শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ জুলাই, ২০২১ ২৩:০৯

তাজরীন ট্র্যাজেডির ক্ষতিপূরণ মেলেনি ৯ বছরেও

তালাবদ্ধ কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান ১১২ শ্রমিক

সাঈদুর রহমান রিমন

Google News

রূপগঞ্জের সেজান জুস কারখানার মতোই দরজা তালাবদ্ধ থাকায় আগুনে পুড়ে নির্মমভাবে শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে ভয়াল সে ঘটনায় আগুনে পুড়ে ১১২ জন নিরীহ শ্রমিক প্রাণ হারান। আগুনে দগ্ধ ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ১০৪ জন শ্রমিক।

ভয়াল সে অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর বিনামূল্যে সব চিকিৎসাসহ তড়িঘড়ি ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নয় বছরেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি শ্রমিকরা। ঘটনায় আহত শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, কর্মক্ষমতা হারিয়ে বেকার জীবনযাপনে নিজেদের চিকিৎসার খরচও মেটাতে পারছেন না তারা। প্রত্যেকেই উপার্জনহীন পরিবারের বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছেন। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তোবা গ্রুপের তাজরীন গার্মেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত ১১২ জনের মধ্যে ৫৮ জনের লাশ তাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি ৫৪ জনের লাশ ওই সময় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ছাড়া এই আগুনের ঘটনায় আহত হন আরও ১০৪ জন শ্রমিক। যাদের অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। পঙ্গু সদস্যদের নিয়ে নিদারুণ কষ্টে রয়েছে তাদের পরিবার। আগুনে আটকে পড়া কারখানার কক্ষ থেকে বিপজ্জনকভাবে বের হওয়ার সময় বড় আকারের স্টিলশিটের প্রচন্ড আঘাতে শ্রমিক সাহেরা বানু গুরুতর আহত হন। সংকটাপন্ন অবস্থায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তিনি প্রাণে বাঁচলেও সম্পূর্ণ অপ্রকৃতস্থ হয়ে গেছেন। এখনো ওষুধপথ্যেই জীবন বেঁচে আছে তার। সাহেরা বানুর স্বামী আতাহারুল ইসলাম জানান, কোনো ক্ষতিপূরণ তাদের ভাগ্যে জোটেনি। এখন তার একক উপার্জনে চার সদস্যের পরিবার চালাতে হিমসিম খেতে হয়। এর ওপর সাহেরা বানুর ওষুধপথ্য জোটাতে আতাহারুলকে পড়তে হয় চরম বিপাকে। তাজরীন ট্র্যাজেডিতে গুরুতর আহত হয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক রেহেনা বেগমের জীবন কাটছে সীমাহীন কষ্টে। সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম পাঁচ তলায়, দেখি সবাই দৌড়াদৌড়ি-কান্নাকাটি করছে। আমিও দৌড়ে কিনারে এসে লাফ দিয়ে দোতলায় পড়ি। এতে পায়ের ভিতরে রড ঢুকে যায়। হাতপায়ে প্রচন্ড আঘাত পাই। এরপর বহুদিন কয়েকটি হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। খরচ চালাতে বাবার সম্পত্তি থেকে পাওয়া তিন শতক জমি বিক্রি করেছি।’ এখন বিনা চিকিৎসায় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার টাকা-পয়সার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো কিছুই পাইনি।

কারখানার মালিক ক্ষমতাসীন নেতা : প্রতি বছর তাজরীন ট্র্যাজেডি দিবসে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে আহত শ্রমিকরা জড়ো হন, প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ ও তাজরীন মালিক দেলোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য দোষীর কঠোর বিচার দাবি তোলেন। শ্রমিক নেতারা তাদের বক্তব্যে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার দাবি জানান। কিন্তু এসবে পাত্তাও দেন না কারখানার মালিক বেজায় দাপুটে দেলোয়ার হোসেন। তিনি এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দলে ভিড়েছেন, পুনর্বাসিত হয়েছেন। অভিশপ্ত তাজরীন গার্মেন্ট কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন হঠাৎ করেই মৎস্যজীবীতে পরিণত হয়েছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বাংলাদেশ আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির যুগ্ম আহ্‌বায়ক হয়েছেন তিনি। আসন্ন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিরও সভাপতি। এখন অসহায় শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনার দাবি নিয়ে নেতা দেলোয়ারের ধারে কাছেও যাওয়ার সুযোগ পান না। ফলে কারখানার লেলিহান শিখায় পুড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা, সর্বস্বহারা শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণের আশায় প্রায় নয়টি বছর ধরেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

মামলার নিষ্পত্তিও অনিশ্চিত : তাজরীন অগ্নিকান্ডের মামলায় মালিক দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারসহ ১৩ জনকে আসামি করে মামলা রুজু করা হয়। মামলাটি তদন্তের পর ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক এ কে এম মহসীনুজ্জামান। অভিযোগ পত্রে,  ভবনটির নকশায় ত্রুটি ও জরুরি নির্গমনের পথ না থাকায় এবং আগুন লাগার পর শ্রমিকরা বাইরে বের হতে চাইলে নিরাপত্তা কর্মীরা কলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়ার কারণেই বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০৪ ও ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ ও ‘অবহেলার কারণে মৃত্যুর’ অভিযোগ আনা হয়। তাজরীন ট্র্যাজেডির মামলাটিও চলছে ঢিমেতালে। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে চলমান এ মামলায় ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে গত ৬ বছরে মাত্র আটজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে। ২০১৫ সালে মামলাটির বিচার শুরুর পর প্রথম ২ বছরের মধ্যে সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালত। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ৭ মার্চ আরও একজন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৮, ২০২০ ও চলতি বছরে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আর কোনো সাক্ষী হাজির করা যায়নি। ফলে এ মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ভুক্তভোগীদের পরিবার।

এই বিভাগের আরও খবর