প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্যে বিভিন্ন শক্তির হস্তক্ষেপ কামনা করলেন বিএনপি-জামায়াত নেতারা। গত ৩ মে বস্টনে বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, 'বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র চরম হুমকির মুখে। সাংবিধানিক প্রথা ও প্রতিষ্ঠান প্রায় অকার্যকর। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতায়নে শাসন ব্যবস্থা পর্যুদস্থ। এ পরিস্থিতি উত্তরণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ জরুরি।'
বস্টন বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে অতি সম্প্রতি গঠিত 'ওয়াচ ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট' নামক একটি সংস্থার ব্যানারে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বেরন হলে 'অনস্লট অন হিউম্যান রাইটস, পলিটিক্যাল ফ্রিডম: ক্যান ডেমোক্রেসি সার্ভাইভ ইন বাংলাদেশ' শিরোনামে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কানাডার ডাউসন কলেজের ফ্যাকাল্টি অব হিউম্যানিটিজের অধ্যাপক ড. আবিদ বাহার ও সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার তানভীর নওয়াজ। এতে অতিথি আলোচক হিসেবে অংশ নেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. ওসমান ফারুক, বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারী, জাসাস নেত্রী বেবী নাজনীন, বিএনপি নেতা সৈয়দ বদরে আলম ও সোহরাব খান। মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন আজাদ খান। এ অনুষ্ঠানের অন্যতম অতিথি হিসেবে সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার নাম প্রচার করা হলেও তাকে সেখানে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের মানবাধিকার লংঘন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণের তথ্যভিত্তিক বিস্তারিত চিত্র তোলে ধরেন অধ্যাপক ড. আবিদ বাহার ও সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার তানভীর নওয়াজ। পরিস্থিতি উত্তরণে ও পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করেন এবং এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
ড. ওসমান ফারুক বলেন, বাংলাদেশে নিপীড়ন ও নির্যাতনের সকল মাত্রা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন পিন্টু কারা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। এরকম মৃত্যু, গুম ও খুনের ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। একটি স্বাধীন দেশে এ অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। যাদের দ্বারা গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণ হচ্ছে তাদের নিকট তদন্ত চাওয়া বৃথা। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সকল অনিয়মের তদন্ত করতে হবে।
সেমিনার শেষে বেবী নাজনীনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে।
এ সেমিনার প্রসঙ্গে বস্টনস্থ নিউ ইংল্যান্ড আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ৪ মে সোমবার সন্ধ্যায় প্রদত্ত এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, '৬ কংগ্রেসম্যানের সাক্ষর জালিয়াতির পর এবার বিএনপির সেমিনার জালিয়াতির ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন প্রবাসীরা। কাল্পনিক হার্ভার্ড সেমিনারের নামে মিথ্যাচার করছে বিএনপি। আর এবার এই জালিয়াতির মূলে রয়েছে বস্টন বিএনপির প্রাক্তন সভাপতি কাজী নুরুজ্জামান এবং এ ব্যাপারে তাকে সহায়তা করেছেন বস্টনে জামাতের একনিষ্ঠ কর্মী তানভীর নেওয়াজ ও কানাডার আবিদ বাহার।' 'নিউইয়র্ক এবং বস্টনে জামাত-শিবির কর্তৃক রাজাকারের বিচার ঠেকানোর যতগুলি অনুষ্ঠান হয়েছে সবগুলোতে এ দু’জন সোচ্চার ছিলেন। তারা একাত্তরের ঘাতকদের রক্ষায় নানা কল্পকাহিনীও লিখে চলেছেন।'
নিউ ইংল্যান্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউসুফ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল ইউসুফ এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. সৈয়দ আবু হাসনাত যুক্ত বিবৃতিতে আরো জানান, 'হার্ভার্ডে সেমিনারের নামে মিথ্যাচার ও ভন্ডামি করা হচ্ছে। এ ধরনের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের সাথে হার্ভার্ডের কোন সম্পৃক্ততা থাকে না, তথাপি এক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াত-চক্র পেট্রল বোমা সন্ত্রাসী ও পলাতক দুর্নীতিবাজ সাদেক হোসেন খোকাকে নিয়ে সেমিনার করতে চাইলে হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ পুরো অনুষ্ঠান বাতিল করে এবং আয়োজক বস্টন বিএনপি’র প্রাক্তন সভাপতি কাজী নুরুজ্জামানকে তা জানিয়ে দেয়। এরপরও বিএনপি ও জামায়াত-চক্র তড়িঘড়ি করে জনা কয়েক লোক নিয়ে পাশের এক বিল্ডিংয়ে গিয়ে মনগড়া কয়েকটি ছবি তুলে তাকে হার্ভার্ড সেমিনার বলে চালানোর প্রয়াস চালাচ্ছে।'
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেছেন, 'কিছুদিন আগে ৬ কংগ্রেসম্যানের সাক্ষর জালিয়াতির পর এটা তাদের আরেক জালিয়াতি। দেশের মত বস্টনেও বিএনপির নেতৃত্ব নিজেদের দলের মধ্যেই আস্থার সংকটে পড়েছে। বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী এ অনুষ্ঠানে যোগ দেয় নাই। কারণ অনুষ্ঠানের প্রচারপত্রে ঘোষিত বক্তারা ছিল মূলত জামাতের লোকজন। বিএনপির আন্দোলনের চেয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালই তাদের মূল উদ্দেশ্য।'
হার্ভার্ড সেমিনারের নামে সুদূর এ প্রবাসেও বিএনপি-জামায়াত জোটের এহেন রাজনৈতিক কর্মসূচীর কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউএস কমিটি ফর সেক্যুলার ডেমক্র্যাটিক বাংলাদেশের সভাপতি ড. নূরন্নবী, সেক্রেটারি জাকারিয়া চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক ড. এম এ বাতেন, সদস্য-সচিব মশিউল আলম জগলু, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরনবী কমান্ডার, যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সভাপতি মিসবাহ আহমেদ, সেক্রেটারি ফরিদ আলম, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সেক্রেটারি শিতাংশু গুহ প্রমুখ।
বিডি-প্রতিদিন/০৫ মে ২০১৫/ এস আহমেদ