শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ জুন, ২০২০ ০০:০৯

করোনাভাইরাস

প্রতিরক্ষা সচিব, সাংবাদিক মোজাম্মেল ডা. রতন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রীর স্ত্রীর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিরক্ষা সচিব, সাংবাদিক মোজাম্মেল ডা. রতন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রীর স্ত্রীর মৃত্যু

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানু, প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী, গেদুচাচা খ্যাত সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মোজাম্মেল হক, বিশিষ্ট চিকিৎসক রতনস ডেন্টালের মালিক ডা. সৈয়দ তমিজুল আহসান রতন (৬৩)। তারা প্রত্যেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। প্রতিরক্ষা সচিব মোহসীন চৌধুরী : করোনা আক্রান্ত হয়ে গতকাল মারা যাওয়াদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী হচ্ছেন সরকারের সিনিয়র সচিব। তার মৃত্যুতে এই প্রথম সরকারে কর্মরত কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু হলো।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন আবদুল্লাহ আল মোহসীন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর গত ২৯ মে তিনি সিএমএইচ-এ ভর্তি হন। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে গত ৬ জুন আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে প্লাজমা থেরাপিও দেওয়া হয়। ১৮ জুন থেকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী গত ১৪ জুন সিনিয়র সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। প্রয়াত মোহসীন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর ছোট ভাই। ১৯৬৩ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮৫ সালের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে গত ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে বদলি করা হয়।

লায়লা আরজুমান্দ বানু : এর আগে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল পৌনে আটটায় মারা যান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানু। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্বামী, এক ছেলে, দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

১২ জুন মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীর কভিড-১৯ পরীক্ষার পজিটিভ ফল আসে। পরদিন তাদের ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২১ জুন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও তাঁর স্ত্রী সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন। গত রবিবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

সাংবাদিক মোজাম্মেল হক : গেদুচাচা খ্যাত কলামিস্ট ও সাংবাদিক জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য  খোন্দকার মোজাম্মেল হক গতকাল বিকাল ৪টায় ইন্তেকাল করেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। খোন্দকার মোজাম্মেল সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয় পত্রিকার সম্পাদক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন।

সাংবাদিক মোজাম্মেলের প্রথম জানাজা আজ সকাল ৯টায় সেগুনবাগিচায় তার বাসার সামনে এবং দ্বিতীয় জানাজা বিকাল ৩টায় ফেনীর ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাকে সোনাপুর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক খোন্দকার মোজাম্মেল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন এবং  সাবেক মন্ত্রী জাফর ইমাম বীরবিক্রম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শফিকুল বাহার মজুমদার টিপু।

এছাড়া শোক জানিয়েছে, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নির্বাহী কমিটি। বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল ও মহাসচিব শাবান মাহমুদ এবং ডিইউজে সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপুসহ কমিটির নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের সাংবাদিকতায় খোন্দকার মোজাম্মেল হকের অবদান অপরিসীম। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকান্ডেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

ডা. আহসান রতন : করোনার উপসর্গ নিয়ে রতনস ডেন্টালের মালিক ডা. সৈয়দ তমিজুল আহসান রতন (৬৩) গতকাল মারা গেছেন। রাজধানীর জাপান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোর সাড়ে ৬টায় তার মৃত্যু হয়। জানা গেছে, গত ৩১ মে থেকে ডা. রতনের জ্বর ছিল। তিনি বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে বারডেম হাসপাতালে যান। সেখান থেকে গত রবিবার তাকে জাপান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে আনা হয়। তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ডা. রতনের গত রবিবার করোনা টেস্ট করা হয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট এখনো আসেনি বলে জানা গেছে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানু, প্রতিরক্ষা সচিব মোহসীন চৌধুরী ও সাংবাদিক খোন্দকার মোজাম্মেল হকের মৃত্যুকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি  শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে মোজাম্মেল হকের অবদান স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী প্রয়াতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতিও সমবেদনা জানান। এ ছাড়া এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো শাহাব উদ্দিন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ ও প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সচিব জিয়াউল হাসান এনডিসি, হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন প্রমুখ। আরও শোক প্রকাশ করেছে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম- মুক্তিযুদ্ধ’৭১। শোকবার্তায় স্বাক্ষর করেন মেজর জেনারেল (অব.) কেএম সফিউল্লাহ বীরউত্তম, মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তম, লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক হারুন হাবীব। আরও শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোরশেদ খান এবং মহাসচিব এমদাদ হোসেন মতিন। এদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানুকে গতকাল বাদ জোহর গাজীপুর সিটি করপোরেশন কেন্দ্রীয় গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। এর আগে কবরস্থান সংলগ্ন বায়তুল মোয়াজ্জাম জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রীর একমাত্র ছেলে এ টি এম মাজহারুল হক তুষার তার মায়ের নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মো. ইকবাল হোসেন সবুজ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে জানাজায় অংশ নেন। ১৯৪৯ সালের ৬ জানুয়ারি লায়লা আরজুমান্দ বানু গাজীপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর  পিতার নাম শেখ মোবারক জান এবং মাতার নাম লাল বানু। ১৯৭৪ সালের ১৬ এপ্রিল আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে তার বিবাহ হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর