছে বিশেষ সতর্কতা। বাগেরহাটে প্রস্তুত হয়েছে ২৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্র। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়ছে বিশাল বিশাল ঢেউ। বইছে ঝড়ো হাওয়া। এ অবস্থায় সাগরে টিকতে না পেরে সুন্দরবনসহ উপকূলের মৎস্যবন্দরে ফেরত আসছে ফিশিং ট্রলারগুলো। সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকিপল্লীতে অবস্থানরত ১৫ হাজার জেলেকে ফিরিয়ে আনতে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

পিরোজপুরে সিডরের কথা মনে করে আতঙ্কিত মানুষ : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে পিরোজপুরে গতকাল বিকাল থেকে চলছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। মানুষের মনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। উপকূল এলাকায় সিডরের সময়ও বিকালের দিকে আজকের মতো আবহাওয়া ছিল- এমনটা মনে করে আতঙ্কিত পিরোজপুর জেলার মানুষ। ২০০৭ সালেও বিকাল থেকে ঠিক এমনই আবহাওয়া ছিল। সেদিন যেমন আবহাওয়া একটু গুমোটভাবে ছিল, আজও তেমন। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ক্ষতির পরিমাণ যাতে কমিয়ে আনা যায় এজন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকবে। এ ছাড়া জেলার ২২২টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভোলায় ৭ নম্বর মহাবিপদসংকেত : জেলা রেড ক্রিসেন্ট সদস্যরা মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী জনগণকে সতর্ক করতে মাইকে প্রচার চালিয়েছেন। জেলা প্রশাসন থেকে খোলা হয়েছে ৮টি কন্ট্রোল রুম। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৬৬৮টি আশ্রয় কেন্দ্র। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছেন। এ ছাড়া প্রশাসনের সকল কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী ও শুকনা খাবার, চাল, টিন মজুদ রয়েছে।

সাতক্ষীরা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাতক্ষীরায় গতকাল ভোর থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনবরত গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বুলবুল মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় ঘোষিত ৪ নম্বর সতর্কসংকেত অনুযায়ী প্রস্তুতি শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। জেলার ১৩৭টি আশ্রয় কেন্দ্র ইতিমধ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে মাইকিং করে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালিদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

বরগুনা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় বরগুনায় ৫০৯টি সাইক্লোন শেল্টার, ৪২টি মেডিকেল টিম, ৮টি জরুরি কন্ট্রোল রুমসহ সিপিপি, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রয়েছেন। বঙ্গোপসাগর-কেন্দ্রিক মাছ ধরা ট্রলার তীরে ফিরতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সহস্রাধিক ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরেছে। বেড়িবাঁধের বাইরের লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। সব মিলিয়ে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরগুনা জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে সাগর বিক্ষুব্ধ থাকায় বন্দরে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আজ সংকেত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অফিস।

পটুয়াখালী : বৈরী আবহাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে গোটা উপকূলীয় এলাকায় থেমে থেমে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বুলবুল আসছে- এমন খবরের পর সারা দিন আকাশ মেঘলা ও বৃষ্টি হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল সকাল থেকে মাছ ধরারত সব ট্রলার উপকূলে নিরাপদে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। এ সময় ঢেউয়ের তোড়ে কুয়াকাটার ঝাউবাগানসংলগ্ন এলাকায় এফবি কুলসুম নামের মাছ ধরা ট্রলার থেকে পড়ে জেলে বেল্লাল হোসেন (৪০) নিখোঁজ রয়েছেন। অভ্যন্তরীণ রুটে ৬৫ ফুটের চেয়ে ছোট সব নৌযান চলা বন্ধ করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। জেলা-উপজেলায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

ঝালকাঠি : যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝালকাঠি জেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাইক্লোন শেল্টার, মেডিকেল টিম, ওষুধপথ্য, শুকনো খাবার, রেড ক্রিসেন্ট কর্মীসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী। জেলায় ৭৪টি সাইক্লোন শেল্টার, স্কুল-কলেজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

খুলনা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে খুলনায় গতকাল সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ভারি মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে আকাশ। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় খুলনার ৯টি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৩৩৮টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। উপকূলীয় দাকোপ ও কয়রা উপজেলায় ২৪ হাজার ৬০ জন সিপিপি স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদফতর ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করলে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ।

১৩ জেলায় ছুটি বাতিল: ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ১৩ জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আজ শনিবার ও কাল রবিবারের সরকারি ছুটি বাতিল করেছে সরকার। গতকাল ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) বাস্তবায়ন বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে। আজকের ছুটির পাশাপাশি রোববার ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি ভোগ করার কথা ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর,  খুলনা, চাঁদপুর, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সরকারি কর্মীরা সেই ছুটি কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি জেলাগুলোর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয় তথ্য বিবরণীতে।

ওমর ফারুক বলেন, ‘সন্ধ্যায় বন্দরের জেটিতে ১৮টি জাহাজ ছিল। আর বহির্নোঙ্গরে ছিল ১৪৯টি জাহাজ। এর মধ্যে ৫৩টি জাহাজ জেটিতে আসার অপেক্ষায় ছিল।’


আপনার মন্তব্য