শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ মে, ২০২০ ২৩:৫৮

দুর্যোগ মোকাবিলার কাজ আমলানির্ভর হতে পারে না

ড. আইনুন নিশাত

দুর্যোগ মোকাবিলার কাজ আমলানির্ভর হতে পারে না

বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, বজ্রপাত- এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা। এ দেশের মানুষের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাও অনেক। ব্রিটিশ শাসনামলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়া-পুনর্বাসন করাটাই মূল লক্ষ্য থাকে। লজ্জার বিষয় হচ্ছে, এখনো সেই পুরনো ধ্যান-ধারণায় আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা চলছে। মূলত আমলাতান্ত্রিকভাবে এ কাজগুলো করা হয়।

আমরা দেখি, একটি দুর্যোগের পর সরকার থেকে প্রশাসনের মাধ্যমে কিছু ঢেউটিন, কিছু চাল ও কিছু টাকা দেওয়া হয়। স্বাধীন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুই ধরনের ধাপ থাকবে। একটা হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ে কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। যেমন বছরে দুটি সময়ে এপ্রিল-মে মাসে অথবা অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর জন্য উপযুক্ত উচ্চতাসহ শক্ত বেড়িবাঁধ। দুর্যোগ শুরু হলে সেখানে কাজ করার সময় নয়। স্বাভাবিক সময়ে পরিকল্পনার মধ্যে এগুলো করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ হলো, দুর্যোগকালীন সময়ে। যখনই এর আলামত পাওয়া যায়, সতর্ক সংকেত থাকুক আর না থাকুক এর আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হবে। যেমন বাঁধগুলো মেরামতের কাজ করে ফেলতে হবে। আমরা দেখেছি, বিগত সময়ে আইলার পরে বাঁধ মেরামতে দুই-তিন বছর লেগেছে। এটা কেন হবে? তাৎক্ষণিকভাবে কাজগুলো করে ফেলতে হবে। ঝড়ের সময় বাঁধ ভেঙে পড়বে এটা আমরা জানি। তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধ রক্ষার কাজটি সেরে ফেলতে হবে। বাংলাদেশের ভালো জিনিস হচ্ছে, দুর্যোগের সময় কার কী দায়িত্ব সেটা ভাগ করে দেওয়া আছে। দুর্যোগের প্রাক-প্রস্তুতির সময় কী হবে, দুর্যোগ চলাকালীন কী হবে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী কী হবে- সে ব্যবস্থাপনা আছে। এ জন্য নতুন কোনো আদেশ বা নির্দেশনার প্রয়োজন নেই।

এবার আমরা লক্ষ্য করেছি, দুর্যোগ মন্ত্রণালয় চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই তৎপর ছিল। তারা প্রশংসার দাবিদার। তারা কী করতে হবে সে বিষয়ে জেলা ও থানা পর্যায়ে আদেশ জারি করেছেন। একই কাজ করতে দেখেছি কৃষি মন্ত্রণালয় ও মৎস্য মন্ত্রণালয়েও। তবে পানি মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করেছে সেটাই কি পর্যাপ্ত? তারা মেরামতের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। আমার বক্তব্য হচ্ছে, পরবর্তী পর্যায়ে অভিজ্ঞতার আলোকে বেড়িবাঁধ ভেঙে যেখানে পানি জমেছে সেখানে পানি যেন না থাকে। লোনা পানি যেন দুবার জোয়ারের সময় ওঠে এবং ভাটার সময় বেরিয়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় পানি বেরুতেও পাঁচ-সাত দিন সময় লাগবে। জমিটা নষ্ট হবে। অর্থাৎ খুব দ্রুত যেখানে যেখানে ভেঙেছে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করতে হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এমনিতেই খাবার পানি সংকট। বাঁধ ভাঙার মাধ্যমে এই সংকট আরও তীব্রতর হবে। কাজেই খাবার পানির ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। বাড়িঘর ভেঙে গেছে। এগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে। মানুষের বসবাস উপযোগী করতে হবে। নইলে মানুষজন বাঁধের ওপরে বসবাস করতে বাধ্য হবে। এতে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হবে। চারদিকে পানি থাকার কারণে বাঁধই সুবিধাজনক জায়গা। চারদিকে থই থই পানি, বাড়িঘর ভেঙে গেছে। এ জন্য শেল্টারগুলোতে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের কথা ভাবতে হবে। বহুদিন শেল্টারে আশ্রয় নিতে হলে তা নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে। শেল্টারগুলো করোনাকালে আরও রোগ ছড়ানোর আশঙ্কার কারণ হবে। সেখানে তারা গাদাগাদি করে থাকছে। তাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মূল কথা হচ্ছে, প্রচলিতভাবে আমরা দুর্যোগের পর ভিক্ষার মতো কিছু ঢেউ টিন, গম, চাল বা টাকা-পয়সা দিই। এটার পরিবর্তে এখানে অ্যাকশনে আসতে হবে, যাতে মানুষ যত শিগগির সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারে। কৃষি ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় কিছু কথাবার্তা বলেছে। তারা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। কথা হচ্ছে, সেই পরামর্শগুলো বাহ্যিকভাবে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমলাদের পরিবর্তে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দিতে হবে। কেউ কেউ বলতে পারেন, জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে দায়িত্ব দিলে দলীয়করণ করতে পারেন। আমাদের সমাজকে এ ধরনের প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো একটা সময় আমাদের শুরু করতে হবে। যাতে আমরা এ ধরনের প্রবৃত্তির মধ্যে আটকে না থাকি।

