প্রয়াত প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি আমার ‘‘দেবদাস’’ ছবিতে পার্বতী চরিত্রে পূর্ণিমাকে নেওয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম। কারণ সে এর আগে আমার দুটি সাহিত্যভিত্তিক ছবি ‘‘শাস্তি’’ ও ‘‘সুভা’’য় ভালো অভিনয় করেছিল। তাই আমি জানতাম পূর্ণিমাই পার্বতী চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবে। কিন্তু বাদ সাধল ছবির দেবদাস চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ নায়ক শাকিব খান। আমাকে জানিয়ে দিল পার্বতী চরিত্রে অপু বিশ্বাসকে নেওয়া না হলে সে অভিনয় করবে না। তখন দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করার মতো উপযুক্ত নায়ক না থাকায় বাধ্য হয়ে শাকিবের আবদারই মেনে নিতে হলো। আমার বিশ্বাস পূর্ণিমা যদি পার্বতী চরিত্রে অভিনয় করত তাহলে সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তার ভাগ্যেই জুটত।’ শাকিবের এমন আবদারের কথা অনেক নির্মাতার মুখেই শোনা গেছে। যেমন- প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু ২০১০ সালে নির্মাণ করেন ত্রিভুজ প্রেমের ছবি ‘‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’’। এ ছবিতে শাকিবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন দুই নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম ও রোমানা। তাদের সাইনিং মানিও দেওয়া হয়। কিন্তু শাকিবের আবদারের কারণে শেষ পর্যন্ত মিমকে বাদ দিয়ে অপু বিশ্বাসকে নিতে বাধ্য হন নির্মাতা। একটা সময় শাকিবের ছবিতে তার বিপরীতে অপুকে নেওয়ার জন্য এই নায়কের আবদার নাকি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এতে পছন্দের নায়িকাকে কাস্ট করতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ন হতেন নির্মাতারা। ‘‘শাকিব ছাড়া আর কোনো নায়কের ছবি সিনেমা হল মালিকরা নিতে চান না’’ এই অবস্থার সুযোগ নিতেন নাকি শাকিব, এমন অভিযোগ নির্মাতাদের। এ ছাড়া নির্মাতা দেবাশীষ বিশ্বাস জানিয়েছেন, তিনি তাঁর পিতা প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার প্রয়াত দিলীপ বিশ্বাস নির্মিত সত্তরের দশকের সুপারডুপার হিট ছবি ‘জিঞ্জির’-এর রিমেক করতে চেয়েছিলেন। এই ছবিতে তখন অভিনয় করেছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক, ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা ও আলমগীর। তাই দেবাশীষ বিশ্বাস রিমেক ছবিটিতে শাকিব খান, আরিফিন শুভ ও বাপ্পীকে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আবদার ছিল তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করতে পারবেন না। কারণ এতে একজনের কারণে অন্যজনের চরিত্রের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। এই অযৌক্তিক আবদারের কারণে শেষ পর্যন্ত দেবাশীষ বিশ্বাস ‘জিঞ্জির’ ছবিটি আর রিমেক করতে পারলেন না। দেবাশীষ বিশ্বাসের কথায় রাজ্জাক, সোহেল রানা, আলমগীর আংকেলরা তখন টপ হিরো ছিলেন, তারপরও তাঁরা তো একে অন্যের সঙ্গে অভিনয় করতে অপরাগতা প্রকাশ করেননি। এমন আরেকটি অভিযোগ ছিল প্রয়াত নায়ক মান্নার বিরুদ্ধেও। তিনি নাকি প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা মিজানুর রহমান খান দীপু নির্মিত ‘মোগলে আজম’ ছবিটির জন্য সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক নেওয়ার পরও শিডিউল ফাঁসানোর কারণে ছবিটি সময়মতো শেষ করতে পারেননি নির্মাতা। যখন শেষ লটের শুটিং করতে এফডিসিতে সেট নির্মাণ করে মান্নাকে কাজ শেষ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান তখন মান্না অতিরিক্ত