যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগ করে। ব্রেক্সিট যুদ্ধ বছরের পর বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আচ্ছন্ন করে রাখার পর এবার ইইউ’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের দিকে এগোতে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্যের লেবার সরকার।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভদের হটিয়ে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দ্রুতই ২৭ সদস্যের ইইউ ব্লকের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন।
কিয়ার স্টারমার আশা করছেন, ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ব্রিটেনের স্থবির অর্থনীতিতে গতি আনবে এবং এখন পর্যন্ত জনসমর্থনে ভাটা থাকা তার প্রধানমন্ত্রিত্বে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করবে।
লন্ডন থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, স্টারমারের লেবার সরকার ইইউ’র সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’-এর জন্য বহুল আলোচিত উদ্যোগকে আইনি কাঠামো দেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিল আনতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পার্লামেন্টে লেবারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ডানপন্থী বিরোধী দলগুলোর-ইইউ থেকে ব্রিটেনকে বের করে আনা কনজারভেটিভ এবং জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে’র তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে এই উদ্যোগ।
কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকের নেতা কট্টর ইউরো-সন্দেহবাদী নাইজেল ফারাজের কাছ থেকে ‘ব্রেক্সিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ আসতে পারে উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যা হওয়ার হোক।’
এই পদক্ষেপ লেবারের ভেতরেও বিভাজন উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে দলটি ইইউ কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় না ফেরার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ভাঙবে কি না, সে প্রশ্নে।
গত বছর স্টারমার ইইউ নেতাদের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি করেন, যার লক্ষ্য খাদ্য ও উদ্ভিজ্জ পণ্যের রপ্তানিতে জটিলতা কমিয়ে বাণিজ্য বাড়ানো।
তারা জ্বালানি খরচ কমাতে নতুন একটি বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়েও কাজ করতে সম্মত হন, যাতে যুক্তরাজ্যকে ইইউ’র অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এই চুক্তিগুলো ইইউ’র নিয়মকানুনের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সামঞ্জস্য বাড়ানোর অংশ।
বিলটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সরকারি কর্মকর্তা জানান, এটি সামঞ্জস্যের জন্য একটি ‘ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ দেবে।
তিনি বলেন, ‘বিলটি নিয়ম গ্রহণের ক্ষমতা দেবে এবং এতে পার্লামেন্ট কী ভূমিকা পালন করবে, তা নির্ধারণ করে দেবে।’
সরকার আশা করছে, বসন্ত বা গ্রীষ্মকালে আইনটি সংসদে তোলা হবে। এর ফলে এটি ২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট গণভোটের দশম বার্ষিকীর সময়ের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
ভোটের পর তিন বছর ধরে ইইউ ছাড়ার পর ব্রিটেনের সম্পর্ক কেমন হবে-তা নিয়ে পার্লামেন্টে তীব্র অচলাবস্থা চলেছিল, যা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র পদত্যাগে গড়ায়।
এই অচলাবস্থার অবসান ঘটে তার উত্তরসূরি বরিস জনসনের আমলে; তিনি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়ে ব্রেক্সিট কার্যকর করেন।
বর্তমানে নিয়মিত জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশদের অধিকাংশই অল্প ব্যবধানে নেওয়া ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত এবং ব্রেক্সিট প্রকল্পকে ব্যর্থ মনে করে, যা স্টারমারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
এক সমর্থক লেবার এমপি বলেন, ‘টোরি-ফারাজের ব্রেক্সিটে যে ক্ষতি হয়েছে, তার কিছুটা উন্মোচন ও সংশোধন দেখতে লেবার সদস্যরা প্রায় একমত।’
তিনি বলেন, ‘ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য আমাদের অর্থনৈতিক বার্তাকে জোরদার করে, সদস্য ও অধিকাংশ এমপির সমর্থন পায় এবং ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য ইতিবাচক প্রণোদনা দেবে।’ তবে সব লেবার এমপি একমত নন।
সম্প্রতি তাদের ১৩ জন ইইউ-পন্থী মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের একটি বিলে সমর্থন দেন, যেখানে যুক্তরাজ্যকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের আলোচনা শুরুর আহ্বান জানানো হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-যাকে লেবারের পরবর্তী নেতা হিসেবে স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি ধরা হয়-এমন চুক্তির পক্ষে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে স্টারমার কাস্টমস ইউনিয়নের বিরোধিতা করে আসছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি ইইউ’র সিঙ্গেল মার্কেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পুনঃসামঞ্জস্য চান।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক লেবার এমপি বলেন, ‘আমি চাই আমরা আরও এগোই।’ তার মতে, স্টারমার যথেষ্ট সাহসী নন। অন্যদিকে, কিছু লেবার এমপি চান, তিনি যেন এই বিষয়টি আর না ঘাঁটান।
এমপি জোনাথন হিন্ডার বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম ব্রেক্সিট বিতর্ক আবার শুরু করব না, আর এখন ঠিক সেটাই করছি।’
তিনি বলেন, ‘ইইউ’র বাইরে থেকেও আমরা একটি ন্যায্য, সমাজতান্ত্রিক ব্রিটেন গড়তে পারি, এবং সেটিতেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।’
যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, এই ‘রিসেট’ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা উন্নত করছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ৯.০ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার) যোগ করবে।
‘এটি বাস্তবায়নে আমরা আইন প্রণয়ন করব, এবং বিলের বিস্তারিত যথাসময়ে জানানো হবে,’ তিনি বলেন।
সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্ম থিঙ্ক ট্যাংকের উপপরিচালক ইয়ান বন্ড বলেন, বিলটি ‘গেম চেঞ্জার’ হবে কি না, তা নির্ভর করবে ব্রিটিশ সরকার নিজেকে কতটা স্বাধীনতা দেয় তার ওপর।
তিনি বলেন, ‘যদি তারা দৃঢ় থাকে, তবে এসব কথাবার্তায় মনোযোগ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
তবে তিনি যোগ করেন, তার ধারণা মন্ত্রীরা ‘ভীষণভাবে আতঙ্কিত, কারণ তারা যদি খুব সাহসী কিছু করে, রিফর্ম তাদের সমালোচনা করবে।’
সূত্র : এএফপি
বিডি-প্রতিদিন/বাজিত