শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ আগস্ট, ২০২১ ২৩:২২

আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান

বিশৃঙ্খলা কাবুল বিমানবন্দরে

পালাতে ব্যাপক ভিড়, গুলি করে ছত্রভঙ্গের চেষ্টা, আকাশে ওঠার পর বিমান থেকে পড়ে মৃত্যু, গনি আশ্রয় পাননি তাজিকিস্তানে

প্রতিদিন ডেস্ক

বিশৃঙ্খলা কাবুল বিমানবন্দরে
কাবুল বিমানবন্দরে বিমানে উঠতে মানুষের লড়াই। অনেকে বিমানের ওপরেও উঠে বসে। তালেবান যোদ্ধার অবস্থান -এএফপি
Google News

তালেবানের হাতে আফগান রাজধানী কাবুলের পতন ঘটার পর থেকে বিমানবন্দরে দেশত্যাগের জন্য হাজার হাজার নাগরিক ভিড় করে রয়েছেন। এ ভিড়কে কেন্দ্র করে মার্কিন সেনারা গতকাল গুলি চালালে ভয়াবহ বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। গুলিতে কমপক্ষে পাঁচজন মারা গেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, আলজাজিরা, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, আরটি।

কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো মার্কিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। তারা শুধু নিজেদের লোকজনসহ দূতাবাস কর্মীদের নেওয়ার চেষ্টা করলে সাধারণ নাগরিকরা ভিমরুলের মতো মার্কিন বিমান ছেঁকে ধরে তাতে ওঠার চেষ্টা করেন। এ সময়ই গুলি চালানো হয়। এদিকে মানুষ বোঝাই বিমান আকাশে ওড়ার পর বেশ কয়েকজন নিচে পড়ে মারা গেছেন। আকাশ থেকে পড়তে থাকা এরকম দুজনের ভিডিও ভাইরালও হয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর কাবুল জনশূন্য ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। এদিকে পলাতক আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে তাজিকিস্তান আশ্রয় না দেওয়ায় তার বিমান ওমানে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। সেখান থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

কাবুল বিমানবন্দর জনসমুদ্র : প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তালেবান আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণের পর দেশত্যাগে কাবুল বিমানবন্দরে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। বিমানবন্দর জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বিকাল পর্যন্ত পাঁচজন নিহতের খবর দিয়েছে একাধিক সংবাদমাধ্যম। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাত্রী টার্মিনালের কাছে মার্কিন বাহিনীর গুলিতে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। গুলির ব্যাপারে এক মার্কিন সেনা বলেছেন, রানওয়ের দিকে ছুটতে থাকা মানুষকে সতর্ক করতেই ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে হতাহতরা মার্কিন বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন কিনা- বিষয়টি তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।

সূত্র জানায়, তালেবানরা কাবুল দখলের পর থেকেই বিদেশি এবং আফগান নাগরিকরা সীমান্ত ক্রসিং এবং কাবুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জড়ো হতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যে যার মতো লোকজনকে বিমানে উঠতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, তালেবান শাসন থেকে রেহাই পেতে প্রাণ হাতে নিয়ে অনেকেই বিমানের ইঞ্জিন, পাখনা, টায়ার আঁকড়ে ধরে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। এভাবে যেতে গিয়ে উড়ন্ত বিমান থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত দুজনের।

কাবুল ভুতুড়ে নগরী : তালেবানের দখলে আসার পর আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। কাবুলের সড়কগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। সেখানে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। কার্পেট, অলঙ্কারের দোকান, ছোট ছোট ক্যাফে বন্ধ রয়েছে। দোকান মালিকরা বলেছেন, তারা তাদের জিনিসপত্র বাঁচাতে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। এক মালিক জানান, তিনি পুরোপুরিভাবে হতাশ। তালেবানের রাজধানী দখলে তিনি হতচকিত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আফগানিস্তান পুরোপুরি তালেবানের দখলে চলে যাওয়ার পর সরকারি অফিসগুলোও বন্ধ আছে। কাবুলের নিকটস্থ দূতাবাস এলাকাও নীরব। কূটনীতিক ও তাদের পরিবারবর্গ আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

