Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০৪

নূরজাহান কাহিনি

নূরজাহান কাহিনি

মুঘল আমলে সবার ভাবনা ছিল শাহজাদা সেলিমের প্রেম আনারকলিকে ঘিরে। কিন্তু শাহজাদা যখন সম্রাট তখনকার প্রেম বিয়ে সব কিছ্ইু নূরজাহানকে ঘিরে। এমনকি মুঘল হেরেমে সবচেয়ে দাপুটে সম্রাজ্ঞী হিসেবে তাকে দেখা যায়। ‘আমার রাজ্য আমি এক পেয়ালা মদ আর এক বাটি সুরুয়ার বিনিময়ে আমার প্রিয় রানীর কাছে বেচে দিয়েছি।’ এই উক্তিও আর কারও নয়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের। ৩০ জন মুখ্য পত্নীর মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় এবং ২০তম পত্নী ছিলেন এই নূরজাহান। সম্ভবত তিনিই একমাত্র নারী যার কোনো মুঘল সম্রাটের ওপর এতখানি প্রভাব বিদ্যমান ছিল। নূরজাহান ছিলেন মার্জিত, শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী ও একইসঙ্গে কর্তৃত্বপরায়ণ নারী। নূরজাহান কাহিনি বিস্তারিত জানাচ্ছেন- তানিয়া তুষ্টি

 

সম্বলহীন পরিবার থেকে স্থান নিয়েছিলেন হেরেমে

তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছু। নূরজাহান ছিলেন একজন কবি, দক্ষ শিকারি এবং খুবই সৃজনশীল এক স্থপতি। আগ্রায় তার তৈরি নকশাতেই নির্মাণ করা হয়েছিল তার বাবা-মার সমাধিসৌধ। কথিত আছে পরবর্তীতে এই স্থাপত্য রীতি মেনেই নাকি তাজমহলের স্থাপত্য নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

ষোড়শ শতকের শুরু থেকে পরবর্তী প্রায় ৩০০ বছর ধরে ভারতবর্ষ শাসন করেছে মুঘল শাসকরা। তখনকার সময়ে তারা ছিলেন ভারতের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজবংশ। এই রাজবংশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক তীক্ষতা ছিল উল্লেখ করার মতো। মুঘল সম্রাট এবং মুঘল রাজ পরিবারের নারীরা ছিলেন শিল্প, সংগীত এবং স্থাপত্যকলার বিশেষ সমঝদার। তারা বিশাল সব নগরী, প্রাসাদোপম দুর্গ, মসজিদ এবং সৌধ নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। কিন্তু পুরো মুঘল রাজবংশের একমাত্র নারী শাসক নূরজাহানকে নিয়ে এখনো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে চমকপ্রদ অনেক লোকগাথা।

নূরজাহানের প্রেম ও তার সাহসিকতার অনেক কাহিনি ছড়িয়ে আছে। মুঘল প্রাসাদের অন্দরমহলে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছু। নূরজাহান ছিলেন একজন কবি, দক্ষ শিকারি এবং খুবই সৃজনশীল এক স্থপতি। আগ্রায় তার তৈরি নকশাতেই নির্মাণ করা হয়েছিল তার বাবা-মার সমাধিসৌধ। কথিত আছে পরবর্তীতে এই স্থাপত্য রীতি মেনেই নাকি তাজমহলের স্থাপত্য নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

এই মুঘল সম্রাজ্ঞীর পিতৃদত্ত নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৫৭৭ সালের ৩১ মে। একজন বলিষ্ঠ, সম্মোহনী ও উচ্চশিক্ষিত নারী হওয়ায় তাকে ১৭০০ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী ভাবা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, মেহেরের বাবা ছিলেন গিয়াস বেগ। গিয়াস বেগ স্ত্রীকে নিয়ে তেহেরান থেকে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুস্তান আসছিলেন। তখন পথের মধ্যেই নির্জন মরুপ্রান্তে এক বাবলা গাছের তলায় জন্ম হয় মেহেরুন্নিসার। গল্প আছে যে এই সময় গিয়াস বেগ ও তার পত্নী এমন দুর্দশায় পড়েছিলেন যে মেয়েকে বাঁচানোর কোনো উপায় না পেয়ে পথের মাঝেই শিশু মেয়েকে শুইয়ে রেখে রওনা হন। আশা ছিল, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে পেয়ে আশ্রয় দেয় তবে শিশুটি প্রাণে বেঁচে যাবে। কিছুদূর যাওয়ার পরই শিশু কন্যার কান্না শুনে তারা আর থাকতে পারলেন না। ফিরে এসে মেয়েকে বুকে চেপে সহায়-সম্বলহীন গিয়াস বেগ এসে পৌঁছালেন লাহোরে। কাজ জুটিয়ে নেন মুঘল রাজদরবারে। পরবর্তীতে মেয়ে মেহেরের স্থান হলো হেরেমে।

নূরজাহানের প্রথম বিয়ে হয় এক মুঘল রাজকর্মচারী শের আফগান আলী কুলি খান ইসতাজলুর সঙ্গে। পরবর্তীতে এক লড়াইয়ে নিহত হন নূরজাহানের স্বামী।

বিধবা নূরজাহানকে পাঠানো হয় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের হেরেমে। সেখানে নূরজাহান অন্য মুঘল নারীদের আস্থা এবং বিশ্বাসের পাত্র হয়ে ওঠেন। ১৬১১ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরের বিশতম পত্নী। সবচেয়ে প্রিয়তম স্ত্রীতেও পরিণত হন নিজগুণে। সেই সময়ের মুঘল রাজ দরবারের রেকর্ডে খুব কম নারীর কথাই উল্লেখ আছে। তবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথায় ১৬১৪ সালের পর থেকে তার সঙ্গে নূরজাহানের বিশেষ সম্পর্কের উল্লেখ আছে অনেকবার। তিনি নূরজাহানের এক অনুরাগময় চিত্রই এঁকেছেন তাতে। নূরজাহান সেখানে বর্ণিত হয়েছেন একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী, চমৎকার সেবাদাত্রী, বিজ্ঞ পরামর্শদাতা, দক্ষ শিকারি, বিচক্ষণ কূটনীতিক এবং শিল্পবোদ্ধা হিসেবে। মুঘলদের পুরুষ শাসিত জগতে নূরজাহান ছিলেন এক অসাধারণ নারী। কোনো রাজকীয় পরিবার থেকে তিনি না আসলেও সম্রাটের হেরেমে তার উত্থান ঘটে এক দূরদর্শী রাজনীতিক হিসেবে। বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য আসলে তিনি ও সম্রাট জাহাঙ্গীর মিলে একসঙ্গেই শাসন করতেন।

 

নূর জাহানের প্রথম স্বামী অন্য কেউ

সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের অপার প্রেমেরে কাহিনি শুনে হয়তো যে কেউ ভাবতে পারেন এটি তাদের প্রথম বিয়ে। কিন্তু ঘটনা মোটেও তেমন নয়। নূরজাহান ছিলেন সম্রাটের বিশতম স্ত্রী অপরদিকে নূরজাহানের দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। ১৭ বছর বয়সে মেহেরুন্নিসার বিয়ে দেওয়া হয় মুঘল বাহিনীতে কর্মরত ইরানি সমরনায়েক শের আফগান আলী কুলি খান ইসতাজলুর সঙ্গে। এরপর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় সুদূর বর্ধমানে। জাহাঙ্গীর সম্রাট হওয়ার কিছুদিন পরে শের আফগানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ও বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়। জাহাঙ্গীর প্রচণ্ড চেষ্টা করেন শের আফগানকে মেরে ফেলার। কয়েকবার চেষ্টা করেও অবশ্য সফল হননি তিনি। শের আফগান ছিলেন ভীষণ শক্তিশালী ব্যক্তি। ফলে শের আফগানের কাছের মানুষদের সাহায্য নেন জাহাঙ্গীর। এভাবে সম্রাটের বাহিনীর হাতে নিহত হন শের আফগান। অনেকে বলে থাকেন, এককালের প্রণয়িনীকে পাওয়ার জন্যই শের আফগানকে হত্যা করেন জাহাঙ্গীর। ঐতিহাসিকগণের মতে এর কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

 

