মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ

ঘরবন্দী থেকেও নারী নির্যাতিত

ধর্ষণ যৌতুক পারিবারিক সহিংসতাসহ সাইবার ক্রাইমের শিকার

জিন্নাতুন নূর

মহামারীর এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, লকডাউনের কারণে অফিস-আদালতে সশরীরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। করোনা সংক্রমণের কারণে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা অনেক নারী কাজ থেকে বিরতি নিয়েছেন। এ কারণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী, কিশোরী এবং তরুণীরা ঘরেই দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু ঘরবন্দী থেকেও যে নারী নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন তা নয়, উল্টো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় নারীর ওপর পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। অনলাইনে উল্লেখযোগ্য সময় কাটানোয় সাইবার বুলিং তথা অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী নারী-শিশুর ওপর ধর্ষণের মতো পাশবিক নির্যাতনও ঘটাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ঘরে থাকায় কর্মজীবীদের কাজের চাপ আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রামাঞ্চলে একদিকে যেমন বাল্যবিয়ে হচ্ছে অন্যদিকে যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার ঘটনায় নারীকে নির্যাতিত হতে হচ্ছে। নারী নির্যাতন রোধে বিশেষজ্ঞ মহল আদালতে বিশেষ ধরনের হেল্পলাইন সুবিধা চালু করার আহ্বান জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আদালত বন্ধ থাকায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো মহামারীতে মাঠে না থাকায় নারীর প্রতি নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না। আবার মহামারীতে একটি সমাজ তার নাগরিকদের অপরাধ করার সুযোগ তৈরি করে দেয় বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দেন। এ বাস্তবতায় আজ দেশব্যাপী জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু হয় ১৪৭ নারীর। এর মধ্যে নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ৯৪ জন। ধর্ষণের শিকার হন ৮১৩ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৩১ জনকে। ১৮৩ নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ধর্ষিত আট নারী আত্মহত্যা করেন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৭১ জন। সাত মাসে মোট ৮৩ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এ কারণে নয়জন আত্মহত্যা করেন। দুর্বৃত্তদের আক্রমণে ৬২ জন আহত হন। এ ছাড়া আগস্টে ১৫ কন্যাশিশুর বিবেয় হয়। ৫৪ জনের বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যায়। জানুয়ারি থেকে জুলাই- সাত মাসে যৌতুকের জন্য ৮১ নারী শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন। নির্যাতনে ৫০ জনের মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ‘বাংলাদেশের সাইবারপ্রবণতা ২০২১’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগীর মধ্যে মহামারীতে নারীরা বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি ও পর্নোগ্রাফির শিকার বেশি হচ্ছেন।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদেশফেরত শ্রমিকরা এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। তারা বিভিন্ন উসিলায় তাদের স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন করছেন। আবার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জড়িত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও মহামারীর কারণে সেভাবে মাঠে নেই। এর ফলে নারী নির্যাতনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোর্ট বন্ধ থাকায় মামলার কাজও অগ্রসর হচ্ছে না। মহামারীর কারণে পুরনো মামলাগুলোর জটও বেড়েছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের মানসিক মূল্যবোধের গঠন এখনো হয়নি। অন্যদিকে মহামারী মানুষকে ঘরবন্দী করে ফেলায় নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা যায় নারীরা এখন ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তিতে নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই নারীর প্রতি নির্যাতন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এখনো নারীবান্ধব নয়। নারীর যে অবস্থা তা নারীর সার্বিক ও সামাজিক অবস্থার দিক থেকে নারীকে অনেক বিপর্যস্ত করে তোলে। এজন্য বিভিন্ন কারণে অপরাধ সংঘটিত হয়। যখন সমাজে কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি হয় তখন সমাজ কিছু অপরাধ ঘটানোর সুযোগ করে দেয়। নারী-পুরুষ এখন করোনার কারণে ঘরবন্দী আছেন। এ কারণে অপরাধ করার সুযোগও বেশি। আবার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আমরা দেখছি মানুষ প্রান্তিক হচ্ছে। করোনার কারণে আয় কমে যাচ্ছে। মানুষের অর্থনৈতিক এ দুরবস্থা এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছে। এজন্য নারী নির্যাতনের মতো অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

সর্বশেষ খবর