Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:০৯

সিঙ্গাপুরের জুরং উদ্যান

মো. মনির হোসেন

সিঙ্গাপুরের জুরং উদ্যান

উদ্যানের পাখি গান গায় বিভিন্ন ভাষায়। চলে পাখিতে পাখিতে শক্তির লড়াইয়ের রোমাঞ্চকর খেলা। আছে পাখির সঙ্গে দর্শক পর্ব। পাখিদের রিং খেলা। পাখির সমবেত উপস্থিতি। একেবারেই ব্যতিক্রম ও সৃজনশীল একটি শো। যা দেখে দর্শকমন প্রশান্তিতে ভিজে যাবে।

 

গহিন বন। পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত লরি লফট। লোহার শেকলের পর্দা ভেদ করে ভিতরে ঢুকে দেখি ডানে বামে উপরে নিচে পাখি উড়ছে। দর্শনার্থীরা খাবারের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও সিঙ্গাপুরী ৩ ডলার দিয়ে এক বাটিতে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। ব্যাস! পাখি আমার কাছেও আসা শুরু করল। একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম পুরো এলাকাটা নেটিং করা। প্রায় ৩২ হাজার বর্গফুটের এই এলাকাটিতে সহস্রাধিক পাখি মুক্তভাবে ওড়াওড়ি করে। গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ ঘন এ জঙ্গলটিতে পাখি বুঝতেই পারে না যে তারা একটি গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ। কারণ এই নেটিং এলাকার অভ্যন্তরে ১৫০ ফুটের গাছও আছে। বলছিলাম সিঙ্গাপুরের জুরং পাখি উদ্যানের কথা। এটি জুরং জেলার জুরং পাহাড়ে অবস্থিত। প্রায় ৫০ একর আয়তনের এ উদ্যানে ৩৮০ প্রজাতির প্রায় ৫ হাজার প্রাণী আছে। আছে মনমাতানো এবং আকর্ষণীয় অ্যাম্ফিথিয়েটার পুলস। যেখানে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত শো চলে। পাখি গান গায় বিভিন্ন ভাষায়। চলে পাখিতে পাখিতে শক্তির লড়াইয়ের খেলা। আছে পাখির সঙ্গে দর্শক পর্ব। পাখিদের রিং খেলা। পাখির সমবেত উপস্থিতি। একেবারেই ব্যতিক্রম ও সৃজনশীল একটি শো। যা দেখে দর্শকমন প্রশান্তিতে ভিজে যাবে। শো শেষে গেলাম পাশের বিশাল লেকে যেখানে হাজার হাজার জলচর পাখির মিলনমেলা। কয়েক প্রজাতির ফ্লেমেঙ্গো, হর্নবিল, হাঁসের জলকেলি আর উন্মুক্ত দৌড়ঝাঁপ দেখে কিছুক্ষণের জন্য মন চলে গিয়েছিল টাঙ্গুয়ার, বাইক্কা বিল বা  হাকালুকি হাওরে। যেখানে পরিযায়ী পাখিরা ঠিক এভাবেই জলকেলি আর ওড়াওড়ি করে মুখরিত রাখে পর্যটকদের।

এ উদ্যানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাইড আছে সেটি হচ্ছে রিভার সাফারি। নদীবিষয়ক রাইড তাই বিলম্ব না করে সিঙ্গাপুরী ৫০ ডলার দিয়ে টিকিট কেটে উঠে বসলাম বোটে। আমাকেসহ ৮ জন দর্শনার্থী নিয়ে বোট চলতে শুরু করল। এই নৌপথটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা। তারা চেষ্টা করেছে আমাজানের একটা আবহ তৈরি করতে। বোট দিয়ে যাওয়ার পথে দেখা যায় কোথাও এক ঝাঁক ফ্লেমিঙ্গো, আবার কোথাও হর্নবিল, বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস বিচরণ করছে। আবার কোথাও স্থির মনে দাঁড়িয়ে ভালুক দেখছে আমাদের। আর এক গাছ থেকে অন্য গাছে বানর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ বুকে ভর দিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। অন্যরকম একটি থ্রিলিং সিচুয়েশন। গা ছমছম করা অবস্থা। সারা দিন কেটে যাবে কিন্তু উদ্যান থেকে বের হতে মন চাইবে না। এখানে পাওয়া যাবে প্রকৃতি, প্রাণী আর পাখির অপূর্ব সম্মিলন। আর এ সমন্বয় উপভোগ করার জন্য প্রতিবছর এই উদ্যানে প্রায় ৯ লাখ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। কখনো সিঙ্গাপুর গেলে এই  উদ্যানে যেতে ভুলবেন না।

