চৈত্রের শেষ সন্ধ্যার ঘণ্টা দেড়েক পর তাঁরা তিনজন এলেন। তিনজনই বয়সে আমার কনিষ্ঠ, মন-মননে ঘনিষ্ঠ। বহুদিন পর মুখোমুখি হলাম হাবিবউল্লাহ বাহার, কামরুল ইসলাম আর মহিউদ্দিন ফারুকের। সুবাতাসে ভরে গেল বুক। অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো। চা-বিস্কুট খেতে খেতে আমরা অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ চর্চায় মেতে থাকি। সময় ভাবনার মধ্যে আনন্দবেদনা ছায়াপাত ঘটায়। কালস্রোত যে আমাদের চারজনকে ক্রমশ অসীমের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছে, এই বোধ আমায় বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল। একদার স্মার্ট প্লাস ক্লিন-শেভড কামরুল, ফারুক আর বাহারের মুখে এখন সম্ভ্রান্ত ঘারানার দাড়ি। ভাবছিলাম, মাথায় পাগড়ি, পরনে জোব্বা, হাত জামরং লাঠি হাতে তাঁরা পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন মহল্লার রাস্তায়, ‘হক মওলা’ বলে যদি হাঁক দেন, দৃশ্যটা তখন কেমন দাঁড়াবে?
নতুন বছরের (১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) সূর্যোদয়ের আগের প্রহরগুলোয় প্রিয়জন সম্মিলন নাকি মঙ্গলময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী। পয়লা বৈশাখ বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরবার সময় বাসের ভিতর চোখ বুজে বসে থাকি আর নানিজানের বাণী স্মরণ করি-‘বন্ধুসনে হইছে যখন গলাগলি/বছরটা মোর যাইবে হাসিখেলি।’ কুমিল্লাগামী হাইওয়ের হোটেলে ২০ মিনিটের যাত্রাবিরতির জন্য বাসটি বাঁয়ে মোড় নিতে নিতে থেমে যায়। চা খাওয়ার টেবিলে আমার বিপরীতে বসা দুই যাত্রী দার্শনিক বাক্যবিনিময় করছেন। সাদার ওপরে নীলডোরা জামা পরা বলেন, ‘দুনিয়ায় সবচেয়ে ভয়ংকর বাংলা কথা হচ্ছে, আমার ইচ্ছেমতো ওটা না ঘটলে নিজের জীবন নিজে শেষ করে দেব।’ জলপাই রং বাহারি পাঞ্জাবি পরা বলেন, ‘তাইলে ইংরেজিতে ভয়াবহ কথা কোন্টা?’ নীলডোরা বলে, ‘এক রাতেই নিশ্চিহ্ন করে দেব গোটা সভ্যতা। বিনাশটা করা হবে এমনভাবে যে ওটা আর আগের অবস্থায় কখনোই ফিরে আসতে পারবে না।’
মাত্র সাত দিন আগে, ৭ এপ্রিল ইরানকে এই হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (আ হোল সিভিলাইজেশন উইল ডাই টুনাইট, নেভার টু বি ব্রট ব্যাক অ্যাগেইন)। জলপাই রং বলেন, তুমি কি জানো, সুন্দরের যেমন ধারা নিজেকে নিজে অতিক্রম করা, ভয়ংকরের প্রকরণও তেমনই। এক ভয়ংকর আরেক ভয়ংকরকে ছাপিয়ে চলতে থাকে। আশাজাগানিয়া কর্ম বিরল, ভয় জাগানোর তপস্যা অনর্গল।... হোটেলের মাইকে আমাদের বাসের নম্বর উল্লেখপূর্বক ঘোষণা : এখনই ছেড়ে যাবে... শিগগির আরোহণ করুন।
সাদার ওপর নীল ডোরা আর জলপাই রংকে জ্ঞানদান করতে আগ্রহী হয়ে উঠছিলাম। বলতে চেয়েছি, ‘ইংরেজিতে সবচেয়ে ভয়াবহ কথা আরও আছে।’ বলতে পারিনি বাসে দ্রুত ওঠার তাড়নায়। বলতে না পারার আফসোস লিখে ফেলার মাধ্যমে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এই রচনার একেবারে শেষ দিকে ওই ভয়ংকরকে উপস্থাপন করা হবে। তার আগে নিবেদন করছি আবদুল্লাহ মশি নামক যুবকের ভয়ংকর সংকল্প ঘোষণার বিষয়।
দুই.