আমলাদের পরিবর্তে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দিতে বলছি এ কারণে যে, আমলারা তো রাষ্ট্রের সেবক। তারা জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশমতো কাজ করবেন। তারা জনপ্রতিনিধিদের সহায়ক হিসেবে কাজ করবেন। বাংলাদেশে এখন দায়িত্বশীল অফিসার হলেন মন্ত্রী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। সরকার যে ’৯৬-৯৭ সালে নিয়ম পরিবর্তন করেছে তাতে বলা আছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের জন্য দায়ী হচ্ছেন মন্ত্রী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যদি সত্যিকার অর্থে চালু হতে হয়, তাহলে এটা আমলানির্ভর হতে পারে না। তারা হচ্ছে জনগণের সেবক, সহায়ক। সেবকরা প্রভু হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের সেবক।

এমনিতেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। এখানে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। আবার কিছু দুর্যোগ হঠাৎ করে আসে। এ মাসের প্রথম দিক থেকেই কিন্তু ভারত মহাসাগরে যে নিম্নচাপটি হয়েছিল, সেটা আমরা জানি। আমাদের আবহাওয়া দফতর তেমন কোনো প্রচার করেনি। কিন্তু বিশ্ব আবহাওয়াবিদরা আম্ফানের কথা আমাদের জানিয়েছে। নিম্নচাপ হলেই যে আমাদের উপকূলে আঘাত হানবে তা নয়, কিন্তু এটাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

আবহাওয়া দফতর যেভাবে কাজ করে তা ছেঁটে দিতে হবে। আবহাওয়া দফতরকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। এ নিয়ে আমি ২০-৩০ বছর ধরে বলে আসছি। তারা অনাবশ্যকভাবে তর্ক করে। তারা যেটা করে সেটা ঠিক আছে বলতে চায়। এটা মোটেও ঠিক নয়। আপনি চাঁদপুরকে দিলেন ১০ নম্বর সংকেত, কক্সবাজারকে দিলেন ৯ নম্বর সংকেত। এর মানেটা কী? কক্সবাজারে তো আম্ফানের প্রভাব তেমন থাকার কথা নয়। তাহলে এই যে সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে যে সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়, এটাকে পুরোপুরি বাতিল করে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। ভারত, ফিলিপাইন, জাপান, আমেরিকা, হল্যান্ড, ইংল্যান্ড যে পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাদেরও সেই পদ্ধতি চালু করতে হবে। পুরনো পদ্ধতি কিছু দিন চালু রাখতে হবে। নতুন পদ্ধতি চালু না হওয়া পর্যন্ত। এটা নিয়ে প্রচার করতে হবে, যাতে মানুষ অভ্যস্ত হয়। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেলে পুরনোটা পর্যায়ক্রমে বাতিল করে দিতে হবে। ব্রিটিশ শাসন আমলের সতর্ক সংকেত বদলানোটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

অনুলিখক : মাহমুদ আজহার


আপনার মন্তব্য