শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৪

পিয়াজের দাম আর কত বাড়বে

লাগামহীন মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নির্দেশ মানে না কেউই

নিজস্ব প্রতিবেদক

পিয়াজের দাম আর কত বাড়বে
রাজধানীতে গতকাল পিয়াজের জন্য কাড়াকাড়ি -রোহেত রাজীব

দেশের মানুষের নাভিশ্বাস তুলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে পিয়াজ। দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা পিয়াজের দাম এখন সব সীমা ছাড়িয়ে কেজি ২২০ টাকা হয়েছে খোলাবাজারে। আবার বর্ধিত মূল্য দিয়েও অনেক স্থানে পিয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে পিয়াজের দাম ঝাঁজ ছাড়ানো শুরু করলেও গত দেড় মাসে কিছুই করতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। লোক দেখানো কয়েকটি বৈঠক-অভিযান আয়োজন ও প্রতিশ্রুতির নামে মিথ্যা আশ্বাসই কেবল দেওয়া হচ্ছে মানুষকে। সংকটের শুরুতে আমদানিকারকদের বৈঠক ডেকে বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেই উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি তার ডাকা বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন মাত্র একজন। সেই দুর্ভোগ যখন চরমে তখনই লঘু প্রয়োজনে দীর্ঘ ১০ দিনের বিদেশ সফর করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সবাই জানতে চায়, পিয়াজের দাম আর কত বাড়বে?

জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ক্যাবের সভাপতি ড. গোলাম রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংকটের শুরুতে বাংলাদেশ বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ভারত যখন পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে তখন বাংলাদেশে সরবরাহ ঘাটতি সৃষ্টি হয়। এ সময় সরকার তিনটি বড় প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন দেশ থেকে পিয়াজ আমদানির জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে এলসি মার্জিন কমানোসহ আরও কিছু সুবিধা ছিল। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের শাস্তিমূলক জরিমানা করা হয়েছে। এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেকে ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন। তাদের বেশির ভাগ এখন জরিমানার টাকা তুলতে আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে আমদানিকারকরা সরকারের কোনো কথা শোনেননি। তাদের বাধ্য করা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের নিজেরও আমদানি করার কোনো উদ্যোগ নেই। এখন সরকারের আমদানি করার সময়ও নেই। এটা চরম একটি ব্যর্থতা। আপাতত এ অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদে কৃষককে ন্যায্য মূল্য দিয়ে পিয়াজের উৎপাদন বাড়াতে হবে। পিয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। চাহিদার পুরোপুরি পিয়াজ উৎপাদনের পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে এমন পরিস্থিতির মুখে বারবার পড়তে হবে।’

গতকাল রাজধানীর বাজারগুলোয় প্রতি কেজি পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা দরে। সকালেও কোনো কোনো বাজারে দাম ছিল ১৮০ টাকা। কোনো কোনো খুচরা বাজারে দাম ২২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কেবল রাজধানী নয়, বাইরেও পিয়াজের বাজারে আগুন! জানা গেছে, ভারত রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশে ৩০ টাকার পিয়াজ হঠাৎ করে দ্বিগুণের বেশি দর উঠে যায়। সেপ্টেম্বরে এ অস্থিরতা সৃষ্টি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কয়েকটি বাজারে লোক দেখানো অভিযান চালায় খুচরা ব্যবসায়ীদের ধরতে। খুচরা ব্যবসায়ীদের শাস্তিমূলক জরিমানা করা হয়। একই সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার উদ্যোগ নেয়। সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যমন্ত্রী বৈঠক ডেকে নিজেই উপস্থিত হননি। এমনকি বৈঠকে মাত্র একজন ব্যবসায়ী উপস্থিত হন। মন্ত্রীর ডাকে কেউ সাড়া দেননি। এরপর প্রতিদিনই দর বাড়ছে পিয়াজের। গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বাজারে ২২০ টাকা কেজি দরে পিয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী গিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ট্রেড কনফারেন্স, অস্ট্রেলিয়া ও দ্বিপক্ষীয় সভায় যোগ দিতে নিউজিল্যান্ড সফরে। ১১ নভেম্বর তিনি ঢাকা ত্যাগ করেছেন। দেশে আসবেন ২১ নভেম্বর।

পিয়াজের দর আকাশচুম্বী হলেও একাধিক মন্ত্রীর কথায় বারবার এসেছে ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ করছি, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে’। তবে বাস্তবে প্রতিদিন বাড়ছে দর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় এখনো বাংলাদেশে পিয়াজের মজুদ রয়েছে প্রচুর। সম্প্রতি কনসাস কনজুমারস সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টন পিয়াজ আসছে, যার ক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি ২৬ থেকে ৪২ টাকা, গড়ে ৩৪ টাকা। সে হিসাবে যে পরিমাণ বিদেশি পিয়াজ আসছে, এর বিক্রয়মূল্য ৫০ টাকার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক। বাণিজ্যমন্ত্রী একাধিকবার পিয়াজের দর বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলেছেন সিন্ডিকেটের কথা। এমনকি সিন্ডিকেট চিহ্নিত করার কথাও তিনি বলেছেন। তবে কোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তাকে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। পিয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি হলেও আলাদা করে কোনো তদারকি সেল গঠন করেননি তিনি। মন্ত্রী দেশে না থাকায় এখন বাজার দেখারও কেউ নেই।