এদিকে গতকাল সকালে আফগানিস্তান উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আকাশসীমা আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরই আফগানিস্তানগামী বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনস তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। এতে আটকে পড়া বিদেশিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি পড়েছে অনিশ্চয়তায়। এদিকে আফগান আকাশসীমা বন্ধের খবরে অনেক উড়োজাহাজই তাদের রুট বদলাতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা গেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও ভার্জিন আটলান্টিকও তাদের আফগানিস্তান ফ্লাইট বাতিল করেছে।

ওমানে আশরাফ গনি : আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে তাজিকিস্তানে আশ্রয় পাননি আফগানিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। এ অবস্থায় বিমান ঘুরিয়ে ওমান পৌঁছেছেন তিনি। ওমান সরকার তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছে কিনা- নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে গতকাল তিনি ওমানেই কাটিয়েছেন। সংবাদ সূত্রগুলো জানিয়েছে, একসময় আমেরিকার নাগরিকত্ব ছিল আশরাফ গনির। ওমান থেকে তিনি আমেরিকা রওনা দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানা গেছে, আশরাফ গনির সঙ্গে তার পরিবারের সঙ্গে রয়েছেন আফগানিস্তানের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামিদুল্লা মোহিব।

আফগানিস্তান এখন ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানিস্তান : রবিবার দুপুরে দেশ দখল করার পর তালেবানদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, আফগানিস্তান এখন থেকে ‘ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানিস্তান’। নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে তারা এখন কাজ করছে।

মার্কিন পতাকা নামলেও নামছে না চীন, রাশিয়া, ইরানের পতাকা : তালেবানরা কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগী দেশগুলোর দূতাবাস কর্মীরা পতাকা নামিয়ে রাজধানী শহর ছাড়তে শুরু করলেও চীন, রাশিয়া, ইরান বলেছে- তাদের দূতাবাস বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। আফগানিস্তানে তাদের দূতাবাস চালু থাকবে।

তবে চীন তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তারা যেন ঘরের ভিতরে থাকে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতি নেবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, তাদের আফগানিস্তান ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। অনুরূপ কথা বলেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

৬৫ দেশের বিবৃতি : আফগানিস্তানে রাজনৈতিক সংকটের কারণে যারা দেশ ত্যাগ করতে চাচ্ছেন তাদের বাধা না দিতে তালেবানের প্রতি আহ্‌বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ৬৫ দেশ। রবিবার গভীর রাতে কানাডা, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যসহ ৬৫ দেশের স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্‌বান জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যারা আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চাচ্ছে তারা নিশ্চিন্তভাবে ত্যাগ করতে পারবেন। এ জন্য সীমান্তের ক্রসিং এবং বিমানবন্দর খোলা থাকবে। চলমান সংকটে বিদেশি এবং আফগান নাগরিকদের নিরাপদে দেশত্যাগে আমরা কাজ করে চলছি।’ দেশত্যাগে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা কোনো হয়রানির শিকার হলে এর দায় তালেবানকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছে এসব দেশ। টুইটারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন জানান, ‘আফগানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক যারা দেশত্যাগ করতে চান, তাদের যেন তা করতে দেওয়া হয়। এটি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে রয়েছে।’

আফগান সংসদ সদস্যরা পালিয়ে দিল্লিতে : আফগানিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে এসেছেন সে দেশের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তা। এদিকে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, আফগানিস্তানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিমান সি-১৭ গ্লোবমাস্টার প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রয়োজন পড়লেই এই বিমানে চাপিয়ে কূটনীতিক, দূতাবাস কর্মী, নাগরিকদের ফেরানো হবে।

এই বিভাগের আরও খবর