ভয়ংকর সংকল্পের (আত্মহত্যা করবই) সুবিধাজনক দিকও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকল্প কার্যকর করা হয় না। মশি-ও করেনি। ১৯৭৪ সালে রাজধানীর মালিবাগ এলাকার যে বাড়িতে বাস করেছি, তার পাশের বাড়ির মানে মামারবাড়ির বাসিন্দা ভার্সিটির ছাত্র আবদুল্লাহ মশি। চমৎকার তার গানের গলা। বস্তুত ওর সংগীতশক্তিই আমাকে ওর দিকে টেনেছে। যেমন টেনেছিল ওর বন্ধুদের।
‘ওস্তাদের কাছে তালিম নিলে তুমি মাহমুদুন্নবী কি আবদুল জব্বার লেভেলের ইয়ে হয়ে যেতে পারবে। তোমার ভিতর ওরকম সিঙ্গার হওয়ার মতো জিনিস আছে।’ বন্ধুদের মন্তব্য শুনে মশি গেয়ে ওঠে-আপ কি নজরোঁ নে সমজা/ পেয়ার কি কাবিল মুঝে/ দিল কি এ ধড়কন...।
গানের বাণীর ন্যূনতম অর্থও ছিল অজানা। তবু মোহন সুরের আবেশে বুঁদ হয়ে গেছি। অনেক পরে তথ্যপুষ্ট হয়ে জানতে পেলাম-আপ কি নজরোঁ নে সমজা পেয়ার কি কাবিল মুঝে মানে-‘তোমার দৃষ্টি বলে দিচ্ছে আমি তোমার প্রেমের যোগ্য হয়ে উঠেছি।’ পরের পঙ্ক্তি ‘দিল কি এ ধড়কন ঠেহ্র যা/ মিল গেয়ি মনজিল মুঝে...।’ মানে ‘আমি যে তোমার প্রেমের যোগ্য, এটা টের পাওয়ায় আমার হৃদস্পন্দন থমকে পড়ছে/ কেন না আমি যা চেয়েছিলাম তা পেয়ে গেছি।’
১৯৬২ সালে নির্মিত মোহন কুমার পরিচালিত ‘আনপড়’ (নিরক্ষর) ছবির এই গান লিখেছেন রাজা মেহেদী আলী খান, সুর দিয়েছেন মনমোহন। পর্দায় গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়েছেন নায়িকা মালা সিনহা। এখনো ফুরসত পেলে ইউটিউবে গানটি আমি শুনি।
গানটির অনুরাগী আবদুল্লাহ মশি ঘটনাক্রমে নিজ হাতে তার ‘দিল কি ধড়কন’ বন্ধ করে দেওয়ার সংকল্প ঘোষণা করে বসলে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন হই। কেন সে অমন ভয়াবহ কথা বলেছে? কারণ কী? মশির বন্ধুরা তদন্তে নামে এবং জানতে পায়, কারণ রুখসানার বিয়ে। কৌতূহলীরা বলে, আরে বাবা, হু ইজ রুখসানা?
রুখসানা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সম্পর্কে মশির মামাতো বোন এবং আসছে অগ্রাণে ওর বিয়ে হবে ব্যাংকের নবীন এক অফিসারের সঙ্গে। ফুফাতো ভাই-মামাতো বোন গভীর গোপন নিঃশব্দ প্রণয়ের বিষয়টি গুরুতর আকার নেয় রুখসানার দৃঢ় সংকল্পতায়। মশির বন্ধুদের রুখসানা জানায়; মশিভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হতেই হবে। নইলে আমি সুইসাইড করব।
কনের গায়েহলুদের দিন সকালে মশি ঘরের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করে। তার মামা জিকরুল হক বলে, জান দিবি! দে। যা বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল থেকে রেললাইনে জাম্প করে শুয়ে থাক। সোয়া ৯টায় ময়মনসিংহ লোকালের নিচে কল্লা দিয়ে ফেমাস হয়ে যা।
মামার ওপর রাগ করে মশি বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে রেললাইনে পৌঁছলেও শুয়ে পড়েনি। একটু পূর্ব দিকে গিয়ে রিকশায় চেপে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। রুখসানার বিয়ে ব্যাংক অফিসারের সঙ্গেই হয়। ১৯৯৩ সালে মশির সঙ্গে চট্টগ্রামে দেখা। সঙ্গে ওর স্ত্রী। আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে আমাকে টেনেটুনে একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়। ফিসফিস করে বলে, আমি যে কাওয়ার্ড, ঘোষণা দিয়েও সুইসাইড করিনি সেটা ওয়াইফের কাছে ফাঁস করে দেবেন না। প্লিজ!
