শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০২১ ২৩:২৩

এখনো লাশের জন্য অপেক্ষা মালিকসহ ছয়জন কারাগারে

রূপগঞ্জে আগুনে ব্যবসায়িক সংগঠনের ভূমিকায় হাই কোর্টের অসন্তোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

Google News

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের সেজান জুস কারখানার ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ৪৮ শ্রমিকের লাশ এখনো হাসপাতাল মর্গে। লাশগুলো থেকে ইতিমধ্যে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব লাশ কবে দাফন করা হবে এখন সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে চাইছে না পুলিশ। ইতিমধ্যে ৪৮ লাশের ৬৮ জন দাবিদার সিআইডির কাছে ডিএনএ নমুনা জমা দিয়েছে। লাশগুলোর ডিএনএ নমুনা হিসেবে পাঁজরের হাড় সংগ্রহ করা হয়েছে। আর তাদের স্বজন দাবিদার বাবা, মা এবং সন্তানের কাছ থেকে ডিএনএর নমুনা হিসেবে রক্ত ও লালা সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশ ও স্বজনদের নমুনা মেলানোর পর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে স্বজনদের কাছেই লাশগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্বজনরাও তাদের প্রিয়জনের লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। গত ৮ জুলাই বিকালে সেজান জুস কারখানায় লাগা ভয়াবহ আগুন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ২১ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ ৪৮ লাশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি লাশগুলোর দাবিদারদের নমুনা সংগ্রহ করেছে। তারা উভয় নমুনা মিলিয়ে দেখে লাশগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করবে। তবে আমাদের এখন পর্যন্ত পরিকল্পনা হচ্ছে, লাশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের স্বজনদের কাছেই বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সিআইডি নমুনা মিলিয়ে দেখার পর যদি কোনো লাশের সঙ্গে দাবিদার কারও ডিএনএ নমুনা না মেলে, সে ক্ষেত্রে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আপাতত পরিকল্পনা স্বজনদের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া। এদিকে আগুনের ঘটনার পরদিন থেকে পরবর্তী দু-তিন দিন স্বজনের আহাজারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গের চারপাশ ভারি থাকলেও সেখানে বর্তমানে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, মর্গের সামনে লম্বা করিডরের মতো রাস্তা একেবারে ফাঁকা। পুলিশ যে ঘরটিতে বসে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে সেটিও প্রায় শূন্য। ঘরটির বাইরে কয়েকটি প্রিন্ট করা কাগজ সাঁটানো হয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় আরও কোনো স্বজন ডিএনএ নমুনা দিতে চাইলে মালিবাগ সিআইডি অফিসে গিয়ে দিতে হবে। ঢামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ বলেন, রূপগঞ্জের ঘটনায় আমাদের কাছে ৪৮টি লাশ আসে। সেগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহের পর স্থান সংকুলান না হওয়ায় ঢামেক হাসপাতালের মর্গে ৩৫টি এবং সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ১৩টি লাশ রয়েছে। এতগুলো লাশ মর্গে ময়নাতদন্ত কার্যক্রমে সমস্যা হওয়ায় প্রথম দিন থেকেই দাফন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে পুলিশকে। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাসেমসহ ছয়জন কারাগারে দুই ছেলের জামিন : রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুসের কারখানায় অগ্নিকান্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় রিমান্ড শেষে জামিন পেয়েছেন কারখানার মালিক এম এ হাসেমের দুই ছেলে। তবে হাসেমসহ বাকি ছয়জনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গতকাল জামিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা খাতুন এ আদেশ দেন। এর আগে চার দিনের রিমান্ড শেষে আসামিদের আদালতে তোলা হয়। নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। জামিনপ্রাপ্তরা হলেন এম এ হাসেমের ছেলে তাওসীব ইব্রাহীম (৩৩) ও তানজীম ইব্রাহীম (২১)। এর আগে ১০ জুলাই এ দুজনসহ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেম (৭০), তার ছেলে হাসীব বিন হাসেম ওরফে সজীব (৩৯), তারেক ইব্রাহীম (৩৫), সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) শাহেন শান আজাদ (৪৩), উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ (৫৩) এবং সিভিল ইঞ্জনিয়ার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিনকে (৩০) গ্রেফতার করা হয়। ওই দিনই তাদের চার দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক হুমায়ুন কবির জানান, হত্যা ও হত্যার অভিযোগে ৩০২, ৩২৬, ৩২৫, ৩২৩, ৩২৪, ৩০৭ ধারায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আবুল হাসেমসহ আটজনকে চার দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম বলেন, ‘চার দিনের রিমান্ড শেষে আমরা আটজনকে আদালতে প্রেরণ করি। আদালত দুজনের জামিন দেয় এবং ছয়জনকে কারাগারে পাঠায়।’

রূপগঞ্জে অগ্নিকান্ডে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকায় হাই কোর্টের অসন্তোষ : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের কারখানায় অগ্নিকান্ডে অর্ধশতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নীরবতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট। আদালত বলেছে, এ বিষয়ে সংগঠনগুলোর কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। গতকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট এমন মন্তব্য করে। আদালত বলেছে, এ বিষয়ে (রূপগঞ্জের আগুন) তাদের কোনো ওভারসি (তদারকি) দেখছি না। তারা শুধু আছে সরকারের কাছ থেকে কীভাবে প্রণোদনা নেবে আর ব্যাংকের ঋণ কীভাবে মাফ পাওয়া যায় তা নিয়ে। রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডিতে আগুনে পুড়ে নিহত, আহতসহ শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, বোনাস ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে বিচারক তখন এসব কথা বলেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। এ সময় আদালত বলে, বেতন-বোনাস দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। পত্রিকায় এসেছে শুক্রবার তাদের বোনাস দিয়ে দেবে। আহত শ্রমিকদের কীভাবে দেবে সে ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষের একটা বক্তব্য আছে দেখলাম। পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে। তারিখ উল্লেখ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় কোনো আদেশ দিলাম না। দেখা যাক। একপর্যায়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘একটি কথা বলি, আসলে আপনারা যারা বিভিন্ন সংগঠন নিয়ে আছেন তারা কোর্টে আসেন। সব থেকে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যারা আছেন তাদের কিন্তু এসব বিষয়ে ওভারসি করার কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। এ ঘটনায় আমি তাদের কোনো স্টেটমেন্টও দেখিনি, এফবিসিসিআই অফিশিয়ালি কোনো শোকও প্রকাশ করেনি এবং তাদের কোনো প্রতিনিধি সেখানে গিয়েছেন বলে এমন কোনো বিজ্ঞপ্তিও দেখা যায়নি। এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমার মনে হয় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান কীভাবে চলছে, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় ঘাটতি এসব ক্ষেত্রে এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর রোল প্লে করা প্রয়োজন। এখন গার্মেন্টের ব্যাপারে বিদেশিরা চাপ দিয়েছেন বলে সেখানে একটা পরিবেশ করা হয়েছে। আমাদের দেশে যতক্ষণ চাপ না দিচ্ছেন ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে ততক্ষণ কোনো পজিটিভ ভূমিকা দেখি না। রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় গত বৃহস্পতিবার বিকালে আগুন লাগে। আগুনের ঘটনায় কারখানাটির ছয় তলা ভবনে কর্মরত অবস্থায় অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে এ ঘটনায় নিহত শ্রমিক প্রত্যেকের জন্য ১ কোটি এবং আহত প্রত্যেকের জন্য ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাই কোর্টে আবেদন করে বেশ কয়েকটি সংগঠন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত বলেছে, বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। সরকার বা কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এ বিষয়ে প্রয়োজনে পরে আদেশ দেওয়া হবে।