শেষ জীবনের করুণ পরিণতি

এত এত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নূরজাহানের জীবনের শেষ বছরগুলো ভালো যায়নি। ১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান তড়িঘড়ি করে জামাতা শাহরিয়ারকে সম্রাট ঘোষণা করতে চান। কিন্তু তার ভাই আসফ খান নিজ মেয়ে মমতাজের স্বামী খুররমকে সিংহাসনে বসাতে কৌশলে নূরজাহানকে কারাবন্দী করেন। খুররম এই সুযোগে নিজ ভাই শাহরিয়ারকে হত্যা করে ‘শাহজাহান’ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। অথচ সম্রাট বেঁচে থাকা আমলে নূরজাহানের বাবা ও ভাই অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তখন ঢাল হয়ে বাঁচিয়েছিলেন এই নূরজাহান। এমনকি তাদের পদোন্নতিতেও সাহায্য করেছিলেন তিনি। নিজের পরিবার পরিজনদের অনেককেই তিনি নিজ প্রভাব বলে প্রশাসন ও বিচার সম্বন্ধীয় উচ্চপদস্থ স্থানে উন্নীত করেন। জীবনের শেষ ১৮টি বছর নূরজাহানের বন্দীদশাতেই কাটে। এই পুরো সময় তিনি রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে, তার পিতার সমাধিতে দরগাহ   তৈরির তদারকি করে ও কাব্যচর্চা করে দিনাতিপাত করেন। ১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর লাহোরের শাহদারা বাগে নূরজাহানকে সমাধিস্থ করা হয়।

 

সে এক অপার প্রেম

নূরজাহান ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রণয়ঘটিত নানা কাহিনি ছড়িয়ে আছে উপমহাদেশ জুড়ে। জানা যায়, তরুণী নূরজাহান বা মেহেরুন্নিসাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম বা জাহাঙ্গীর। কিন্তু একজন রাজকর্মচারীর মেয়ে হওয়ায় সম্রাট আকবর এ সম্পর্ক মেনে নেননি। তিনি তড়িঘড়ি করে অপর এক সেনাকর্মীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেন সুদূর বর্ধমানে। ১৬০৭ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর নূরজাহান ও তার মেয়ে লাডলি বেগমকে আগ্রায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে মুঘল হেরেমের কর্ত্রী সম্রাট জাহাঙ্গীরের সৎ মা এবং সম্রাট আকবরের প্রধান স্ত্রী রুকাইয়া বেগমের সেবায় তিনি নিয়োজিত হন। মরহুম স্বামীর জীবদ্দশায় তৈরি রাজনৈতিক শত্রুদের থেকে নিরাপত্তার জন্য নূরজাহান নিজেই মুঘল দরবারের আশ্রয় প্রয়োজন মনে করেছিলেন। তার স্বামী রাজদ্রোহী হওয়া সত্ত্বেও তিনি এবং তার কন্যা মুঘল দরবারে যথেষ্ট সম্মানজনক অবস্থান লাভ করেন। এদিকে নূরজাহানের প্রতি জাহাঙ্গীরের আকর্ষণ যে অনেক আগে থেকেই ছিল, যা তখনো যায়নি। জাহাঙ্গীরের রাজত্বের ছয় বছর চলছে। ১৬১১ সালের ২১ মে সন্ধ্যায় শাহী মহলের মীনা বাজারে বর্ষবরণের উৎসব নওরোজ দেখতে বের হন সম্রাট। এখানেই এক পোশাকের দোকানে দেখে এত বছর পরেও  মেহেরুন্নিসাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হয়নি তার। তৎক্ষণাৎ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন জাহাঙ্গীর। সেই মাসেরই ২৫ তারিখে, আরবি ১২ রবিউল আউয়াল ১০২০ হিজরি তারিখে মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করে মহলে নিয়ে আসেন জাহাঙ্গীর। নতুন স্ত্রীর রূপে মুগ্ধ হয়েই হয়তো তার নাম দেন ‘নূর মহল’ (মহলের আলো)। বিয়ের পাঁচ বছর পর, ১৬১৬ সালে এই নাম পরিবর্তন করে সম্রাট স্ত্রীর নাম দেন ‘নূর জাহান’ (জগতের আলো)। শুধু একটি মহলই নয়, মেহেরুন্নিসার কীর্তি ও মহিমা মহল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যে। তাই ‘নূর মহল’ নামটিতে তাকে সীমাবদ্ধ করা যায়নি।

 

রাজার সঙ্গে পালন করতেন রাজ্যভার

সম্ভবত নূরজাহানই একমাত্র নারী যিনি মুঘল শাসনে নিজের প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। মার্জিত, শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী ও কর্তৃত্বপরায়ণ এই সম্রাজ্ঞী ছিলেন নিগূঢ় রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অধিকারী। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল নূরজাহানের। তিনি জানতেন কী করে কাজ আদায় করতে হয়। দৃঢ় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে রূপের উৎকর্ষতাও তুখোড় কূটনৈতিক বিচক্ষণতা নূরজাহানকে এক স্মরণীয় নামে পরিণত করেছে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে জাহাঙ্গীর ছিলেন এক মদমত্ত সম্রাট, যার সাম্রাজ্য পরিচালনায় কোনো মনোযোগ ছিল না। তাছাড়া রূপবতী স্ত্রী নূরজাহানকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আর সে কারণেই নাকি তিনি এর ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন স্ত্রীর হাতে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। কার্যত নূরজাহান এবং জাহাঙ্গীর ছিলেন পরস্পরের পরিপূরক। স্ত্রী যে সাম্রাজ্য শাসনে স্বামীর পাশে আসন নিয়েছিলেন, সেটি নিয়ে জাহাঙ্গীরের কোনো অস্বস্তি ছিল না। বিয়ের পরপরই নূরজাহান প্রথম রাজকীয় ফরমান জারি করেছিলেন। আর সেটি ছিল এক রাজকর্মচারীর জমির অধিকার রক্ষার। সেখানে তিনি স্বাক্ষর করেন নূরজাহান পাদশাহ বেগম নামে, যার অর্থ নূরজাহান সম্রাজ্ঞী। তিনি যে সার্বভৌম এবং তার ক্ষমতা যে বাড়ছে, এটি ছিল তারই ইঙ্গিত। ১৬১৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তার নাম লেখা স্বর্ণ এবং রৌপ্য মুদ্রা দেখে সেসময়ের মুঘল রাজদরবারের লেখক, বিদেশি কূটনীতিক, বণিক এবং পর্যটকরা উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে মুঘল সাম্রাজ্য পরিচালনায় তার একটা বিরাট প্রভাব আছে।

 

 

 

প্রভাব খাটাতেন সর্বস্তরে

স্বামী সম্রাট জাহাঙ্গীরের মদ্য ও আফিমের প্রতি তীব্র আসক্তি থাকায় নূরজাহান সিংহাসনের পেছনের মূল শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন। তিনি শুধু ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারিণীই ছিলেন না সেই সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতি, দাতব্য কাজ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও লৌহমানবীর মতো ক্ষমতা পালনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের খালা ছিলেন। এ ছাড়াও নূরজাহানই একমাত্র মুঘল সম্রাজ্ঞী যিনি নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। তখনকার মুদ্রায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামের পাশে নূরজাহানের নাম স্থান পেত। নূরজাহানের কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা কত গভীর ছিল এ থেকে অনুধাবনযোগ্য। নূরজাহান তার প্রভাব খাটিয়ে সম্রাটকে প্ররোচিত করে নিজের বাবাকে দরবারে প্রধান দিউয়ানের পদে উন্নীত করেন। নিজের পরিবার পরিজনদের অনেককেই তিনি নিজ প্রভাব বলে প্রশাসন ও বিচার সম্বন্ধীয় উচ্চপদস্থ স্থান দান করেন। খান-ই-সামানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয় তার ভাই আসফ খানকে।

 

 

সাহসী নূরজাহান

নুরজাহান সম্পর্কে শোনা যাবে অনেক কিংবদন্তি। শারীরিকভাবে নূরজাহান শক্তিশালী ছিলেন। তিনি প্রায়ই সম্রাটের সঙ্গে বাঘ শিকারে  যেতেন। কথিত আছে তিনি ৬টি গুলি দিয়ে ৪টি বাঘ শিকার করেছিলেন। নূরজাহান একটি মানুষ খেকো বাঘকে মেরে রক্ষা করেছিলেন একটি গ্রামের মানুষকে। তার বীরত্বের কবিতাও লিখেছেন অনেক কবি। শিকারে বের হওয়া থেকে শুরু করে নিজের নামে রাজকীয় মুদ্রা এবং রাজকীয় ফরমান জারি, বড় বড় রাজকীয় ভবনের নকশা তৈরি, দরিদ্র নারীদের কল্যাণে ব্যবস্থা গ্রহণসহ নানা কাজে সেকালের নারীদের মধ্যে নূরজাহান ব্যতিক্রমী স্বাক্ষর রেখেছেন। নূরজাহানকে একদিন রাজপ্রাসাদের বারান্দায় দেখা গিয়েছিল। এর আগে পর্যন্ত কেবল পুরুষদের জন্যই সেটি সংরক্ষিত ছিল। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এটি নূরজাহানের বিদ্রোহ ছিল। স্বামীকে জিম্মি করা হলে নূরজাহান স্বামী রক্ষায় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। এই ঘটনা তাকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।


আপনার মন্তব্য