শিরোনাম
বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ টা

লড়াই জমেছে নৌকা-ধানের শীষে

গোলাম রাব্বানী

লড়াই জমেছে নৌকা-ধানের শীষে

নির্বাচনী মাঠে জমেছে নৌকা-ধানের শীষের লড়াই। পৌষের শীতল হাওয়া উপেক্ষা করে জমজমাট প্রচারণা চলছে পৌর এলাকায়। নির্বাচনী উৎসব বিরাজ করছে পৌরসভার হাট-বাজারে। প্রথমবারের মতো পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনেকটা জাতীয় নির্বাচনে রূপ নিয়েছে। প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজের চেয়ে দলীয় প্রতীকই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দলের লড়াইয়ে মূল অস্ত্র দলীয় প্রতীক নৌকা-ধানের শীষ। এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের মর্যাদার লড়াই আর বিএনপির জন্য মরণ কামড় হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। চায়ের আড্ডা থেকে রাজপথ, সর্বত্র চলছে নির্বাচনী আলাপ-আলোচনা। চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে। বিজয় উৎসব করবে কারা— আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপি? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। তবে জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দুই দলের প্রার্থীরাই।

এদিকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে রাত-দিন একাকার করে ভোট প্রার্থনায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা। উন্নয়নের আশ্বাস আর স্বপ্নজাগানিয়া কথার ফুলঝুরি নিয়ে ভোটারদের মুখোমুখি হচ্ছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনী বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পরে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রতীক নৌকা-ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন পৌরসভার মেয়র প্রার্থীরা। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় ২৩৪ পৌরসভা নির্বাচনে ২০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও অধিকাংশ পৌরসভায় নৌকা-ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

এদিকে পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যদিও বিভিন্ন পৌরসভায় আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে রিটার্নিং অফিসারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ জন্য ইসি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারসহ মন্ত্রী-এমপিদেরও বার বার সতর্ক করছে। তবে ইসির কঠোরতার ওপরই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া-না হওয়া নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী ২৩৪ পৌরসভায় ৯২৩ জন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের ছয়জন মেয়র প্রার্থী জয়ী হওয়ায় নির্বাচনী লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের ২২৮ জন, ১০ পৌরসভায় প্রার্থী না থাকায় বিএনপির ২২২ জন, জাতীয় পার্টির ৭৩, স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী এবং জামায়াতসহ) ২৭১ এবং অন্যান্য ১২৫ জন মেয়র প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে আছেন। এ ছাড়া সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে লড়াইয়ে রয়েছেন আরও ১১ হাজারের বেশি প্রার্থী।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সারা দেশে প্রায় ১৮০ পৌরসভায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র প্রার্থীর মধ্যে। ঢাকা বিভাগে এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। তবে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে দুই দলের লড়াইটা একটু বেশিই হবে। চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জেএসএস প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। এ ছাড়া বাকি পৌরসভায় জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী-বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই হতে পারে।

ইসিসূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী মাঠে অন্যান্য দলের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৫৬, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের ২০, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির ১৭, জাতীয় পার্টি-জেপির ৬, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ৪, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ৭ জন প্রার্থী রয়েছেন এবার। আরও কয়েকটি দলের দু-তিন জন করে প্রার্থী আছেন নির্বাচনে।

জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ২০ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাপার প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। এ ক্ষেত্রে দিনাজপুরের ৫ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে লড়াই হবে। তবে দুটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা দলীয় প্রার্থীর প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া বীরগঞ্জ পৌরসভায় জামায়াত-বিএনপির প্রার্থী থাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীরা প্রায় সমান সমান অবস্থানে থাকলেও গোদাগাড়ী পৌরসভায় জামায়াত-বিএনপির আলাদা প্রার্থী থাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও ৯টি পৌরসভার মধ্যে ২-৩টিতে ভাগ বসাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সিরাজগঞ্জের ৬ পৌরসভায় হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে লড়াই। বাকিদের জামানত হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। পাবনার ৭ পৌরসভায় হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে লড়াই। খুলনা বিভাগের যশোরের ৬ পৌরসভায় বর্তমানে বিএনপির মেয়র থাকলেও এবারে নির্বাচনের চিত্র ভিন্ন। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে। তবে এসব পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিএনপি ৫ পৌরসভায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ৫ পৌরসভার মধ্যে সদরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির লড়াই হলেও বাকি ৪ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পৌরসভা রয়েছে বরিশাল জেলায়। তবে বরিশালে ৬ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী রয়েছে। বিএনপির একক প্রার্থী থাকলেও সব পৌরসভায় একাধিক গ্রুপ রয়েছে। গ্রুপিংয়ের কারণে নেতারা গা বাঁচিয়ে চলছেন। জোর প্রচারণায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা।

এদিকে সার্বিকভাবে ঢাকা বিভাগের পৌরসভায় আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের ৮ পৌরসভার মধ্যে বর্তমানে ৭টিতে আওয়ামী লীগের মেয়র রয়েছেন। এবারও তুলনামূলকভাবে আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। বিএনপির প্রার্থীরাও মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জামালপুরের ৫ পৌরসভায় হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোটযুদ্ধ। তবে দেওয়ানগঞ্জে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন (বিদ্রোহী প্রার্থী) স্থানীয় এমপির এক আত্মীয়। ময়মনসিংহের ৯ পৌরসভার মধ্যে ৭টিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। বাকি দুটিতে বিএনপির অবস্থান ভালো। কিশোরগঞ্জের ৭ পৌরসভায় মধ্যে ৩টিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে আওয়ামী লীগের। তবুও আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে লড়াই হতে পারে কিশোরগঞ্জের সব পৌরসভায়।

সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার ৩ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও বিএনপির সঙ্গে জামায়াত যোগ দিলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে। কানাইঘাট পৌরসভায় জামায়াতের প্রার্থীকে যদি বিএনপি সমর্থন দেয় তবে তারা বাকি দুই পৌরসভায় বিএনপির পক্ষে থাকতে পারে। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারেও আওয়ামী লীগ-বিএনপির লড়াই হবে।

চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাও রয়েছেন সর্বশক্তি নিয়ে। তবে নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা রয়েছে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ দুই পৌরসভায় মেয়র পদে দলীয় কোনো প্রার্থী নেই দলটির। তবুও জামায়াত সমর্থিতদের ভোটই ভাগ্য নির্ধারক হবে বিএনপির প্রার্থীর।

সর্বশেষ খবর