শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১৮

খোলা মত

রুখে দাঁড়াবার এটাই সময়...

আবেদ খান ও বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

দেরিতে হলেও সরকার ধর্মব্যবসায়ী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির লোকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেছে দেখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি আনন্দে নতুন উদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছে। তার পরও তাদের মন থেকে এ ভয় কেটে যায়নি যে সরকার না আবার পুরনো ইতিহাস অনুসরণ করে ধর্মব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপসরফা করতে যায়। ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখলে যা হয় আমাদের অবস্থাও তাই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে রাখঢাক না রেখে যে বক্তব্য দিলেন তারপর আপসের সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ বলে মনে হলেও একই সঙ্গে দেখছি জনাকয় ছাড়া আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ধর্মব্যবসায়ী ’৭১-এর পরাজিত অপশক্তির লোকদের ব্যাপারে মুখে কুলুপ লাগিয়ে বসে আসেন। আমাদের শঙ্কা সেখানেই। শুরুতেই বলতে চাই, সরকার ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর থেকে সমূলে মৌলবাদীদের উৎখাতের পর পরাজিতদের সঙ্গে আপস করে যে ভুলটি করেছিল আজ যদি সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটায় তা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারারই সমান। ২০১৩-তে শাপলা চত্বর থেকে মৌলবাদীরা সামান্য চাপের মুখে যেভাবে বিতাড়িত শেয়ালের মতো মাথায় হাত দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল তা স্মরণ করিয়ে দেয় জহিরুদ্দিন বাবরের হাতে শোচনীয় পরাজয়ের পরে ইবরাহিম লোদি  যেমন প্রাণ বাঁচানোর জন্য দিগ্বিদিক না তাকিয়ে ছুটছিলেন, সে কথা। এরপর দুই মহাবীর যথা তৈমুর লং এবং চেঙ্গিসের রক্তের ধারক বাবর তাঁর পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে ভারতবর্ষে তাঁর ক্ষমতা পোক্ত করার জন্য লোদি তথা পাঠানদের বিরুদ্ধে এমন ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন যার কারণে লোদি সমর্থকরা আর বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেও সাহস পায়নি। পরাজিতদের নিঃশেষ করে দেওয়াই ইতিহাসের শিক্ষা। পরাজিতরা লেজ কাটা সাপের মতো। এরা সব সময় চেয়ে থাকে প্রতিশোধ নেওয়ার দিকে। সে সাপকে যত মিষ্টিমধুর দুধ দিয়েই পোষা হোক না কেন, সুযোগ পেলে সে ছোবল মারবেই।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একটি সফল বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবীদের জিইয়ে রাখলে প্রতিবিপ্লবীরা দংশনের অপেক্ষায় থাকে আর তাই সফল বিপ্লবের নায়করা কখনো প্রতিবিপ্লবীদের রক্ষা করেননি। ফরাসি বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, চীনের বিপ্লব বা কিউবান বিপ্লবের পর সব বিপ্লববিরোধীকে নির্মমভাবে ধ্বংস না করলে কোনো বিপ্লবই দীর্ঘস্থায়ী হতো না। বাংলাদেশও এর থেকে আলাদা ছিল না। ১৯৭১ সালে এবং তার আগে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পাকিস্তান ভেঙে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও বিরোধীদেরও অভাব ছিল না, তাদের মন থেকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ মুছে ফেলতে পারেনি। এদের মধ্যে যেমন ধর্মব্যবসায়ীরা ছিল, তেমনি ছিল তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারকরা এবং মাওবাদের সেই অংশের অনুসারীরা যারা চীনের নীতি অন্ধের মতো অনুসরণ করেছে। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এটি অনুধাবন করতে ভুল করেননি যে প্রতিবিপ্লবীদের বাঁচিয়ে রাখা মানে গোখরা সাপ পালন করা। এ ভাবনা মনে রেখেই তিনি শুরুতেই ‘দালাল আইন’ জারি করে হাজার হাজার মুক্তিযুদ্ধবিরোধীকে আটক করে বিচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করেছিলেন। গোলাম আযমের মতো বহু কুখ্যাত রাজাকার দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য সেই প্রতিবিপ্লবীদের দমন করার আগেই পাকিস্তান, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রতিবিপ্লবীরাই জিয়া-মোশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশে স্থাপন করেছিল প্রতিবিপ্লবীদের অর্থাৎ পাকিস্তান জিন্দাবাদওয়ালাদের রাজত্ব। জিয়া ক্ষমতা জবরদখলের পরপরই অন্য বহু পাকিস্তানিকরণমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবিপ্লবী তথা যারা ’৭১-এর পরাজিত অপশক্তির লোক তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন, তাদের হাতে অর্পণ করেছিলেন ক্ষমতার বল্লম। জিয়া-মোশতাক তাদের কাক্সিক্ষত ইচ্ছা, অর্থাৎ দেশকে পাকিস্তানে পরিণত করতে পারেননি ঠিকই কিন্তু সে পথে অগ্রসরের যাত্রায় দেশের যা ক্ষতি করে গেছেন, সত্যি কথা বলতে তা হচ্ছে অপূরণীয়। বিশেষ করে জিয়া দেশে ধর্মীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। পালিয়ে যাওয়া স্বাধীনতাবিরোধীদের শুধু দেশে ফেরার পথই সৃষ্টি করেননি, তাদের জন্য সম্পদের পর্বত সৃষ্টির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ’৭৫ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ধীরে ধীরে তাদের শক্তি ও জনসংখ্যা বাড়াতে থাকে। জিয়া দেশের যে ক্ষতি করে গেছেন, তেমনটি কেউ করেনি। জিয়া পরবর্তীতে এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার সময়ও একই পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্য পেয়ে তারা এমন অবস্থায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে যখন তারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে সক্ষম। আজ হেফাজত-জামায়াত-বিএনপির ধর্মব্যবসায়ীরা শক্তির যে হুঙ্কার দিচ্ছে তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল তাদের আদি ত্রাণকর্তা জিয়ার আনুকূল্যে। সেদিনই জিয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তা না পেলে ধর্মব্যবসায়ীরা বিলুপ্ত হয়ে যেত। আজ তাদের অস্তিত্ব থাকত না।

এটা অনস্বীকার্য যে, আজকের প্রেক্ষাপটে এই ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের দমন করা অতটা সহজ নয় যা ’৭৫ সালের আগে ছিল। আজ তাদের অনেক ডালপালা গজিয়েছে, আর্থিক পেশি তাদের অনেক শক্তিশালী, পাকিস্তানসহ বিদেশি কিছু রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছে এ অপশক্তির লোকেরা। কিন্তু এটা একইভাবে সত্য যে, তারা এখনো রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থানে পৌঁছেনি। তাদের পেছনে জনসমর্থন দেশের গোটা জনসংখ্যার ৭-৮ ভাগের বেশি নয়। কিন্তু তাদের উগ্র এবং আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য তাদের শক্তিশালী মনে করা হয়। তারা যে আসলেই কাগুজে বাঘ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছিল ২০১৫ সালের ৫ মে, যেদিন আমাদের পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির সম্মিলিত অভিযান এবং সৈয়দ আশরাফের ধমকের মুখে তারা ম্যারাথনতুল্য দৌড়ে পালিয়ে জীবনে বেঁচে গিয়েছিল। এর পরও তারা হোলি আর্টিজানসহ বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গি হামলা চালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ৫ মের শাপলা চত্বর থেকে এ অপশক্তি রণেভঙ্গ দেওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার তাদের সঙ্গে অনেক কিছু মেনে নিয়ে আপস করে এবং অসংশোধনযোগ্য ভুল করে জামায়াত-হেফাজতের হাতকে শক্তিশালী করার সুযোগ দেয়। সেদিন তাদের সঙ্গে আপসে না গেলে তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। সরকারের আপসসুলভ মনোভাবকে তারা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাত্রা বাড়াতে বাড়াতে এমন অবস্থায় পৌঁছাল যে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা এবং এমনকি জাতীয় পতাকা পুড়ে ফেলার মতো রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ করতেও দ্বিধা করল না। কোনো রাষ্ট্রে যদি রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তি অধিক ক্ষমতাবান হয় তখন সে রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলা হয়। বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রশক্তিকে মোকাবিলা করার মতো অবস্থানে তারা নিশ্চয় নেই। রাষ্ট্র কঠোরভাবে তাদের ধ্বংস করার প্রত্যয় নিলে তারা পালাবার পথ পাবে না। তারা বিদেশি শক্তির সহায়তার আশায় থাকলে সে গুড়েও বালি। একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া কোনো বিদেশি রাষ্ট্র তাদের সাহায্যে কূটনৈতিক বা অন্যভাবে এগিয়ে আসবে এটা ভাবাই বাতুলতা। বিশ্বরাজনীতিতে যে পরিবর্তন গত কয়েক দশকে ঘটেছে তাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিদেশনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, হয়েছে নতুন মেরুকরণ। সেখানে এখন নতুন দুটি শিবির তৈরি হয়েছে যার একটির নেতৃত্বে সৌদি আরব এবং অন্যটির নেতৃত্বে তুরস্ক। সুতরাং ঢালাওভাবে তারা ধর্মব্যবসায়ীদের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে তা ভাবা হবে অর্বাচীনতা। একই সঙ্গে এও ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা যখন যুদ্ধাপরাধীদের সাজা দিচ্ছিলাম তখন তুরস্কের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান তার বিরোধিতা করেও থামাতে পারেননি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানকে উচিত জবাব দিয়েছিলেন, যার পরে তারা চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। খেলাফতকালে ধর্মান্ধদের দ্বারা প্রভাবিত তুরস্ক এমন অমানিশায় গিয়ে পতিত হয়েছিল যে সে দেশকে বলা হতো ইউরোপের রুগ্নমানব। ধর্মনিরপেক্ষ কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতা গ্রহণ করেই সব ধর্মব্যবসায়ী অপশক্তিকে পুরোপুরি পরাস্ত করে ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের সূচনা করেন। ধর্মব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। কিন্তু আতাতুর্ক তা শক্ত হাতে দমন করে ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীদের সমান অধিকার, হিজাব প্রথার বিলুপ্তিসহ বহু সংস্কার সাধন করেছিলেন। তিনি মহিলাদের সনাতনী পোশাকে শুধু পরিবর্তন সাধনই করেননি, বরং তার নিজ স্ত্রীকেও হিজাবমুক্ত করেছিলেন। তিনি নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামের একমাত্র ভাষা আরবি বলে যে দাবি ধর্মব্যবসায়ীরা করত আতাতুর্ক না প্রত্যাখ্যান করে তুর্কি ভাষায় কোরআন লেখার প্রচলন করেন এবং ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা কোণঠাসা হওয়া তুর্কি সংস্কৃতিকে মর্যাদার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ষাটের দশকের পাকিস্তানের উদাহরণও প্রশংসনীয়। আইয়ুব খান নিশ্চিতভাবে বহু অপকর্মের নায়ক হলেও একটি শুভকাজ তিনি করেছিলেন ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারি করে, যে আইন বহুবিবাহ বন্ধ করেছে, হিল্লা বিয়ের প্রথা নস্যাৎ করেছে, পিতা মৃত দৌহিত্রের পিতামহের সম্পদের হিস্সার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তিন তালাকের মাধ্যমে তালাক প্রদানের ওপর আইনি বিধান আরোপ করেছে। সে সময়ও ধর্মব্যবসায়ীরা ইসলাম গেল, ইসলাম গেল বলে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু আইয়ুব খান তাদের কঠোর হাতে দমন করে সে অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। আহমদ সুকর্ণ ক্ষমতা গ্রহণের পর ধর্মান্ধদের কঠোর হাতে পর্যুদস্ত করে বহু সংস্কার সাধন করেছিলেন। পূর্ব ইউরোপের বেশ কটি দেশে বাস করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ধর্মান্ধ আচরণ করলেও যুদ্ধ-পরবর্তী সরকার তাদের কঠোরভাবে দমন করে সংস্কার নিশ্চিত করেছিল। ইদানীং মিসর সরকার ইসলামিক ব্রাদারহুডকে নিশ্চিহ্ন করেছে, নাইজেরিয়া সরকার বোকো হারামদের ধ্বংসের কাছে নিয়ে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আইএস জঙ্গিদের ধ্বংস করা হচ্ছে। আমাদেরও তাই করতে হবে। আমাদের সরকারও চাইলে এ অপশক্তিকে দমন করতে না পারার কোনো কারণ নেই বিশেষ করে যখন সরকারের পেছনে রয়েছে নিরঙ্কুশ জনসমর্থন। সম্প্রতি মামুনুল হকসহ বেশ কয়েকজন ধর্মব্যবসায়ীর গ্রেফতার এবং রিমান্ড থেকে আমরা আশার আলো দেখতে পেলেও আমাদের মন থেকে শঙ্কা কাটেনি। গত কয়েক দিনে যে-সংখ্যক আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গদলের স্থানীয় নেতারা মামুনুল হক ও ধর্মব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করেছেন তার থেকে কিছুটা আঁচ করা যায় আওয়ামী লীগে গত কয়েক বছরে কত ধর্মান্ধ অনুপ্রবেশ করেছে। এ ছাড়া যতসংখ্যক পুলিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হেফাজতিদের গুণগান করছেন, তাদের পক্ষ নিয়ে তাদের জঙ্গি কর্মকান্ড বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, তাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে প্রশাসন ও পুলিশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা ব্যাপকহারে ঢুকে পড়েছে।

পারিপার্শ্বিক সবকিছু বিশ্লেষণের পর দেশকে ধর্মব্যবসায়ী এবং রাজাকারদের বংশধরদের থেকে রক্ষা করার জন্য যা অপরিহার্য তা হলো অনুকম্পাহীনভাবে এদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ভূমিকা। এ অবস্থানের ফল এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। তাদের কণ্ঠস্বরে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। আগের মতো আস্ফালন, হুমকি-ধমকির পরিবর্তে এখন তাদের কণ্ঠে আত্মসমর্পণের সুর। এরই মধ্যে বাবুনগরী বলেছে তারা ভুল করেছে, যে শীর্ষ ধর্মব্যবসায়ী বাবুনগরী আগে হুঙ্কারের ভাষা ছাড়া কথা বলত না। যেসব ধর্মব্যবসায়ী বলে বেড়াচ্ছিল মামুনুল হককে গ্রেফতার করলে তারা দেশ অচল করে দেবে, তারা আজ হাত জোড় করে ধরনা দিচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে। জানা গেছে, যে মামুনুল হক বহু হুঙ্কার দিয়ে ওয়াজের মাঠ গরম করত সেই রাজাকারপুত্র মামুনুল হক নাকি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। খুদে আকৃতির ওয়াজি রফিক মাদানিও ক্ষমাপ্রার্থী। এটাই কিন্তু স্বাভাবিক। এরা শক্তের ভক্ত নরমের যম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় এই ধর্মব্যবসায়ী ’৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং তাদের বংশধররা বলত, এদের বিশেষ করে সাকা, সাঈদীর সাজা হলে দেশে আগুন জ্বলবে, চিটাগাং আলাদা হয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু সাকার ফাঁসির পর কিছুই হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান এবং তুরস্ক ছাড়া কেউ কোনো সোচ্চারও করেনি। আর তাদের চেঁচামেচিও থেমে গিয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার শক্ত অবস্থানে থাকার কারণে।

অনেকেই এখন আওয়ামী জার্সি পরে মূলত ধর্মব্যবসায়ীদের পক্ষেই খেলায় মত্ত। আরও বেশি শঙ্কিত এটা জেনে যে গত ১৯ মে একদল ধর্মব্যবসায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মন্ত্রী মহোদয় এ ধরনের সাক্ষাৎ করতেই পারেন। কিন্তু ভয় হচ্ছে এরপর সরকার ২০১৩ সালের মতো আবার ধর্মব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপসরফা করে ফেলবে কি না। যদি করে তাহলে সরকার শুধু নিজের পায়েই কুড়াল মারবে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই হিংস্র হায়েনার মুখে ঠেলে দেবে। দেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বা পাকিস্তানিকরণের দরজা খুলে দেবে, ২০১৩-পরবর্তী ইতিহাস যা প্রমাণ করেছে। এখন সুযোগ এসেছে ধর্মব্যবসায়ীদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার। এ ধরনের সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না। সরকার যদি এ সুযোগ নষ্ট করে তাহলে তা আর একবার না-ও আসতে পারে। এ ভুল করলে তা জাতির জন্য বয়ে আনবে এমন দুর্যোগ যার সমাধান হয়তো সম্ভব না-ও হতে পারে। কোনো আপসই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা মানবে না। তদুপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা দেশকে তালেবানি দর্শনের লোকদের থেকে রক্ষা করার জন্য আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গসংগঠনসমূহ, পুলিশ এবং প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না এমন লোকদের বহিষ্কার/বরখাস্ত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

