শিরোনাম
রবিবার, ২৯ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

উত্তরের চা চাষিদের মাথায় হাত

উৎপাদন খরচও মিলছে না, প্রতি কেজি ১৮ টাকা নির্ধারণ থাকলেও ১২ টাকার বেশি কিনছে না কারখানাগুলো

আকতারুজ্জামান, পঞ্চগড় থেকে ফিরে ও সরকার হায়দার, পঞ্চগড়

উত্তরের চা চাষিদের মাথায় হাত

চাপাতা চাষ করে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের চাষিরা একসময় ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখলেও সে স্বপ্ন এখন ফিকে হতে চলেছে। উৎপাদিত পাতা বিক্রি করে এখন খরচও মিলছে না কৃষকদের। জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ প্রতি কেজি চাপাতার মূল্য ১৮ টাকা নির্ধারণ করলেও কারখানাগুলো সিন্ডিকেট করে ১২ টাকার বেশি দামে কিনছে না। বাধ্য হয়ে নির্ধারিত দামের কম মূল্যেই বিক্রি করছেন কৃষকরা। আবার কারখানাগুলোর এমন সিন্ডিকেটের কারণে কেউ কেউ পাতা তুলছেন না। ফলে চা খেতেই নষ্ট হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। চাপাতা চাষ করে এখন মাথায় হাত উত্তরের কৃষকদের।

চাপাতার ন্যায্যমূল্যের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেও লাভ হয়নি চাষিদের। ১৮ মে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে কাঁচা চাপাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রতি কেজি কাঁচা চাপাতার মূল্য ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই সঙ্গে কারখানাগুলো থেকে অবৈধভাবে চাপাতা বিক্রি বন্ধের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। সভায় কারখানা মালিক, বাগান মালিক ও ক্ষুদ্র চা-চাষিদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু চাপাতা মূল্য নির্ধারণ কমিটির সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনো নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চাপাতা কিনছেন না চা কারখানার মালিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন কারখানায় মাত্র ১২ টাকায় প্রতি কেজি কাঁচা চাপাতা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতি ১০০ কেজি চাপাতার মধ্যে পানি বা পাতা ভেজা থাকার কথা বলে ২০ থেকে ৩০ কেজির টাকা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অন্তত ২৫ শতাংশ চাপাতার টাকা পাচ্ছেন না চাষিরা। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি চাপাতার দাম দাঁড়াচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকা। অথচ চা-চাষিরা বলছেন, ১ কেজি কাঁচা চাপাতা উৎপাদন করতে পানি সেচ ও কীটনাশক প্রয়োগে ১৫-১৬ টাকা ব্যয় হয়। তৈরি চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নীলকরদের মতো চা-চাষিদের কাঁচা চাপাতার ন্যায্য দাম না দিয়ে হুমকির মুখে ফেলেছেন বলেও অভিযোগ তাদের। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বৈরাগীগজ গ্রামের আবু তাহেরের মোট জমি ৩ বিঘা। এ জমিতে ধান, গম, শাকসবজি আবাদ করে সংসার চালাচ্ছিলেন তিনি। সাত-আট বছর আগে অন?্য আবাদ বাদ দিয়ে জমিতে চা-বাগান করেন। স্ত্রীসহ দিনরাত পরিশ্রম করে বাগানটি বড় করেন। তিনি বলেন, ‘চাপাতার টাকা দিয়ে সংসার আর সন্তানের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে চেয়েছিলাম। শুরুতে চা-বাগান থেকে লাভের মুখ দেখলেও বর্তমানে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছি না। দুর্মূল্যের বাজারে অভাব-অনটনে সংসার চালানো নিয়েই চিন্তায় আছি।’ তিনি জানান, বাড়ির হাঁস-মুরগিসহ গৃহপালিত পশু বিক্রি করে কয়েক মাস ধরে চা-বাগানের যত্ন নিয়েছেন। এখন চা-বাগান কেটে ফেলে আবার আগের কৃষিতে ফিরতে চাইছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আবু তাহের। সদর উপজেলার চা-চাষি মো. শাহজালাল অভিযোগ করেন, প্রতিটি কারখানা রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে স্থানীয় বাজারে তৈরি চাপাতা বিক্রি করছে। অবৈধভাবে কয়েক শ চা কোম্পানি চায়ের ব্যবসা করছে। প্রতিটি কারখানা এভাবে দালালের সৃষ্টি করেছে। দালাল ছাড়া তারা কৃষকের কাছ থেকে চাপাতা কিনছে না। এতেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে, কারখানা মালিকরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সিন্ডিকেট করে কাঁচা চাপাতার মূল্য কমিয়ে দিচ্ছেন। চা-চাষিরা কয়েক বছর আগে কাঁচা চাপাতার মূল্য কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা পেলেও প্রায় তিন বছর ধরে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। বর্তমানে তারা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে হাহাকার। বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, ‘চাপাতা মূল্য নির্ধারণ কমিটি ১৮ টাকা দরে কাঁচা চাপাতার মূল্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু কারখানাগুলো এখনো তা মানছে না। আশা করি জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পাতা ভেজা থাকলে মাত্র ১০ শতাংশের মূল্য কম দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অনেক চা-চাষি নির্ধারিত মানের (সাড়ে তিন থেকে চার পাতা) বাইরে পাতা দিচ্ছেন। কিন্তু কারখানাগুলোকে তো প্রতিযোগিতা করে বাজারে টিকে থাকতে হয়। যারা ভালো মানের পাতা দিচ্ছেন তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকটি কারখানা পরিদর্শন করেছি। আশা করি নির্ধারিত মূল্যের কম দামে পাতা কেনার অভিযোগ আর থাকবে না।’

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর