শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:১৩

চট্টগ্রামে গ্যাস বিস্ফোরণ নিহত ৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে গ্যাস বিস্ফোরণ নিহত ৭
স্বজনদের কান্না। বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ভবনের একাংশ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

চট্টগ্রাম নগরের পাথরঘাটার ব্রিকফিল্ড রোডের পাঁচতলা বড়ুয়া ভবনের নিচতলায় গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণে একই পরিবারের দুজনসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বিকট আওয়াজে এ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে দুটি ভবনের প্রাচীর ও সড়কের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের নন্দনকানন, চন্দনপুরা ও আগ্রাবাদ স্টেশনের ১০ গাড়ি উদ্ধার কাজ শুরু করে। বিস্ফোরণে নিহতরা হলেন পাথরঘাটা এলাকার জুলেখা খানম ফারজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮), কক্সবাজারের উখিয়ার নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়া মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০), রাঙ্গুনিয়ার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬), নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০), মহেশখালীর মো. সেলিম (৪৫) ও পটিয়ার মো. শুক্কুর (৪২)। নিহতদের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে পাঁচজন, কার্ডিওলজি বিভাগে দুজন এবং অর্থোপেডিক, নিউরো ও বার্ন ইউনিটে একজন করে ভর্তি করা হয়। তবে আহতদের মধ্যে চিকিৎসাধীন থাকা সংকটাপন্ন অর্পিতাকে (১৫) ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। নিহতদের সবাই ছিলেন পথচারী। এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাছাড়া ঘটনা তদন্তে বিস্ফোরক অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিসও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করছে। পাঁচ তলা ভবনটির মালিক অমল বড়ুয়া ও টিটু বড়ুয়া। তারা থাকেন ভবনের পঞ্চম তলায়। এটি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ভবনের নিচ তলার বাসিন্দা সন্ধ্যা নাথ  গতকাল সকালে পূজার ঘরে ম্যাচ জ্বালাতেই বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় বিকট শব্দ হয়। আওয়াজে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। ভেঙে যায় ভবনের দরজা-জানালার কাচ। মেঝেতে পড়ে যায় অনেক আসবাবপত্র। ভবনের চতুর্থ তলার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক অঞ্জন কান্তি দাশ বলেন, ‘বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে। বাসার জানালার কাচ ও দরজাও ভেঙে যায়। পরে নিচে নামার সময় দেখি দোতলার দরজা জানালাও ভেঙে গেছে।’ বড়ুয়া ভবনের পাশের দোতলা ভবনের নিচতলার বাসিন্দা প্রিয়া দাশ বলেন, ‘সকালে আমি ও মেয়ে একসঙ্গে শুয়েছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলো। তারপর জানালা দিয়ে ইটের টুকরো আর আবর্জনা এসে ঘরে ঢুকল। এতে আমার মেয়ের মাথা কেটে যায় ও আমিও আঘাত  পেয়েছি।’ পাথরঘাটা ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইসমাইল বালি বলেন, ‘ব্রিকফিল্ড রোডটি সব সময় ব্যস্ত থাকে। বড়ুয়া ভবনে বিস্ফোরণে ১৬ ফুট প্রস্থের সড়কে ভবনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়ে। এ সময় রাস্তায় থাকা মানুষের ওপর দেয়াল পড়ে।’ চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক জসীম উদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস লাইনটি হয়তো পুরনো ছিল। লিকেজ, নাশকতা, কেমিক্যাল আছে কিনা তদন্ত করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে ২টি আবাসিক ভবনের প্রাচীর ও সড়কের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।’

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (দক্ষিণ) শাহ্ মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘গ্যাস লাইনে ত্রুটি থাকায় পুরো বাড়িটি গ্যাস চেম্বার হয়ে গিয়েছিল। তবে ঘটনা তদন্তে বিস্ফোরক অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিস পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিস্ফোরণের মূল কারণ জানা যাবে।’

চসিক : বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের লাশ বহনে সাতটি গাড়ির ব্যবস্থা এবং দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া সাতটি পরিবারকে পরবর্তীতে আরও ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা অপূরণীয় ক্ষতি। সব কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়াদের গ্যাস, বিদ্যুতের লাইনে লিকেজ আছে কিনা নিয়মিত তদারকি করা উচিত। ব্যবহারকারীরা সচেতন হলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’

তদন্ত কমিটি : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেএম শরিফুল হাসানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন।’ অন্যদিকে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জেনারেল ম্যানেজার (বিপণন) সারোয়ার আহমেদকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

হাসপাতাল চিত্র : আহতদের মধ্যে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১০ জনকে। এর মধ্যে ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে ৫ জন, কার্ডিওলজি বিভাগে দুজন এবং অর্থোপেডিক, নিউরো ও বার্ন ইউনিটে একজন করে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন থাকা সংকটাপন্ন অবস্থায় অর্পিতাকে গতকাল দুপুরেই ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। তার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যায়। বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. নারায়ণ চন্দ্র ধর বলেন, ‘অর্পিতার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যায়। আগুন তার শ্বাসনালিতেও সংক্রমণ হয়েছে। তার অবস্থা গুরুতর।’ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন ইসমাইল (৩০), আবদুল হামিদ (৪০, ইউসুফ (৪০), আরিফ (১৫), নাজির (৬৫), নওরিন তিসা ঘোমেজ (২২), সন্ধ্যা রানী নাথ (৩৫), অর্পিতা রানী দেবি (১৬) ও আবু তালেব (৪৫)। আহত একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

‘গ্যাস বিস্ফোরণ হয়নি’ : বড়ুয়া ভবনে গ্যাস বিস্ফোরণের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। কেজিডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন এবং কারিগরি বিষয়গুলো তদন্ত করেছি। গতকাল সন্ধ্যায় আমরা তদন্ত প্রতিবেদন কেজিডিসিএলের মহা-ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থায় জমা দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আমাদের গ্যাসের পাইপলাইন ও রাইজার অক্ষত রয়েছে, যা থানায় রক্ষিত আছে। তবে আমাদের মনে হয় আশপাশের কোনো সেপটিক ট্যাংক থেকে বিস্ফোরণ হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সময় সেপটিক ট্যাংক থেকেও বিস্ফোরণ হয়। এখানেও একটি সেপটিক ট্যাংক আছে। হয়তো সেখান থেকে বিস্ফোরণ হতে পারে। গ্যাসের আগুন হলে অনেক্ষণ ধরেই তা জ্বলতে থাকে। তাছাড়া তিন বছর আগে সাগরিকায় একটি সুয়ারেজ থেকে গ্যাস বিস্ফোরণ হয়ে পাশের একটি ব্রিজও উপড়ে যায়, সরে যায় মাটি।’


আপনার মন্তব্য