৩.
টানা দশ বছর রোগে ভুগতে ভুগতে যায় যায় অবস্থা হয়েছে অনুরাধা দেবীর। কে এই অনুরাধা? মহিলার দেখা পেয়েছিলাম শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা এক গল্পে। অনুরাধাকে উচ্চমাত্রার ভাগ্যবতী বলা যায়। কারণ তাঁর স্বামী বিভাস চ্যাটার্জি তাঁদের সংসারযাত্রার প্রথম রাতেই বলেছেন, অনু, তুমি শুধু আমার বউ না। তুমি আমার পৃথিবী। তুমি আমার প্রাণের প্রাণ। মানের মান। নয়নের তারা। তুমি বিনা আমি হয়ে যাব দিশাহারা।
পাড়ার অধিবাসীরা প্রবল পত্নীনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে বিভাসকে সম্মান করে। ভোর থেকে সকাল দশটা, দশটায় অফিস গমন এবং পাঁচটা থেকে সারা রাত স্ত্রীর সেবা করেন সবার শ্রদ্ধেয় তিনি। ব্যতিক্রম শুধু বিভাসের বড় দুই ভাই-প্রভাষ ও বিকাশ। এজন্য তাঁরা বলেন, এটা কোনো স্ত্রীভক্তি নয়। বিভাস যা করে তা কেবল স্ত্রৈণ ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব। কুলাঙ্গাররাই এরকম আমার বউ/আমার বউ করে।
অনুরাধার শরীর দিনদিন খারাপ হতে থাকে। তখন তাঁকে নেওয়া হয় শহরের সবচেয়ে দামি ও অভিজাত হসপিটাল গ্রিন ভিলে। সাত দিন ধরে অনু এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একটুও সুফল মিলছে না। অষ্টম দিনে অফিস থেকে বাড়ি এসে বিভাস এ কামরা সে কামরায় ছোটাছুটি করেন। তাঁর বড় ভাইয়ের ফাজিল ছেলে অটল বলে, কী হলো? কামরায় ছোটাছুটি করে কী খুঁজছো কাকু? বিভাস বলেন, দড়ি। খবর পেলাম, তোর কাকির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আজ রাতে ও যদি মারা যায় আমি গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করব।
সে তো ভালো কথা। বলে অটল, সেজন্য দড়ি ইউজ করবে? আরে এটা তো অবসেলেট মেথড। মডার্ন মেথড ফলো কর। বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে সামনের রাস্তায় পড়। এতে দড়ি কেনার টাকা বাঁচবে। পাবলিসিটি পাবে দারুণ। মাথা থেঁতলে রক্ত ঝরবে। রক্তে ভেজা কংক্রিটের রাস্তায় তোমার ডেডবডিটা দেখতে হবে পাষাণের বুকে ফোটা মনোহর এক এক রক্তগোলাপ। সংবাদপত্র লিখবে : স্ত্রী বিয়োগে স্বেচ্ছায় ঝরে পড়ল মহান পুষ্প।
ভাইপোর ভাষণ শুনছিলেন বিভাস। এমন সময় তাঁর বন্ধু মাখনলাল এলেন। সব শুনে তিনি বলেন, ধর দৈবক্রমে বৌদি সুস্থ হয়ে গেলেন আর এদিকে তুই গেলি মরে, তখন? তখন তো মহিলাকে বিধবা হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। বিভাস বলেন, সুইসাইড প্রোগ্রাম ক্যানসিলড।
৪.
যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান (জন্ম : ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯১১ মৃত্যু : ৫ জুন ২০০৪) ক্ষমতাশীল হওয়ার আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানাদি চালানোর তীব্র সমালোচক ছিলেন, তাঁর মতে, ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান চলে খরগোশ গতিতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গতি কচ্ছপের। এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বললেন, ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে ভয়ানক কথা হচ্ছে-আমি সরকার থেকে এসেছি এবং এসেছি সাহায্য করতে। (দ্য মোস্ট টেরিফায়িং ওয়ার্ডস ইন ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ আর আই অ্যাম ফ্রম দ্য গভর্নমেন্ট অ্যান্ড আই অ্যাম হিয়ার টু হেলপ)।
♦ লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন