শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মার্চ, ২০১৭ ২২:৪৩

বিলাতের প্রবাসীরা সর্বপ্রথম পতাকা তুলেছিলেন

খন্দকার মোশাররফ হোসেন

বিলাতের প্রবাসীরা সর্বপ্রথম পতাকা তুলেছিলেন

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিলাতপ্রবাসী বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রচার ও দেশের ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহদানের কাজে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সেদিনের বিলাতপ্রবাসী বাংলাদেশিরা দলমতনির্বিশেষে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছাত্র, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী সম্প্রদায়ই ছিল উল্লেখযোগ্য। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিলাতের আন্দোলনে ও প্রচারকার্যে যেসব মহিলা নেত্রী ও কর্মী অবদান রেখেছেন তার বেশির ভাগই ছিলেন গৃহিণী; মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছিলেন ছাত্রী ও চাকরিজীবী। এই মুক্তিপাগল মানুষদের অবদানে মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। তারা সেখানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন থেকে শুরু করে কভেন্ট্রি সম্মেলন ও স্টিয়ারিং কমিটি গঠন, বাংলাদেশ ফান্ড গঠন, লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাস স্থাপন, ব্রিটিশ এমপি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা অর্জন পর্যন্ত সবকিছুই করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। অবশেষে তাদের যাবতীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবদান সফলতা লাভ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে। ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লন্ডনের ঐতিহাসিক হাইডপার্ক স্পিকার্স কর্নারে জনসভার আয়োজন করে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ। লন্ডন আওয়ামী লীগ, ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠনসহ হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি সেদিন এতে যোগ দেন। বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন শহর থেকে বাঙালিরা হাইডপার্ক কর্নারে সমবেত হয়ে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি গাউস খানের সভাপতিত্বে ওই জনসভার বেশির ভাগ বক্তাই সেদিন বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানান। এরপরই লন্ডন আওয়ামী লীগ ও ‘স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির’ নেতারা সেখানে বাংলাদেশের কাল্পনিক পতাকাটি উত্তোলন করেন।

যদিও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতারা এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখেন এবং সভার প্রস্তাবাবলিতে স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয় অস্পষ্ট রাখেন। এ বিষয়ে সেদিন তাদের বক্তব্য ছিল— ঢাকা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা না করে একটি আপস ফর্মুলা দেবেন। অতএব লন্ডনে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তা আত্মঘাতী হবে। এমনি একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে হাইডপার্কের সমাবেশ শেষ হয়েছিল। লন্ডনের বিপ্লবী প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পতাকা কী ধরনের হতে পারে তার একটা ধারণা বিরাজমান ছিল। সিরাজুল আলম খান, শেখ মণিসহ নিউক্লিয়ার্সের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে আগে থেকেই পতাকার ধরন সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা থাকায় তার নকশাটি করে দিয়েছিলাম। সবুজ, লাল ও সোনালি রঙের সমন্বয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পতাকা শোভা পাবে— এমন একটা ধারণার ওপর ভিত্তি করে সেদিনের পতাকাটির ডিজাইন করেছিলাম, যার পটভূমিতে ছিল সবুজ রং এবং একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে লাল সূর্য। আর লাল সূর্যের মধ্যভাগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে সোনালি আঁশ পাট এবং ছয় দফা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পাটের ছয়টি সোনালি পাতা ওই পতাকায় সন্নিবেশিত করা হয়েছিল। আমাদের অনুরোধে বিলাত থেকে তখনকার প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘জনমত’-এর সম্পাদক এ কে এম ওয়ালী আশরাফের স্ত্রী নিজের মেশিনে সেলাই করে সেই পতাকাটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ২৫ মার্চের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপটে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক মুজিবনগরে উত্তোলিত পতাকার গঠনরীতি বিলাতে প্রকাশিত হওয়ার পর ওই পতাকার গঠন পরিবর্তন করে লাল সূর্যের মাঝে দেশের ‘ম্যাপ’টি স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণাপূর্ব পর্যন্ত বিলাতের বাঙালিদের মধ্যে যে গ্রুপটি সবচেয়ে সোচ্চার ছিল তারা হলেন প্রগতিশীল ছাত্রকর্মী, লন্ডন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, ইয়থ ফেডারেশন, পূর্ব পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের কর্মী ও নেতৃবৃন্দ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব সংগঠনের কর্মী ও নেতারাই বিভিন্ন ‘অ্যাকশন কমিটি’র নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বাঙালিদের মুখপত্র হিসেবে জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘জনমত’ ও পূর্ব পাকিস্তানের লিবারেশন ফ্রন্টের মুখপত্র ‘বিদ্রোহী বাংলা’র মাধ্যমে আন্দোলনের খবরাখবর প্রবাসীদের মধ্যে প্রচার লাভ করত। ’৭১-এর ৭ মার্চ হাইডপার্কের জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও পতাকা উত্তোলন ছাড়াও পাকিস্তান স্টুডেন্ট হাউসে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শপথে ‘বেঙ্গল স্টুডেন্ট অ্যাকশন কমিটি’ গঠন করা হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণার পর বিলাতে বহু সংগ্রাম পরিষদ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ‘বেঙ্গল স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি’ স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই গঠিত প্রথম একটি সংগ্রাম কমিটি। পরবর্তীকালে অবশ্য এই সংগ্রাম কমিটির নামে কিছুটা রদবদল করে ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি ইন ইউকে’ রাখা হয়েছিল। দেশের ভিতরে স্বাধীনতা ঘোষণার পর ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি’ নাম গ্রহণ করে এবং কমিটিকে সম্প্রসারিত করে ২১ সদস্যবিশিষ্ট করা হয়। কমিটির কর্মকাণ্ড সমন্বয় ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনজন আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণার কিছুদিন পরে দুজন দেশে ফিরে যাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ সময় আমাকেই সংগঠনটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করতে হয়।


আপনার মন্তব্য