শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ মার্চ, ২০২০ ২৩:২১

মাঠে নামবে আজ সশস্ত্রবাহিনী

২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ, সীমিত আকারে ব্যাংকিং ও গণপরিবহন চলাচল, হাসপাতাল দোকানপাট ও জরুরি সেবা খাত খোলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাঠে নামবে আজ সশস্ত্রবাহিনী
গতকাল বাড়ি ফিরতে মানুষের ঢল নামে সদরঘাট টার্মিনালে -বাংলাদেশ প্রতিদিন

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আজ থেকে মাঠে নামছে সশস্ত্রবাহিনী। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে তারা স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সশস্ত্রবাহিনী মাঠে থাকবে। একই সঙ্গে সরকার আগামী ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকলেও এই সময়ে হাসপাতাল, ফার্মেসি, খাদ্যপণ্যের দোকান ও কাঁচাবাজার খোলা থাকবে। আর সব কিছু বন্ধ থাকবে। দেশবাসীকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই বাসা-বাড়ির বাইরে বের না হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গণপরিবহন এড়িয়ে চলার জন্য জনগণকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক-বীমা তাদের সুবিধামতো সীমিত আকারে খোলা রাখার ব্যবস্থা করবে। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, দুর্যোগ্য ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, তথ্য সচিব বেগম কামরুন্নাহার, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস বলেন, জাতীয় নয়, এটি একটি বৈশি^ক প্রাদুর্ভাব। বাংলাদেশে এর বেশ কিছু নমুনা পাওয়া গেছে এবং ইতিমধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এটি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সরকারের সমস্ত কিছু যুক্ত হয়েছে। চীনের উহানে এই প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের দেশে এ নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ হচ্ছে। মুখ্য সচিব বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি এবং তা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর আজ (সোমবার) দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব এবং অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেন। মুখ্য সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সভা ও আলোচনা করছেন। তিনি নিয়মিত আপডেট নিচ্ছেন এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন। মুখ্য সচিব বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে থেকে লকডাউনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু লকডাউন কোনো সায়েন্টিফিক সমাধান নয়। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১০টি নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব সরকারের নেওয়া ১০টি সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এটি করতে আজ থেকে সারা দেশে মাঠে নামবে সেনাবাহিনী। সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের কেউ নির্ধারিত কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যতামূলক সময় পালনে অবহেলা করছে কি না- সেনাবাহিনী তা পর্যালোচনা করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা এ জন্য স্থানীয় সেনাবাহিনী কমান্ডারের কাছে সেনাবাহিনী কর্তৃক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য আইনানুযায়ী অনুরোধ জানাবেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সরকার আগামী ২৬ মার্চের সরকারি ছুটির সঙ্গে ২৭ ও ২৮ মার্চের সাপ্তাহিক ছুটি এর সঙ্গে ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করছে। এর সঙ্গে ৩ ও ৪ এপ্রিল সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হয়ে মোট ১০ দিন ছুটি ঘোষণা করছে। এই সময়ে কাঁচাবাজার, খাবার এবং ওষুধের দোকান, হাসপাতাল এবং জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে না। করোনাভাইরাসের বিস্তৃৃতি রোধকল্পে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে জনসাধারণকে এই মর্মে অনুরোধ করা যাচ্ছে যে, তারা যেন এ সময় জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (খাদ্য দ্রব্য, ওষুধ ক্রয়, চিকিৎসা, মৃতদেহের সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে না আসেন। এই সময়ে বিভিন্ন অফিস আদালতের প্রয়োজনীয় কার্যাবলি অন-লাইনে সম্পাদন করতে হবে। সরকারি অফিসসমূহের মধ্যে যারা প্রয়োজন মনে করবে তারা অফিস খোলা রাখবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এই সময়ে গণপরিবহন চলাচল সীমিত থাকবে। জনাসাধারণকে যথাসম্ভব গণপরিবহন পরিহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করবেন তাদেরকে অবশ্যই করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গাড়িচালক এবং সহকারীদের অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস পরাসহ পর্যাপ্ত সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি জানান, জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ছুটিকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে। খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে নিম্ন-আয়ের কোনো ব্যক্তি শহরে জীবনযাপনে অক্ষম হলে সরকার তাকে ঘরে ফেরা কর্মসূচির অধীনে নিজ গ্রাম/ঘরে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ঘোষণা করছে। জেলা প্রশাসকরা এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। সরকার ভাসানচরে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করেছে। সে সঙ্গে আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে সরকার এই সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের স্বনির্ভর করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যক্তিকে সেখানে প্রেরণের জন্য সব জেলা প্রশাসককেও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। করোনাভাইরাস জনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়-অন্নসংস্থানে অসুবিধা নিরসনে জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ৫০০ ডাক্তারের তালিকা করার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন যেন, তারা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ সরকার সব রকম সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অসুস্থ, জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মসজিদে না যেতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তা ভঙ্গ করে একজন মিরপুরে মসজিদে যাওয়ায় অন্য ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং ধর্মীয় নেতাদের অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা জানানোর পর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, গার্মেন্টস কারখানা বন্ধের বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, গার্মেন্ট কারখানাগুলো সরকারের ক্লোজ মনিটরিংয়ের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া এগুলো পিপিই তৈরির কাজও করছে। তিনি বলেন, গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকরা বাসা থেকে কারখানায় যায়, আবার বাসায় ফিরে যায়। তারা ঝুঁকির মধ্যে নেই। এখন যদি কারকানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে কেউ যদি আক্রান্ত হন তাহলে সেই ব্যক্তির মাধ্যমে আরও লোক আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ২৪ মার্চ থেকে না দিয়ে ২৬ মার্চ থেকে কেন ছুটি দেওয়া হলো জানতে চাইলে মুখ্য সচিব বলেন, আজ ও আগামীকাল দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে যাতে লোকজন তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে পারে। এরপর যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে যাবে। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর লকডাউন নিয়ে ডিসি ও ইউএনও-এর মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে সে সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি আর হবে না। এ ব্যাপারে সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। রাজধানীতে কোয়ারেন্টাইনের জন্য বেসরকারিভাবে নেওয়া দুটি হাসপাতালের একটিতে স্থানীয়দের বাধার বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রথম দিকে স্থানীয়রা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন। এগুলো এখন সমাধান হয়ে গেছে। আর কোনো সমস্যা হবে না। সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বলেন, ‘আমাদের মোবাইল হসপিটাল আছে। এ ছাড়া আমরা জরুরি প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল স্থাপন করব।’


আপনার মন্তব্য