বাংলাদেশে পিয়াজের কেজি ২২০ টাকা হলেও বিশ্বের কোথাও এত দামে বিক্রি হচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ পিয়াজের দর দেখা গেছে- ভারতে বাংলাদেশি টাকায় সর্বোচ্চ ৩১, মিয়ানমারে ৫৬, নেপালে ৩৮, পাকিস্তানে ৩০, রাশিয়ায় ৩৯, যুক্তরাজ্যে ৩৫, কাজাখস্তানে ২৭ ও মিসরে বিক্রি হচ্ছে ৩১ টাকায়।

খাতুনগঞ্জে আতঙ্ক : চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ীরা জানান, একদিকে ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, অন্যদিকে বাজারগুলো মনিটরিংয়ের নামে র‌্যাব-পুলিশ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পাশাপাশি দেশের একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫০ হাজার টন পিয়াজ আমদানির ঘোষণা বাজারকে অস্থির করে দিয়েছে। ফলে নিয়মিত আমদানিকারকরা তুলনামূলকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন পিয়াজের আমদানি। এসব কারণে অবিশ্বাস্য দাম বেড়েছে পিয়াজের, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বুধবার সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পিয়াজের দাম ছিল কেজি ১৪৫ এবং তুরস্ক ও মিসর থেকে আনা পিয়াজের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। কিন্তু গতকাল সকালে বাজার বসতে না বসতেই সেই একই পিয়াজের পাইকারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০ ও ১৬৫ টাকায়। খুচরা বাজারে গতকাল সকাল থেকে বিক্রি হয় ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকায় গতকাল পিয়াজের অনেক আড়তদার তাদের আড়ত বন্ধ রাখেন। দু-একটি যা খোলা ছিল, সেগুলোয় বিক্রেতাদের ভিড় ছিল লক্ষ্য করার মতো। অনেকটা কাড়াকাড়ি করে দুই থেকে পাঁচ বস্তা করে পিয়াজ চড়া দামেই কিনে নিয়েছেন খুচরা দোকানিরা। কেউ কেউ খাতুনগঞ্জে না পেয়ে নগরের রিয়াজুদ্দিন বাজারে গিয়ে বেশি দামে কিনে নিয়েছেন পিয়াজ।

বরিশালের আড়তে মাথায় হাত : বরিশালে পিয়াজের দাম সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। গতকাল বরিশালের পাইকারি বাজারে তুরস্ক ও মিসরের পিয়াজ কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ ও মিয়ানমারের পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৯০ টাকায়। অন্যদিকে খুচরা বাজারে মিসর ও তুরস্কের পিয়াজ প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ ও মিয়ানমারের পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকায়। বাজারে দেশি কিংবা ভারতীয় পিয়াজ নেই। আমদানি ও সরবরাহ না বাড়লে পিয়াজের ঝাঁজ (দাম) আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বরিশালের পিয়াজ আড়তদার মো. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘বরিশালে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক পিয়াজের চাহিদা রয়েছে। এখন প্রতিদিন এক ট্রাকের বেশি পিয়াজ আসছে না। সরবরাহ কম থাকায় মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে।’ পিয়াজের সরবরাহ না বাড়লে মূল্য বৃদ্ধি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই বলে তার দাবি।

বরিশাল পিয়াজ আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. এনায়েত হোসেন বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) ফরিদপুরে গ্রামাঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি পিয়াজ পাইকারি ২০৫ টাকা করে কিনেছেন বেপারিরা। শ্রমিক, পরিবহনসহ বরিশাল আড়তে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে ২১৫ টাকার বেশি খরচ পড়বে। তাহলে তারা পাইকারি কত টাকায় প্রতি কেজি পিয়াজ বিক্রি করবেন? পিয়াজ নিয়ে হইচই করার সুযোগে বাজারে চাল, রসুন ও আদার মূল্য যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তা কেউ দেখছে না বলে দাবি করেন তিনি।

আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ : যেসব ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক হারে পিয়াজের দাম বাড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। সরকারের এ সংস্থাটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে বলেছে, ‘গত ২৯ সেপ্টেম্বরের পর বাজারে পিয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

২৯ সেপ্টেম্বর পিয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ভারত। এর পর থেকেই পণ্যটির দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ৫ নভেম্বর পণ্যটির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে পর্যালোচনা সভা করে প্রতিযোগিতা কমিশন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। দাম বাড়ার পরপরই পিয়াজ উৎপাদন ও আমদানি-সংশ্লিষ্ট ১০টি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।’

সচিব বলেন, পিয়াজের সরবরাহ বাড়াতে তিনটি বড় কোম্পানির পিয়াজ মিসর ও তুরস্ক থেকে বাংলাদেশের পথে রয়েছে। আমদানি করা পিয়াজ বন্দরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাস করা হয় সেজন্য কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে পিয়াজ আমদানির জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ব্যবসায়ীদের আমদানিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। সবচেয়ে আশার কথা, কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও মেহেরপুরে আগাম জাতের যে মুড়িকাটা পিয়াজ হয়, তা এরই মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে দ্রুত পিয়াজের দাম কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন বাণিজ্য সচিব।


আপনার মন্তব্য