অর্থের দাবি করে বসেন। উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত মান্নার অযৌক্তিক আবদার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন নির্মাতা। পুরো পারিশ্রমিক নেওয়ার পরও শিডিউল ফাঁসিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নব্বই দশকের অনেক প্রথম সারির নায়ক-নায়িকার বিরুদ্ধে রয়েছে। এ ছাড়া পারিশ্রমিকের বাইরে অতিরিক্ত কনভেন্স, বিশেষ খাবার, নিজের বিশেষ লোকজনের থাকাখাওয়াসহ নানা ক্ষেত্রে নায়ক-নায়িকাদের অযৌক্তিক আবদারের কথা চলচ্চিত্র পাড়ায় নব্বই দশক থেকে নাকি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে তাঁদের কাছে নির্মাতাদের রীতিমতো নাকাল হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন নির্মাতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নায়ক-নায়িকাদের অযোক্তিক আবদারে বরাবরই বিরক্ত হতেন তাঁরা। একটি ছবিকে নষ্ট করে দেয় এমন অন্যায় আবদার করা নায়ক-নায়িকারা। এমনও অভিযোগ নির্মাতাদের মুখে বহুবার শোনা গেছে, একজন পরিচিত চেহারার নায়িকাকে কাস্ট করা হলে অপরজন বেঁকে বসেন, শর্তজুড়ে দেন, চারটা গানের দুটিতে অবশ্যই তাঁকে রাখতে হবে, কয়টা দৃশ্যে থাকতে হবে সেসব খুঁটিনাটি জেনে নেন। তবে একজন নির্মাতা বলেছেন, উঠতিদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়, কতিপয় ‘নামের নায়িকাদের কারণে বাকিদেরও বদনাম হয়। কয়েক বছর আগে এক নির্মাতা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, পরের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শর্তে জনৈক নায়িকা একটি আইটেম গানে অংশ নিয়েছেন। এমনও শোনা গেছে, একটি ছবিতে একজন নায়িকাকে চুক্তি করা হয়েছে। আরেক নায়িকাকে যখন চুক্তি করা হলো তখন পূর্বের চুক্তি হওয়া নায়িকা আর ওই সিনেমায় অভিনয় করবেন না। কেন? নতুন চুক্তিবদ্ধ নায়িকার জন্য তিনি প্রচ্ছন্ন হয়ে যাবেন, অথচ স্ক্রিপ্ট পড়েই এই সিনেমায় চুক্তি করেছিলেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলেও অনেক নির্মাতার অভিযোগ, নায়ক-নায়িকা শুটিংয়ের আগের দিন নানা টালবাহানা শুরু করেন, এমনকি শিডিউলও ফাঁসিয়ে দেন। এসব বিষয়ে নির্মাতারা বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। এমনকি শুটিং সেটের মেকআপ রুমেও নির্মাতারা বিরক্ত হন, তা ছাড়া ‘শুটিংয়ের আগের দিন এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে’ নায়ক-নায়িকাদের এমন অন্যায় আবদার প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কতিপয় প্রযোজককে দিয়ে পরিচালকের কাছে আবদার করার প্রবণতাও রয়েছে বলে জানান নির্মাতা। যেমন- দৃশ্য বাড়িয়ে দিতে হবে, এন্ট্রি টাইম এই সময় না, ওই সময়, কিংবা শুরুতেই দিতে হবে। নায়িকার আবদার-নায়কের দৃশ্য এত বেশি রাখা যাবে না। কতিপয় প্রযোজক আবার নায়ক-নায়িকার সেসব আবদার নিয়ে যান নির্মাতাদের কাছে। বেশ ক বছর আগে নির্মাতা সৈকত নাসির নায়িকাদের এমন আবদার নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন সোশ্যাল হ্যান্ডেলে। সৈকত নাসির লিখেছিলেন, ‘সম্প্রতি একটি সিনেমার জন্য দেশের নামিদামি কিছু হিরোইনের সঙ্গে মিটিং করেছিলাম, অবাক হয়ে দেখলাম, তাঁদের প্রথম প্রশ্ন- সিনেমায় হিরোইন কয়জন? আমার কয়টা গান? আমার এন্ট্রি কত নম্বর সিনে? এসবের কোনো উত্তর দিতে আমি কখনোই প্রস্তুত থাকি না। মনে প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীর সিনেমার মাপকাঠিতে আমাদের সিনেমা আসলে কোথায় আছে? এদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে, ‘কারণ কয়েক দিন পর এই এলিয়েনগুলারে আমরা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে চিড়িয়াখানা অথবা মিউজিয়ামে দেখব।’ তিনি বলেন, ‘দর্শক দেখতে চায় নতুন কিছু, গল্পের সিনেমা, ওখানে একটা চরিত্রের এন্ট্রি বা প্রেজেন্টেশন গল্পের মাপকাঠিতে হয়। একটা চরিত্র একজন শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে হাজার বছর।’ একজন নামি নির্মাতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, শাবানা-ববিতাদের আমলে এসব ছিল না। তাঁরা গল্পে ঢুকে যেতেন। এ ছাড়া অন্য নায়িকার সঙ্গে প্যারালাল কাজ করতেও তাঁদের কোনো অনীহা ছিল না। এসব বিশেষ করে নব্বই দশক থেকে শুরু হয়েছে। এমন অনেক নায়িকা রয়েছে, যারা পুরো সিনেমার শুটিং করে ফেলেছে, অথচ জিজ্ঞেস করলে গল্প বলতে পারবে না। তারা ব্যস্ত শুটিং স্পট থেকে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করতে। কিছু নায়ক-নায়িকার এমন অপেশাদারি আচরণ ও অযৌক্তিক আবদারের কারণে বরাবরই নাকাল হতে হচ্ছে নির্মাতাকে। ফলশ্রুতিতে একটি মানসম্মত ছবি নির্মাণ আর সম্ভব হয় না। বলা যায়, এসব নায়ক-নায়িকার অযৌক্তিক আবদারে আঁতুড়ঘরেই মৃত্যু হয় একটি সম্ভাবনাময় নির্মাতার স্বপ্নের ছবির।
শিরোনাম
- রাজধানীর সায়েদাবাদ ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতার ৬
- যাত্রাবাড়ীতে প্রতারণা করে রিকশাচালকদের কাছে টাকা আদায়, যুবক আটক
- রাজধানীতে ট্রাফিক তল্লাশিতে চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার, একজন আটক
- চুক্তি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করবে আইএইএ: গ্রসি
- তারেক রহমানের সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ
- ‘হতে পারে আমি ভুক্তভোগীদের পাশেই ছিলাম’, এপস্টাইন ইস্যুতে বিল গেটসের স্বীকারোক্তি
- মসজিদের ভেতরে ইমামের ঝুলন্ত লাশ, পাশে পাওয়া গেছে চিরকুট
- জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সংস্কার আনা হবে : প্রতিমন্ত্রী
- রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৬ নেতাকর্মী গ্রেফতার
- বাংলা কিউআর : আর্থিক লেনদেনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
- ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করতে সিনেটে প্রথম প্রস্তাব পাস
- রামিসার মায়ের চিকিৎসায় বিএনপির উদ্যোগ, বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত
- জার্মানিতে চুরির রেকর্ড, ক্ষতি ছাড়াল ৪.৩৩ বিলিয়ন ইউরো
- দেশের রপ্তানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব : বাণিজ্যমন্ত্রী
- বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মুখোমুখি পানামা ও ক্রোয়েশিয়া, হারলেই বিদায় নিশ্চিত
- বিশ্বকাপের মাঝেই শোক, ফ্রান্স কোচ দেশম ফিরছেন দেশে
- ফিফাকে ‘চোর’ বলে বিশ্বকাপ থেকে ‘বহিষ্কার’ ধারাভাষ্যকার
- হঠাৎ ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুকে বিভ্রাট! পরে স্বাভাবিক
- সমালোচনার জবাব মাঠে, ম্যাচের পর যা বললেন রোনালদো
- ফিফা প্রটোকল ভেঙে চ্যাম্পিয়নদের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেবেন ট্রাম্প
আঁতুড়ঘরে মৃত্যু ঘটে স্বপ্নের ছবির
নায়ক-নায়িকার আবদারে নাকাল নির্মাতা
কিছু নায়ক নায়িকার এমন অপেশাদারি আচরণ ও অযৌক্তিক আবদারের কারণে বরাবরই নাকাল হতে হচ্ছে নির্মাতাকে। ফলশ্রুতিতে একটি মানসম্মত ছবি নির্মাণ আর সম্ভব হয় না। বলা যায়, এসব নায়ক-নায়িকার অযৌক্তিক আবদারে আঁতুড়ঘরেই মৃত্যু হয় একটি সম্ভাবনাময় নির্মাতার স্বপ্নের ছবির...
আলাউদ্দীন মাজিদ
প্রিন্ট ভার্সন
টপিক
সর্বশেষ খবর