Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০৩

সাইবার অপরাধের হাতেখড়ি

মির্জা মেহেদী তমাল

সাইবার অপরাধের হাতেখড়ি

কয়েকদিন আগের ঘটনা। রাজধানীর একটি কলেজের শতাধিক শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো ভেঙে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। এর নেপথ্যে কারণ খোঁজ করতে যেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেল। এক শিক্ষিকা শাড়ি পরা অবস্থায় ক্লাসের বোর্ডে লিখছিলেন। এ দৃশ্য এক ছাত্র তার মোবাইলে ধারণ করে। একজন ছাত্র বিষয়টি ওই শিক্ষিকাকে অবহিত করান। শিক্ষিকা বিষয়টি কলেজ অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে বলেন। অধ্যক্ষ ওই ছাত্রের মোবাইল জব্দ করেন। কলেজ অধ্যক্ষ সব শিক্ষার্থীর মোবাইল জব্দের নির্দেশ দেন। জব্দ করা অ্যানড্রয়েড মোবাইলগুলো ভেঙে তা আগুনে পোড়ানো হয়। নরমাল মোবাইলগুলো শিক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়া হয়। এর আগে ধানমন্ডির একটি স্কুলের কয়েকজন ছাত্র গ্রুপ স্টাডির জন্য ফেসবুকে একটি পেজ খোলে। সেখানে স্কুলের একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে আলোচনা হয় এবং তাকে ব্যঙ্গ করে একটি আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে তারা। এ নিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝামেলা হয়। এর জেরে ভিডিওর বিষয়টি ভুক্তভোগী শিক্ষিকার নজরে আসে এবং আইনি পদক্ষেপ নেন তিনি। পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে তিন শিক্ষার্থীকে আটক করে। তবে তাদের সবার বয়স ১৮ বছরের নিচে। মুচলেকা নিয়ে তাদের সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফেসবুকে ঢাকার মিরপুরের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিনার (ছদ্দনাম) সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হান উদ্দিন আহমেদের। একপর্যায়ে পরিচয় ভালোবাসায় গড়ায়। তারা নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি দেওয়া-নেওয়াও শুরু করে।

কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এতে ক্ষুব্ধ রায়হান ফেসবুকে একটি ফেক আইডি খুলে জান্নাতকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। নিজেদের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি দেখিয়ে ভাইরাল করার হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে বিকাশের মাধ্যমে কিছু টাকাও আদায় করে রায়হান। কিছুদিন পর আবার রায়হান তার দুই বন্ধুকে দিয়ে একই কাজ করায়। এ সময় ভুক্তভোগীর বড় বোনকেও ছবি দেখিয়ে হুমকি দেয় তারা। পরে বাধ্য হয়ে তারা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রায়হানসহ তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে।

এভাবে প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধীদের শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা নিজেদের অজান্তেই কৌতূহলের বশে জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে প্রায় ৪০০ শিশু-কিশোর সাইবার অপরাধের শিকার হয়। ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে পরিবারকে জানাতেও ভয় পায়।

সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় সব বয়সী শিশুরাই কমবেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তবে তাদের অনেকেই নিজেকে সুরক্ষিত রেখে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে না। অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা যৌন শোষণ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই শিশুদের। ফলে অনেক সময় নিজের অজান্তেই কিছু ভুল হয়ে যায়। যেমন, অনলাইনে যৌনতা সম্পর্কিত বই পড়া, কাউকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, আইডি হ্যাকিং করা, ভাইরাস ছড়ানো, ফাঁদে ফেলা, পর্নোগ্রাফি তৈরি করা ইত্যাদি। অনেক সময় পছন্দের বিষয় খুঁজতে গিয়ে নিষিদ্ধ সাইট সামনে চলে আসে। কৌতূহলবশত এসব নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশ করে শিশুরা। অনেকেই এগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ে। তারা বলছেন, এ ছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ও ট্যাব দিয়ে শিশুরা ইন্টারনেটে বিভিন্ন গেম খেলে থাকে। সেই সুযোগে শিশুদের টার্গেট করে সাইবার অপরাধীরা। সেখানে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে শিশুদের নির্যাতনও করা হচ্ছে।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোমলমতি শিশুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, জি-মেইল ইত্যাদি) মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সেজে অ্যাকাউন্ট খুলছে। এতে শিশুরা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। আবার অনেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে বাংলাদেশে ‘অনলাইন চাইল্ড প্রোটেকশন প্লান্ট’ গাইডলাইন চালু করা প্রয়োজন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইনে যৌন হয়রানির বিষয়ে একটি জরিপ চালায়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের শতকরা ৩৫ দশমিক ৭ জনের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। এদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৮-এর মধ্যে। ২৫ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর বয়স ১১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর বয়স ৮ থেকে ১০-এর মধ্যে। জরিপে দেখা গেছে, ছেলেশিশুদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং  মেয়েশিশুদের ১৬ দশমিক ৯ শতাংশের নিজস্ব  মোবাইল ফোন রয়েছে। ছেলেশিশুদের ৬২ শতাংশ এবং মেয়েশিশুদের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ছেলেশিশুদের ৫২ শতাংশ এবং মেয়েশিশুদের ১৫ শতাংশের নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘অনলাইনে শিশু নির্যাতন বন্ধে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সাইবার অপরাধের বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এতে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ সাইটগুলো চিহ্নিত করে নিজেদের সুরক্ষার কৌশলগুলো জানতে পারবে।’


আপনার মন্তব্য