বাঁশ একটি সুপরিচিত বস্তু। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এটি পাওয়া যায়। পরিবেশ রক্ষায় প্রকৌশলীরা এবার বাঁশের ওপরই আস্থা রাখতে পারেন। স্কুল-বিমানবন্দর-সুউচ্চ ভবন প্রভৃতি তৈরিতে আর ইস্পাত কিংবা কংক্রিট নয়, ব্যবহার করা যাবে বাঁশ। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত ম্যানুয়াল প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলীরা।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একদল প্রকৌশলীর দাবি, এখন সময় এসেছে নির্মাণ সামগ্রী হিসেবেও বাঁশকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার। কম কার্বন নির্গমনকে উৎসাহিত করতে ইস্পাত ও কংক্রিটের উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে বাঁশের ব্যবহার নিয়ে একটি ম্যানুয়াল প্রকাশ করেছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট স্থপতিরা।
যদিও ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রকল্পে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ২। সেখানে বাঁশের নল দিয়ে সিলিং এবং স্তম্ভ তৈরি করা হয়। উত্তর-পূর্ব চীনের নিংহাই বাঁশের টাওয়ার, যা ২০ মিটারেরও বেশি লম্বা, এটিকে ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশ্বের প্রথম সুউচ্চ ভবন বলে দাবি করা হচ্ছে।
বালির গ্রিন স্কুলে, বাঁশের তৈরি একটি তোরণ জিমনেসিয়াম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাঁশ কীভাবে টেকসই স্থাপত্যকে নতুন রূপ দিচ্ছে তার একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ এটি।
কলম্বিয়া এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে ভূমিকম্প ও বৈরি আবহাওয়ার বিরুদ্ধে বাঁশের তৈরি প্রাচীর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এই বস্তু দ্বারা টেকসই, দুর্যোগ-সহনশীল আবাসন তৈরি করা হয়েছে।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী এক-তৃতীয়াংশ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী ছিল নির্মাণ শিল্প। যার অর্ধেকেরও বেশি সিমেন্ট এবং সিমেন্টজাতীয় উপকরণ ব্যবহারের ফলে হয়েছে বলে দাবি করা হয়। নগরায়ন অব্যাহত থাকায়, আবাসন এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এই খাতের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো- কীভাবে চাহিদা মেটানো যায় এবং নেট শূন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে থাকা যায়।
কাঠের চেয়ে বাঁশ দ্রুত বর্ধনশীল। যেখানে একটি বাঁশ মাত্র তিন থেকে ছয় বছরেই পরিণত হয়। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত বড় জাতের গাছ, যেগুলো ভবন তৈরির কাছে বিশেষভাবে উপযোগী, সেগুলো পরিণত হতে সময় লাগে কয়েক দশক।
গ্রিন স্কুল প্রকল্পে কাজ করা যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটেলিয়ার ওয়ানের পরিচালক নীল থমাস বলেছেন, “কাঠ দিয়ে আপনি যা করতে পারেন, বাঁশ দিয়েও তা করতে পারবেন।”
ম্যানুয়ালটিতে বাঁশ ব্যবহারে ‘জ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অভাবের’ কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ম্যানুয়ালটির প্রধান লেখক এবং ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডেভিড ট্রুজিলো বলেছেন, তিনি আশাবাদী যে, এই ম্যানুয়াল প্রকৌশলীদের স্থানীয় সম্পদ বাঁশের ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলবে।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ু এলাকায় বাঁশ অত্যন্ত সহজলভ্য। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে পর্তুগালেও ফসল হিসেবে বাঁশের বৃহত্তর জাতের চাষ শুরু হয়েছে, যা ইউরোপে নির্মাণের উদ্দেশ্যে এই উপাদানটি আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পথ খুলে দিয়েছে।
থমাস বিশ্বাস করেন যে, ‘কম-কার্বন উপকরণ হিসেবে বাঁশ স্থপতি ও প্রকৌশলীদের জন্য অনুপ্রেরণা’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এটি দুই তলার বেশি ভবনের জন্য উপযুক্ত নয়।
ট্রুজিলো বলেছেন, বাঁশ দিয়ে তৈরি ভবনগুলো কার্বন সঞ্চয়ী হিসেবে কাজ করে এবং ফসল সংগ্রহের পর, একক চাষের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত মাটি পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করতে পারে। বাঁশ চাষের জন্য কীটনাশক বা সারেরও খুব কম প্রয়োজন হয়।
ট্রুজিলো আরও বলেন, “আমরা মানুষকে কার্বন-বৃদ্ধির উপকরণ ব্যবহার থেকে দূরে সরিয়ে কম কার্বন উপকরণ বা আরও ভালোভাবে, কার্বন-নির্মাণ উপকরণের দিকে নিয়ে যেতে পারি এই ধারণাটি নগরায়ন থেকে নির্গমন কমানোর জন্য একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান উপায় বলে মনে হয়।”
তিনি আশা করেন যে, ম্যানুয়ালটি ‘বিশ্বজুড়ে প্রভাষকদের পড়াশুনার বিষয়বস্তু হিসেবে বাঁশকে অন্তর্ভুক্ত করতে একমত হতে সহায়তা করবে। এভাবে বাঁশ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রকৌশলী এবং স্থপতিদের শিক্ষার উপকরণ হতে পারে।” সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
বিডি প্রতিদিন/একেএ