শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ আগস্ট, ২০২০ ২৩:৫৮

অনিয়মে বেপরোয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের এক প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ে শেষ নেই কাহিনির

রুহুল আমিন রাসেল ঢাকা, সাইদুল ইসলাম ও রেজা মোজাম্মেল চট্টগ্রাম

অনিয়মে বেপরোয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের এক প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ে শেষ নেই কাহিনির

ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম আর দুর্নীতিতে বেপরোয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রধান প্রকৌশলী অখিল কুমার বিশ্বাস। জানা গেছে, এই অখিলের হাত দিয়েই জলে ভাসছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শত শত কোটি টাকার প্রকল্প। সরকারি টাকা জলে ভাসিয়ে তা আবার নিজের পকেটে ভরে অখিল কুমার বিশ্বাস এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। অনিয়ম আর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত অখিলের কর্মজীবন। অতীতে যেখানেই ছিলেন, সেখান থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে বিতাড়িত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুদকেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের আড়ালে একটি কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলে সূত্র জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অখিল কুমার বিশ্বাস চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকে বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে থাকেন না। তিনি অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানান, কয়েকটি প্রকল্পের কাজ ঢাকার একটি বিশেষ কোম্পানিকে পাইয়ে দিতেই রাজধানীতে বসে অবৈধ লেনদেন ও দেনদরবার করছেন অখিল। কালো তালিকাভুক্ত ওই কোম্পানিকে নদী খননের কাজ দিতে এখন মরিয়া ঘুষখেকো প্রধান প্রকৌশলী অখিল কুমার বিশ্বাস। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারাও অনুসন্ধানে নামছেন বলে সূত্র জানিয়েছেন। এদিকে সরেজমিনে প্রধান প্রকৌশলীর সরকারি বাংলোয় দেখা যায় সুনসান নীরবতা। আলাপকালে ওই বাংলোর নিরাপত্তাকর্মী মো. জামাল বলেন, ‘স্যার বাসায় নেই। বর্তমানে ঢাকায় আছেন।’ সূত্র জানান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ছোট-বড় প্রায় ১৪টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- প্রায় ৩৫৪ কোটি টাকার সাঙ্গু-ডলু খাল (২১ কিলোমিটার নদীর ড্রেজিংসহ) উন্নয়ন, ১৫৪ কোটি টাকার হালদা নদী ও ধুরং খাল উন্নয়ন, ৫৭৭ কোটি টাকার আনোয়ারার সিধাই খাল (সংযোজিতসহ) উন্নয়ন এবং বাঁশখালী উপজেলার ৬৪/১-এর পুনর্বাসন প্রকল্পসহ ১৪টি কাজ। প্রধান প্রকৌশলী কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শনের পরও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় স্থানীয় জনগণ ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার চরম অবহেলায় চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হচ্ছে না। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজগুলোর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এ কারণে বৃদ্ধি পায় প্রকল্পের ব্যয়, সঙ্গে বাড়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের ভোগান্তি। প্রতিটি কাজে প্রধান প্রকৌশলীর পদে পদে অনিয়ম আর নেতিবাচক ভূমিকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। এসব নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী সবার সঙ্গে কৌশলী ও ছলচাতুরী করছেন বলেও জানা যায়। তিনি বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের পর নিজ অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, অফিসে নিজের বলয় তৈরি ও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসা বরাদ্দ না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অখিল কুমার বিশ্বাস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাকে কখনো দুদক তলব করেনি। এ তথ্যগুলো ভুল। দুদকে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’

সূত্র জানান, ২০১৫ সালে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে অখিল কুমার বিশ্বাস কপোতাক্ষ খনন প্রকল্পে ২৬২ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিস্তীর্ণ জনপদের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং এ অঞ্চলকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প শুরু হয়েছিল। কিন্তু পাউবোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী অখিল কুমার বিশ্বাস এবং তার অনিয়ম-দুর্নীতির পার্টনার ঠিকাদারদের দুর্নীতিতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে কপোতাক্ষ নদ নাব্য পায় না। সৃষ্টি হয় নতুন জলাবদ্ধতা। অপচয় হয় সরকারি অর্থ। কিন্তু কোনো রকমের জবাবদিহি ছাড়া ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ২০১৫ সালে মন্ত্রণালয়ে বলেছিলেন, কপোতাক্ষ খনন প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা আনতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পরে আর সে কমিটি হয়নি।

জানা গেছে, ২৬২ কোটি টাকার চার বছর মেয়াদি এ খনন প্রকল্পে শুরু থেকে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছিল, দিন দিন তা আরও জোরালো হচ্ছে। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন উপকূলীয় জনপদের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। এসব দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট বন্ধে ‘কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন সমন্বয় কমিটি’, ‘সীমানা নির্ধারণ ও দুর্নীতিমুক্ত কপোতাক্ষ খনন বাস্তবায়ন কমিটি’সহ বিভিন্ন সংগঠন অখিল কুমার বিশ্বাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বহু সভা- সমাবেশও করেছে। প্রসঙ্গত, কপোতাক্ষ নদ খননে ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকার চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। ২০১২ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়নাধীন খাল পুনঃখনন প্রকল্প ঘিরেও অখিল কুমার বিশ্বাসের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার বেশির ভাগই মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন। সূত্র জানান, মাদারীপুর সদরের একটি খালের ৬ কিলোমিটার (পূর্বরাস্তি থেকে হাজরাপুর পর্যন্ত) পুনঃখননের কাজ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ এইচ ট্রেডিং করপোরেশনকে। ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। নিয়ম অনুযায়ী খালটি ৩-৪ মিটার খনন করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খালটির দুই পাড়ের ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করেই কাজ শেষ করে। খনন করলে খালের আশপাশে মাটি থাকার কথা। কিন্তু আশপাশে মাটি পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী অখিল কুমার বিশ্বাস ওই সময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি কাজটি সঠিকভাবেই হয়েছে।’ মাটি কোথায় রাখা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘খাল খননের মাটি এলাকাবাসী চুরি করেছে।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর