শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৫৪

মিয়ানমারে যত্রতত্র লাশের স্তূপ, মৃত্যুদন্ড ১৯ বিক্ষোভকারীর

প্রতিদিন ডেস্ক

মিয়ানমারে যত্রতত্র লাশের স্তূপ, মৃত্যুদন্ড ১৯ বিক্ষোভকারীর
মিয়ানমারে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড পুড়িয়ে দেয় -এএফপি

সামরিক জান্তা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর মিয়ানমারে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেনাদের হাতে প্রতিদিন হত্যাকান্ড ঘটছে এবং এসব লাশ না সরানোয় তা যত্রতত্র স্তূপ আকারে জমে রয়েছে। দেশটিতে মাত্র দুই মাসে সাড়ে ৬০০’রও বেশি প্রতিবাদকারীকে হত্যা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে বলা হয়েছে। গত শুক্রবার সামরিক আদালতে বিচার করেও ১৯ বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ড এবং ভারতে পালানোর চেষ্টা করছে। সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন। এক খবরে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের গড়ে তোলা ব্যারিকেড অপসারণ করতে গিয়ে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় শহর বাগোতে ৬০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রাচীন এই শহরটির প্যাগোডা ও স্কুলের খেলার মাঠে মরদেহ স্তূপ করে  রেখেছে জান্তা সরকারের বাহিনী। মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম রেডিও ফ্রি এশিয়ার (আরএফএ) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শুক্রবার মিয়ানমারের বাগো শহরে গুলিবৃষ্টি চালিয়েছে পুলিশ ও  সেনাবাহিনী। খবরে বলা হয়, গত ১ ফেব্রুয়ারির সেনা অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করতে বাগো শহরের রাস্তায় এই ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের শহরটিতে শুক্রবার সন্ধ্যা নামার আগেই অভিযান শুরু করে নিরাপত্তাবাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগো শহরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের মানুষেরা বুঝতে পেরেছিল তারা (নিরাপত্তা বাহিনী) আসতে পারে। আর এজন্য রাতভর অপেক্ষা ছিল। সেনা সদস্যরা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আমরা মর্টার শেলও পেয়েছি। মেশিনগান দিয়েও প্রচুর গুলি করা হয়েছে। তাজা গুলি ছাড়াও সেনা সদস্যরা  গ্রেনেড লাঞ্চারও ব্যবহার করেছে।’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত মাত্র তিনটি মরদেহ উদ্ধার করতে পেরেছেন তারা। এছাড়া জিয়ামুনি প্যাগোডা এবং কাছের একটি স্কুলে স্তূপ করে রাখা মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছে  সেনাবাহিনী। এদিকে বাগো শহরের এই রক্তক্ষয় নিয়ে এখন পর্যন্ত  কোনো মন্তব্য করেনি মিয়ানমারের সেনা সরকার। অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে অন্তত ৬৫০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।

১৯ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদন্ড : সামরিক বাহিনীর এক সহযোগীকে হত্যার অভিযোগ এনে মিয়ানমারের ১৯ জন অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন মিয়াওয়াড্ডি টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, ইয়াঙ্গুনের একটি জেলায় ওই সহযোগীকে খুন করা হয়। টানা বিক্ষোভের মধ্যে ২৭ মার্চ ইয়াঙ্গুনের উত্তর ওক্কালাপা জেলায় সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনকে মারধর এবং তার এক সহযোগীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের দায়ী করে সেনা সরকার। ঘটনার পরই ওই জেলায় সামরিক আইন জারি করে সামরিক আদালত পরিচালনার পথ উন্মুক্ত করা হয়। শুক্রবার  সেই আদালতেই ১৯ বেসামরিক বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।

ভারতে পালানো মানুষের সারি : থাইল্যান্ড ছাড়াও দীর্ঘ হচ্ছে মিয়ানমার থেকে ভারতে পালানো মানুষের সারি। খবরে বলা হয়, সামরিক সরকারের দমনপীড়নের ফলে মিয়ানমার থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে থাকে দেশটির নাগরিকরা। দিন দিন ভারতে পালানো মানুষের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর বহু  লোক ভারতে ঢুকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চাইছে। তৃতীয়বারের চেষ্টায় ভারতে ঢুকেছেন ৪২ বছর বয়সী মিয়ানমারের নারী মাখাই (ছদ্মনাম)। ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কাদাপানি মাড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য মণিপুরে ঢুকেছেন তিনি। মণিপুর সীমান্তবর্তী তামু জেলায় বাড়ি মাখাইয়ের। মেয়ে ও  বোনদের নিয়ে দেশ ছাড়া হওয়া মাখাই বিবিসিকে বলেন, ‘নিজেদের রক্ষায় এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমাদের সামনে। এবার আসতে পেরেছি। কিছুদিন গেলে হয়তো কোনো সুযোগই থাকত না।’ মাখাই  আরও বলেন, ‘সেনারা বাড়িঘর তছনছ করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষজনকে হত্যা করছে, ধর্ষণ করছে।  সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে বহু রাত সেনা অভিযানে ভয়ে আমাদেরকে জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে।’

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে মণিপুর রাজ্যের মোরেহ শহরের সরকারি একটি হাসপাতালে আসা দুই তরুণের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি প্রতিবেদকের। তারা জানান, সুস্থ হয়েই যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। মণিপুর রাজ্য সরকার সম্প্রতি বলেছে, মিয়ানমার থেকে আসা সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে ফিরিয়ে দিতে হবে। চিকিৎসা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে মিয়ানমার  থেকে আসা লোকজনকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী।

পাল্টা হামলায় ১০ পুলিশ নিহত : মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরোধিতাকারী নৃতাত্ত্বিক সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠীর সদস্যরা থানায় হামলা চালিয়ে অন্তত ১০ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। গতকাল দেশটির পূর্বাঞ্চলে এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে এসব  গোষ্ঠীর একটি জোট। মিয়ানমারের তিনটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী তা’য়াং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনালিটিজ ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আমি এবং আরাকান আর্মির (এএ) এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, গতকাল ভোরে শান প্রদেশের নংমোন পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায় তাদের যোদ্ধারা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম শান নিউজ জানিয়েছে, এই হামলায় ১০ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। তবে সুয়ে ফি মিয়াই নিউজ আউটলেট জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১৪ জন। তবে এ হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি জান্তা সরকার।

এই বিভাগের আরও খবর