তারপর ট্যাক্সি করে চলে গেলাম সেন্তোসা। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। সেন্তোসার ভুবনটা অনেক বড়। হোটেল রিসোর্ট ওয়ার্ল্ড সেন্তোসা ছাড়াও আছে আরও ৭টি হোটেল।

আছে ইউনিভার্সেল স্টুডিও, টাইগার স্কাই টাওয়ার, বাটারফ্লাই পার্ক, আন্ডার ওয়াটার ডলফিন লগোন, ফোরডি অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড, ওয়েভ হাউস সেন্তোসা আইফ্লাই সিঙ্গাপুর, ভিভো সিটি থেকে সেন্তোসা মনোরেল ও ক্যাবল কার ইত্যাদি। সেন্তোসাতে আরও আছে পালোয়ান, সিলোসো এবং তনজং নামে ৩টি মনোরম সৈকত। সেন্তোসার বক্ষে ঠাঁই নিয়ে এতকিছু উপভোগ করে মন ভালো না হয়ে পারে না। সেন্তোসা মনের গভীরে দাগ কাটে, মনকে ভুলিয়ে দেয়। আরও ভালো লাগে সেন্তোসা থেকে দেখা ভিভো সিটিতে নোঙ্গর করা জাহাজগুলোকে। চলতে চলতে আবার দেখা মিলল সিংহ মূর্তির। এখানে এর নাম সেন্তোসা মারলিয়ন। সিংহ মূর্তিটাকে সিঙ্গাপুরের মার্কেটিং আইকন হিসেবে ব্যবহার করে। বলা যায় এটা সিঙ্গাপুরের মাস্কট। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সেন্তোসা আইল্যান্ডের নাম অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। এক সময় এর নাম ছিল ডেথ অব আইল্যান্ড। ১৯৭২ সালে সাধারণ মানুষের অনুরোধে সিঙ্গাপুর পর্যটন কর্তৃপক্ষ এর নাম রাখেন সেন্তোসা। মালয় ভাষা সেন্তোসার অর্থ শান্তি। আর প্রতিবছর এই শান্তির দ্বীপে নিজেকে শান্ত করতে সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ২৫ মিলিয়ন পর্যটক আসেন।

 

সিঙ্গাপুর গিয়েছি বহুবার। মেরিনা বে প্রতিবারই পরিদর্শন করেছি। কিন্তু এখানে যে ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ রয়েছে তার মুখটি ছাড়া পুরো অংশ দেখা হয়নি কখনো। এবার সে চেষ্টাই করলাম। লিলি এভিনিউ থেকে নেমে ব্রিজের নিচ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রকৃতি উদ্যানে। জল ফুল আর বৃক্ষে ভরা প্রকৃতি উদ্যান। এ উদ্যানটি ২৫০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এ প্রকল্পটি সিঙ্গাপুর সরকারের নগরে বাগান থেকে বাগানে নগর রূপান্তরিত করার একটি মহাপরিকল্পনা। উদ্যানটি বে সাউথ গার্ডেন, বে ইস্ট গার্ডেন ও বে সেন্ট্রাল গার্ডেন এ তিনটি ওয়াটার ফ্রন্টে বিভক্ত। এখানে ফ্লাওয়ার ডোম, ক্লাউড ফরেস্ট, সুপার ট্রি গ্রোভ, ফ্লাওয়ার মার্কেট, শিশু পার্ক, মন মজানো একটি ক্যাকটাস গার্ডেনসহ প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিট রয়েছে। এ ভ্রমণে আমাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরিয়ান বন্ধু আইরিন লাই। প্রকৃতি উদ্যানসহ পুরো সিঙ্গাপুর সম্পর্কে তার কাছ থেকে পেলাম বিস্তর ধারণা।

