মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। দেশেও চাহিদামতো মিলছে না জ্বালানি তেল। যার প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে ডিজেল নির্ভর কৃষকের উদ্বেগ বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় রংপুর অঞ্চলে আশার আলো হয়ে উঠেছে সৌর বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থা। সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে এ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে এক সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কৃষক বলছেন, ডিজেল সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি ছাড়াই তারা জমিতে সেচ দিতে পারছেন। উৎপাদন খরচ কমছে, বাড়ছে আবাদ। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত একটি ডাগওয়েলের দায়িত্বে আছেন আতিয়ার রহমান। তিনি জানান, এলাকায় ব্যাপকভাবে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। এই সৌরচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে নিয়মিত পানি দেওয়া যাচ্ছে। ডিজেল নিয়ে কৃষকের এখন আর চিন্তা করতে হয় না। এ সেচযন্ত্র চলে সৌরবিদ্যুতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে পাম্প চালিয়ে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও ডিজেলের ধোঁয়া নেই, নেই জ্বালানি সংগ্রহের দৌড়ঝাঁপ।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার কৃষক সুধান চন্দ্র সেন বলেন, ‘আগে বিদ্যুৎ থাকতো আবার থাকতো না। অনেক সময় জমিতে পানি দিতে দেরি হতো। এখন সোলারে সব সময় পানি পাওয়া যায়।’ নদী বাঁচাও তিস্তা বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের লালমনিরহাট জেলা ইউনিট সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সৌরচালিত সেচ প্রকল্প আরও বাড়ানো দরকার।
বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ জানান, ২০২২ সালের পর নতুন কোনো সৌর সেচ প্রকল্প চালু হয়নি। আগের স্থাপনাগুলো এখনো সচল রয়েছে।
তিনি বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫৯৬টি সৌরচালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। প্রতিটি যন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরলে মোট দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট। এ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিদিন ৮০-৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একই সঙ্গে চার মাসের সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, তাদের আওতায় নতুন প্রকল্প না এলেও পুরোনো প্রকল্প চালু আছে। মাঠপর্যায়ে দুটি নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ছাড়া অফিস ভবনের সৌর বিদ্যুৎও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মিজানুর রহমান বলেন, ‘ডিজেলনির্ভরতা থেকে সৌরচালিত সেচে রূপান্তর ঘটাতে পারলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে এটি হতে পারে টেকসই কৃষির কার্যকর পথ।