শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ টা
পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন

আট মাসে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

আট মাসে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার

নারীর উন্নয়ন ও সুরক্ষায় সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও কন্যাশিশুর জন্য কিছুতেই নিরাপদ হচ্ছে না দেশের মাটি। গত আট মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৭৪ জন কন্যাশিশু। বাল্যবিয়ে হয়েছে ২ হাজার ৪৭৪ জনের। হত্যার শিকার ১৮৬ জন। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার তিনজন, অপহরণ ও পাচার হয়েছে ১৩৬ জন। আত্মহত্যা করেছে ১৮১ জন কন্যাশিশু।  গতকাল রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘কন্যাশিশু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০২২’ উপস্থাপনকালে এ তথ্য তুলে ধরে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের উদ্যোগে ও এডুকো বাংলাদেশের  সহায়তায় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের ২৪টি জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন দৈনিক পত্রিকার তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত কিছু তথ্য নেওয়া হয় সরাসরি তৃণমূল অর্থাৎ মাঠপর্যায় থেকে। ১৩ ক্যাটাগরির আওতায় ৫৬টি সাব-ক্যাটাগরিতে এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। অনুষ্ঠানে ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনটি জানায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী বিচারের জন্য ধর্ষণ মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে কাজ শেষ করতে হবে। তবে, বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য অপরাধী নির্ভয়ে অন্যায় করতে উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে নির্যাতন ও সহিংসতা বেড়েই চলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৭৬ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে একজন বিশেষ শিশুও রয়েছে। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ৩ কন্যাশিশু। অপহরণ ও পাচারের শিকার ১৩৬ জন, এর মধ্যে অপহরণের শিকার ৭৪ জন। অপহরণকৃত শিশুদের জোরপূর্বক যৌন পেশায় নিয়োজিত করা হয়। আট মাসে ২৮ জেলায় ২ হাজার ৪৭৪ জন কন্যাশিশুর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এ সময় প্রশাসনের সহায়তায় ৫৮৯টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া আট মাসে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ১৩ জন কন্যাশিশু। এর মধ্যে যৌতুক দিতে না পারায় পাঁচজন শিশুকে হত্যা করা হয়। ৫৭৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে আট মাসে। তাদের মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৩৬৪ জন ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮৪ জন। ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ছিল ৪৩ জন। প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভনে ৪৯ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২০ জনকে। এ ছাড়া ৮৭ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ১৫টি গৃহশ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা জানা গেছে। এর মধ্যে দুজনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়, একজন আত্মহত্যা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের আট মাসে আত্মহত্যা করেছে ১৮১ জন কন্যাশিশু। প্রেমে প্রতারণায় ৪৬ জন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে ৩৫ জন আত্মহত্যা করে। ২০২১ সালের প্রথম আট মাসে আত্মহত্যা করেছিল ১৫৩ জন। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতা ও দ্বন্দ্ব, পূর্ব শত্রুতার জের, যৌন নির্যাতনের প্রমাণ না রাখতে আট মাসে ১৮৬ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়। এই সময়ে আট জন কন্যাশিশুকে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রেখে যায় পরিবারের সদস্যরা।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে, প্রকট হচ্ছে। এটা একটা ব্যাধি। এই ব্যাধির প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাই কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যাবে না। পাশাপাশি কন্যাশিশুর মায়েদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন ও তাদের বঞ্চনার অবসানেও কাজ করতে হবে।

সর্বশেষ খবর