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দ্বীপ। তবুও এই দ্বীপটিই আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। অথচ আজ থেকে মাত্র ৫২ বছর পেছনে তাকালে দেখা যাবে ভিন্ন এক দৃশ্য। কী ছিল সিঙ্গাপুর? ১৯৫৯ সালের সেই নগর রাষ্ট্রটিকে অপরাধ ও দারিদ্য্রে জর্জরিত একটা বাণিজ্যকেন্দ্র বলা যায়। খুবই ছোট এই নগর রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। প্রকৃত অর্থে কিছুই ছিল না তাদের। তখন তাদের পেশা- নেশা, বেঁচে থাকা সব কিছুর সঙ্গেই জড়িত ছিল ফিশিং। আর  সেটি পরিচিত ছিল জেলেদের গ্রাম হিসেবেই। সিঙ্গাপুরের সেই  জেলেরাই মাত্র ৫২ বছরে নিজেদের নিয়ে গেছেন আধুনিকতার চরম শিখরে। হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, গণতান্ত্রিক ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাথাপিছু আয়ের দেশে। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রের খ্যাতি তো রয়েছেই। ৯ আগস্ট ১৯৬৫ সালে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার পর থেকেই মূলত এ দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে একটু একটু করে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন লি কুয়ান। ৭১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ সিঙ্গাপুরের পুরোটাই পর্যটন অনুষঙ্গ। আর ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রকৃতি উদ্যানটি বিশে^র ভ্রমণপ্রিয় মানুষের খুবই প্রিয়। এ বাগানটির পরিকল্পনা করা হয় ২০০৫ সালে। কাজ শুরু হয় ২০০৬ সালে। দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় ২০১২ সালে। ২০১৪ সাল নাগাদ এর দর্শনার্থী ছিল প্রায় ৭ মিলিয়ন, যা ২০১৬ সালে প্রায় অর্ধশত মিলিয়ন হয়।

 

ভ্রমণ টিপস :

সিঙ্গাপুরে সব সময়ই গরম। এটা বিবেচনায় রেখে পোশাক নির্বাচন করা উচিত। স্থানীয় নিয়ম-কানুন মেনে পুরো সিঙ্গাপুর নিরাপদে ভ্রমণ করা যাবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, সানগ্লাস ও ক্যাপ সঙ্গে রাখা ভালো। এখানকার লিটারিং বা ময়লা ফেলা বিষয়ক আইন কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। যেখানে সেখানে থুথু ফেলা বা ময়লা ফেলা এখানে একটি অপরাধ। কাজেই লিটারিং করলে শাস্তি হচ্ছে একদিন একটি পরিবেশ সচেতনতা বিষয়ক বোরিং সেমিনারে অংশ নিতে হবে ও তারপর পুরো একটি দিন একটি নির্দিষ্ট এলাকার ঝাড়ুদারের দায়িত্ব নিতে হবে।

 

কীভাবে যাবেন :

সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মালিন্দো, এয়ার এশিয়া ও বাংলাদেশ এয়ারলাইনসযোগে চেঙ্গি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। সেখান থেকে বাস/টেক্সিযোগে পছন্দের যে কোনো স্থানে যাওয়া যাবে।

 

কোথায় থাকবেন :

কম খরচে থাকার জন্য লিটল ইন্ডিয়া। আর রাতের সিঙ্গাপুর উপভোগ করার জন্য ক্লার্কি রিভারসাইড পয়েন্ট। লাক্সারিয়াস রাত যাপনের জন্য মেরিনা বে ও সেন্তোসা রিসোর্ট।


আপনার মন্তব্য