গ্রাম বাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘লাথির কাঁঠাল লাথি না হলে পাকে না।’ স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, উগ্রপন্থি, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের জন্য এ কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এরা একটু সুযোগ পেলেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ইদানীং সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে তারা কিছুটা গা ঢাকা দিয়েছে বটে তবে এমনটি ভাবার কোনো অবকাশই নেই যে তাদের বোধোদয় হয়েছে। তারা কেবল ভোল পাল্টেছে সাময়িক আত্মরক্ষার জন্য। সময় বদলালে তারা তাদের ভয়ংকর চেহারা নিয়ে ঠিকই হাজির হবে এবং সুযোগ বুঝে এ দেশের মুক্তচেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এর জন্য অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন বাঁকে আমরা এদের চেহারা দেখি। কখনো কুৎসিত মুখব্যাদান নিয়ে, কখনো বা ছদ্মবেশে। আমরা আমাদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে অপরাজনীতির কুশীলবদের চেহারা প্রত্যক্ষ করি ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাকান্ডের পর থেকেই। যে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের সংবিধানের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের, ধর্মের রাজনীতিকে করা হয়েছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরনো শকুন আবার খামচে ধরল আমাদের সাংবিধানিক অর্জনকেও। এরপর যত দিন গেছে ততই আরও নির্মম আরও কঠিন জগদ্দল পাথর এ দেশের মানুষের বুকের ওপর চেপে বসেছে। আমরা ’৭৫-এও যেমন দেখেছি, ’৮১-তেও তাই দেখেছি, ’৯০-এর পরও তাই দেখেছি। কেবল নিত্যনতুন চেহারা ধারণ করে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষকে বিভ্রান্তির আবর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বারবার আন্দোলনের ভিতর দিয়ে এক ভ্রান্তির নাগপাশ যখন ছিন্ন করেছি আমরা, আর এক বিভ্রান্তি আমাদের অক্টোপাস বন্ধনে বেঁধে ফেলেছে। সাধারণ মানুষ নিমজ্জিত হয়েছে বিভ্রান্তির পঙ্কে। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রতি মুহুর্তে এক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে না করতেই আর এক ষড়যন্ত্রের জালে বন্দী হতে হয়েছে। কখনো স্বৈরতন্ত্র, কখনো গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র, কখনো সরাসরি সামরিকতন্ত্র। কায়েমি স্বার্থবাদীরা যখনই দেখেছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য একটি বিপজ্জনক বিলাসিতা, সে মুহুর্তেই তারা সেই ছদ্মবেশের আবরণ ছিন্ন করে স্বমূর্তিতে আবিভর্‚ত হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মের রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িকতার কাঠামোয় অধিকতর কঠোর চেহারা দিয়ে জনগণের সামনে হাজির করেছে। আজকে মামুনুল হক বা বাবুনগরী তাদের আচরণের চেয়ে আলাদা কিছু নয়।

আমরা আগেও বলেছি ধর্মের রাজনীতি রাজনীতির ধর্মকে হত্যা করে, বিবেকের সত্যনিষ্ঠাকে গলা টিপে মারে, সৎ চিন্তা কিংবা সুচিন্তার নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছাড়ে।

