ছোটবেলায় নাচের সঙ্গে ছিল সখ্য। স্কুলের অনুষ্ঠানে এবং মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করে দর্শক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অনেকে আবার নৃত্যশিল্পী হিসেবে জাতীয়সহ নানা পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। তবে নানা কারণে একসময় চলে আসেন চলচ্চিত্রের অভিনয়ে। এ ক্ষেত্রেও মুন্শিয়ানা দেখিয়েছেন। এমন কয়েকজন নৃত্যশিল্পী থেকে নায়িকার কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
আনোয়ারা
ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে আনোয়ারার আগমন ঘটে। তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে। ১৯৬১ সালে ১৪-১৫ বছর বয়সে অভিনেতা আজিমের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন। এ সময় তিনি পরিচালক ফজলুল হকের ‘আজান’ চলচ্চিত্রে প্রথম নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। নাচ শিখেছেন ওস্তাদ দেব কুমারের কাছে। চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়ার সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘উত্তরণ’ রাখা হয়। তবে ‘উত্তরণ’ চলচ্চিত্রটি পরে মুক্তি পায়নি। তার অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘নাচঘর’। এই চলচ্চিত্রেও তিনি নৃত্যশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আবদুল জব্বার খান ছিলেন এই চলচ্চিত্রের পরিচালক। উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রটি ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায়। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রীত না জানে রীত’ চলচ্চিত্রেও নৃত্যশিল্পী হিসেবে ছিলেন। এরপর তিনি বেশ কিছু উর্দু ও বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি জহির রায়হানের সংগম চলচ্চিত্রে প্রথম সহঅভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেন। ১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জানাজানি’ চলচ্চিত্রটি তাঁর জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বালা’ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা চলচ্চিত্রটি ছিল আনোয়ারার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এ চলচ্চিত্রে তিনি আলেয়া চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর থেকে অভিনেত্রী হিসেবে প্রায় ৩০০ ছবিতে অভিনয় করেছেন আনোয়ারা।
কবরী
চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী মীনা পাল ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে কাজ শুরু করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তিনি জরিনা চরিত্রে অভিনয় করেন। সুরকার সত্য সাহা সুভাষ দত্তকে তাঁর খোঁজ দেন। কবরীর ছবি দেখে দত্ত তাঁকে পছন্দ করেন এবং তাঁকে অডিশনের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডেকে পাঠান। কণ্ঠ ও সংলাপ পরীক্ষার পর দত্ত তাঁকে জরিনা চরিত্রের জন্য নির্বাচন করেন। এরপর দত্তের পরামর্শে চলচ্চিত্রটির লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর নাম পরিবর্তন করে ‘কবরী’ রাখেন। একজন জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে প্রায় ২৫০ ছবিতে অভিনয় করে গেছেন কবরী।
অঞ্জনা রহমান
অঞ্জনা রহমান ১৯৬৫ সালের ২৭ জুন ঢাকার ঢাকা ব্যাংক কোয়ার্টারে এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে নৃত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহের কারণে বাবা-মা তাঁকে নাচ শিখতে ভারতে পাঠান। সেখানে তিনি ওস্তাদ বাবুরাজ হীরালালের অধীনে নাচের তালিম নেন এবং কত্থক নৃত্য শিখেন। নৃত্যে তিনবার জাতীয় পুরস্কারও লাভ করেন। চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে তিনি একজন নামি নৃত্যশিল্পী ছিলেন। অঞ্জনার অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৭৬ সালে বাবুল চৌধুরী পরিচালিত সেতু চলচ্চিত্র দিয়ে। তবে তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত দস্যু বনহুর (১৯৭৬)। ছোটবেলা থেকে দেশ-বিদেশের নানা মঞ্চে নাচ করার আমন্ত্রণ পেতেন তিনি। ৯ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে নৃত্য পরিবেশন করতে গিয়ে নায়ক সোহেল রানার দৃষ্টি কাড়েন। সে দিন খুদে নৃত্যশিল্পীকে শুভকামনা জানিয়েছিলেন নায়ক সোহেল রানা। ১৪ বছর বয়সে আবার এক অনুষ্ঠানে দেখা হয় সোহেল রানার সঙ্গে। তাঁকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন সোহেল রানা। এবং তাঁরা জুটি বেঁধে ‘দস্যু বনহুর’ ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর নিয়মিত অভিনয় করে যান অঞ্জনা।
শবনম
শৈশবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখেছিলেন ঝর্ণা দাস। (শবনম)। একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে তিনি সুপরিচিতি লাভ করেন। সেখানেই একটি নৃত্যের অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এহতেশাম তাঁর নাচ দেখে ‘এদেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের নৃত্যে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন।
এহতেশামের পাশাপাশি পরিচালক মুস্তাফিজেরও নজর কাড়তে সক্ষম হন অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে। মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শবনম। ওই ছবিতেই তিনি শবনম নাম ধারণ করেন। এরপর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ ছবিতে জনপ্রিয়তার সঙ্গে অভিনয় করেন।
শাবনূর
যশোরের শার্শায় জন্মগ্রহণকারী শাবনূর ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় স্কুল ও মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করতেন। বড় হয়ে নামি নৃত্যশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। তাই পারিবারিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় নূপুর (কাজী শারমিন নাহিদ নূপুর)। চলচ্চিত্রে আগমনের পরে পরিচালক এহতেশাম তাঁর নাম রাখেন শাবনূর।
শাবনূরের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে এহতেশাম পরিচালিত ‘চাঁদনী রাতে’ (১৯৯৩) চলচ্চিত্র দিয়ে। পরে সালমান শাহের সঙ্গে জুটি বেঁধে নায়িকা হিসেবে তিনি সফলতা লাভ করেন। প্রায় ২০০ ছবিতে অভিনয় করেন শাবনূর।
অঞ্জু ঘোষ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে অঞ্জু ঘোষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরার হয়ে যাত্রায় নৃত্য পরিবেশন করতেন ও গানও গাইতেন। ১৯৮২ সালে এফ কবীর চৌধুরী পরিচালিত ‘সওদাগর’ সিনেমার মাধ্যমে অঞ্জুর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে।
১৯৮৯ সালে অঞ্জু অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবিটি অবিশ্বাস্য রকমের ব্যবসা করে এবং সৃষ্টি করে নতুন রেকর্ড। চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে অঞ্জু ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই অভিনেত্রী ঢাকা ও কলকাতায় প্রায় ৩০০ ছবিতে অভিনয় করেন।
অপু বিশ্বাস
বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণকারী অপু বিশ্বাস বাবা-মায়ের উৎসাহে নাচ শিখতে শুরু করেন বগুড়ার নৃত্যগুরু আবদুস সামাদের কাছে। এ সময় তিনি লাইলী-মজনু নৃত্যনাট্যে অভিনয় করে সবার দৃষ্টি কাড়েন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক নৃত্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে এবং সর্বশেষ নৃত্যাঞ্চল থেকে নাচের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন নৃত্যাঞ্চল কর্তৃক আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় দশম স্থান অর্জন করেন। এরপর ২০০৫ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কাল সকালে’ ছবিতে একস্ট্রা হিসেবে অভিনয় করেন। ২০০৬ সালে এফ আই মানিক পরিচালিত ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ তাঁর। এখনো তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন।