শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:২০

হাজার কোটি কালো টাকা

কর ফাইলেও গোল্ড মনিরের ভয়াবহ জালিয়াতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাজার কোটি কালো টাকা

প্রথমে ছিলেন দোকানের বিক্রয়কর্মী। এরপর তার পেশা হয় সোনার ব্যবসা। কালোবাজারি করে সোনা আনায় তার পরিচিতি হয় গোল্ড মনির নামে। এরপর হাজার কোটি কালো টাকার মালিক হয়েছেন। কর ফাইলেও করেছেন ভয়াবহ জালিয়াতি। মনির তার আয়কর বিবরণীতে দাবি করেছেন, তার কাছে আছে ৫০ হাজার টাকার সোনা। অথচ অভিযানে তার বাসাতেই সোনা পাওয়া যায় ৮ কেজি। অনেকটা আকস্মিক অভিযানে গ্রেফতার হন মনির। সম্পদ, নগদ টাকা, জালিয়াতি করে দখল এবং সোনা চোরাচালানি সবকিছুতে তার বিস্ময়কর উত্থান।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা খুঁজে পেয়েছেন গোল্ড মনিরের হাজার কোটির বেশি কালো টাকা। আর কর ফাইলে তুলে ধরেছেন মাত্র ২৬ কোটি টাকা। তার কয়েক শ কোটি টাকা পাচারের তথ্য মিলেছে। এরই মধ্যে তার মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গোল্ড মনিরের নামে থাকা সব সম্পদের বিবরণী পেতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি দেওয়া হচ্ছে এবং সব নথিপত্র হাতে পেলে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির কর্মকর্তারা। গোয়েন্দারা বলছেন, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে তার নামে পাওয়া গেছে প্রায় সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা। রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় প্লট আছে ২০০টির বেশি। রাজউক পূর্বাচলে ৭টি, বাড্ডায় ১৯২টি প্লট, নিকুঞ্জ-২-এ ৭০ কাঠা আয়তনের প্রাতিষ্ঠানিক প্লট-১ নম্বর রোডে স্কুল, উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে নির্মাণাধীন সাফা টাওয়ারের মালিকও এই গোল্ডেন মনির। এ ছাড়া উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে তার মালিকানায় রয়েছে জমজম টাওয়ার। কিন্তু ২০১৯-২০ আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, তার সম্পদের পরিমাণ ২৫ কোটি ৮২ লাখ, যা মনিরের বাস্তব সম্পদের চেয়ে অনেক কম। নিজের অপকর্ম ঢাকতে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত উপহার পাঠাতেন মনির। সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে একটি প্রাডো গাড়ি উপহার দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তারা। র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, র‌্যাব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে     সিআইডির কাছে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে পত্রালাপ করেছে। এ ছাড়া শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। বিআরটিএর সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করেছে।

এদিকে পুলিশ বলছে, মনিরের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে পৃথক তিনটি মামলার তদন্ত ২৪ নভেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেহেতু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর মামলা, সেই বিবেচনায় ডিবির গুলশান বিভাগ তদন্তে নেমেছে।

অবৈধ অস্ত্র, মুদ্রা ও মাদকসহ করা তিন মামলার তদন্তে গতকাল প্রথম দিনের মতো গোল্ডেন মনিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি পুলিশ। আগের দিন মামলার নথিপত্রসহ তাকে বাড্ডা থানা পুলিশের হেফাজত থেকে নিজেদের কার্যালয়ে নিয়ে যায় ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিন গোল্ডেন মনির বেশির ভাগ সময়ই চুপ থেকেছেন। তার সম্পদের উৎস কী, রাঘব-বোয়ালরা তাকে কীভাবে, কখন, সহযোগিতা করতেন এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। কোন কোন দলে কার মাধ্যমে অর্থায়ন করতেন এবং কোন কোন দেশে তার সম্পদ রয়েছে, কার কাছে টাকা পাচার করেছেন, সে বিষয়ে এখনই মুখ খোলেননি মনির। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে তার টাকা পাঠানোর বিষয়ে প্রাথমিক কিছু তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন।

২১ নভেম্বর গ্রেফতারের পরদিন মাদক, অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের তিন মামলায় ১৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে বাড্ডা থানা পুলিশ। রিমান্ডের প্রথম দুই দিনের জিজ্ঞাসাবাদে মনির তার অবৈধ অর্থ-সম্পদ এবং এসব সম্পদ অর্জনের পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তার দেওয়া এসব তথ্য তারা খতিয়ে দেখছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গোল্ডেন মনির সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলুষিত করেছেন। রাজউক থেকে বেশির ভাগ সম্পদ বেনামে করেছেন তিনি। এসব কাজে রাজউকের কারা জড়িত এর তথ্য উপাত্ত নিচ্ছি। আমরা তথ্য নিচ্ছি তার টাকা পাচারের বিষয়েও। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাতে অনেক সময় আছে। তার কাছে আরও ভালো কিছু তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’ ডিবি সূত্র জানায়, গোল্ডেন মনির সরাসরি কোনো সম্পদের মালিকানা নিজের নামে করতেন না। প্রথমে ভুয়া দাতার নামে রেজিস্ট্রি করতেন। এরপর তার কাছ থেকে নিজের, স্ত্রীর ও মায়ের নামে দান হিসেবে লিখে নিতেন। তবে যেসব দাতার কাছ থেকে তিনি দান গ্রহণ করেছেন, বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। নিজের অবৈধ সম্পদ রক্ষায় সব সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন মনির।


আপনার মন্তব্য