আপনারা যারা ভাবছেন বাবুনগরী কিংবা মামুনুল হকের কণ্ঠস্বর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বা তাদের চৈতন্যোদয় হয়েছে অথবা হেফাজত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তারা কিন্তু এর মূল সত্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের কৌশলই হচ্ছে ধর্মের আড়ালে রাজনীতি করা এবং ধর্মকে ব্যবহার করেই রাজনৈতিক শক্তি অর্জন। বুঝতে হবে, তাদের এক হাত যখন গলায় থাকে আরেক হাত থাকে পায়ে। প্রয়োজনমতো তারা পদসেবাও করে, আবার সুযোগ পেলেই কণ্ঠ রোধও করে। অর্থাৎ সময় বুঝেই তারা যখন যা প্রয়োজন তখন তা ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবে না এবং তার জন্য যতখানি নির্মম ও নৃশংস হওয়া দরকার ততখানিই তারা ভয়ংকরভাবে আবিভর্‚ত হবে। যদিও তারা প্রচার করে যে তারা একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ধর্মের কল্যাণ সাধনই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু ইতিহাস ভালো করেই জানে, তারা যেখানেই নেমেছে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেই গ্রাস করেছে।

’৭৫-এর নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর বাংলাদেশে আমরা দেখেছি কীভাবে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন করেছেন, কীভাবে এরশাদ তাদের তোয়াজ করেছেন, কুখ্যাত রাষ্ট্রধর্ম বিধান জারি করে এ দেশের জনগোষ্ঠীকে বিভাজিত করে ধর্মান্ধতার চাষ করেছেন, ঘাতকদের দালালেরা কীভাবে মানবতার বহ্নি-উৎসব করেছে, খালেদা জিয়া কীভাবে তাদের সমস্ত সমাজ এবং প্রশাসনযন্ত্রে বিস্তার ঘটিয়েছেন ও কীভাবে সমাজ এবং প্রশাসনযন্ত্রকে কবজা করেছেন।

এ ইতিহাস শুধু বাংলাদেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুড কীভাবে ইসলামের ধুয়া তুলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের তৎপরতা চালিয়েছিল, কীভাবে কামাল আতাতুর্কের অসাম্প্রদায়িক দর্শন ভেঙেচুরে চুরমার করা হয়েছিল, কীভাবে অসাম্প্রদায়িক স্বাধীনতাকামী আফগান জনগণের ওপর তালেবানের অভিশাপ নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ইসলামী আন্দোলনের নামে ইরান অন্ধকূপের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছিল, কীভাবে একসময়ের অগ্রগামী সমাজ কুসংস্কারের নিকশ কালো আবরণে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল- এসবই লিপিবদ্ধ আছে বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় পাতায়। একটি সত্য আমাদের অবশ্যই মানতে হবে, আগুনের ফুলকি অথবা শত্রুর ক্ষুদ্রতম চিহ্ন রাখতে নেই। বাংলাদেশে এই ধর্মবাদী গোষ্ঠীর উত্থানের ক্ষেত্রেও এ সত্যটি সব সময় মনে রাখতে হবে।

আজ যদি আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব কোনো সভ্যসমাজে এমনকি আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা গণতান্ত্রিক দেশ ভারতেও কোনো সাম্প্রদায়িক এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার থাকে না। কিন্তু বেদনার বিষয় হচ্ছে, এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা যারা করেছিল, অস্তিত্বের বিরোধিতা যারা করেছিল, সাংস্কৃতিক অধিকারের বিরোধিতা যারা করেছিল তাদের প্রত্যেককে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হয়েছে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও সমুন্নত করার জন্য। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষশক্তি ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। দেশটাকে, মুক্তিযুদ্ধকে, আমাদের পতাকাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে পুরো জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতি হচ্ছে সামগ্রিকভাবে মানুষের অধিকার আর ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিবিশেষের বিশ্বাস। কাজেই ব্যক্তির বিশ্বাস উপাসনালয়ে থাকাই সবার জন্য মঙ্গলের, তাকে রাজনীতির ময়দানে এনে কায়েমি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোনোই দরকার নেই। যারা এ দেশের সহজসরল ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ঐক্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক অস্ত্র। সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংঘবদ্ধ ঐক্যই হতে পারে সব প্রতিরোধের হাতিয়ার।

লেখকদ্বয় : আবেদ খান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

এই বিভাগের আরও খবর