Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৫৪

ফ্রীডম পার্টির পাগলা মিজান যেভাবে আওয়ামী লীগের দাপুটে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্রীডম পার্টির পাগলা মিজান যেভাবে আওয়ামী লীগের দাপুটে

সত্তরের দশকে ঢাকায় এসে কাজ নেন হোটেল বয়ের। এরপর শুরু করেন ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি ও ছিনতাই। ফ্রীডম পার্টিতে নাম লেখানোর মাধ্যমে পা রাখেন রাজনীতিতে। মোহাম্মদপুর এলাকায় গড়ে তোলেন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী। জড়িয়ে পড়েন খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধে। ১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে দলবল নিয়ে হামলা চালান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বদলে ফেলেন নিজের নাম। ফ্রীডম পার্টি ছেড়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। পুলিশের খাতায় প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টাকারী সেই মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান পুলিশের নাকের ডগাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার নাম এখন হাবিবুর রহমান মিজান। মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্যের হোতা এই মিজান এখন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের প্রতাপশালী নেতা। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ একের পর এক বড় বড় অপরাধে জড়িয়েও অজ্ঞাত খুঁটির জোরে বরাবর পার পেয়ে গেছেন এই পাগলা মিজান। মহাজোট সরকারের আমলে মিজান বাহিনী ৩-৪শ কোটি টাকার শুধু টেন্ডারবাজিই করেছে। এ ছাড়া ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ মিজানের হাতে। স্থানীয়রা বলেন, খুনখারাবি পাগলা মিজানের বাঁ হাতের কাজ। এ কারণে এলাকায় কেউ তার ভয়ে কথা বলে না। ২০১৪ সালে মোহাম্মদপুর এলাকায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধ বীরমুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমেদ পাইন ও তার অসুস্থ স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে তুচ্ছ ঘটনায় শত শত মানুষের সামনে জুতাপেটা করে এই পাগলা মিজান। কেউ ভয়ে কথা বলেনি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা তার অপকর্মে সহযোগিতা করে। এ কারণে অপরাধ করেও তিনি পার পেয়ে যান। বর্তমানে চলমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও একাধিক খুনের মামলা কাঁধে নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার নামে মোহাম্মদপুর থানায় ১৯৯৬ সালে ইউনূস হত্যা, ২০১৬ সালে সাভার থানায় জোড়া হত্যা মামলা রয়েছে। গত সপ্তাহে জমি দখলকে কেন্দ্র করে একদল সন্ত্রাসী একটি রিয়েল এস্টেটের ৬ কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের একজনকে হত্যা করে লাশ তুরাগে ফেলে দেয়। এ হত্যাকান্ডেও হাবিবুর রহমান মিজানের নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর সংঘর্ষের নেপথ্যেও উঠে এসেছে হাবিবুর রহমান মিজানের নাম। জানা গেছে, মিজান ক্যাম্পের বিদ্যুৎ লাইন থেকে ক্যাম্প লাগোয়া কাঁচাবাজার ও মাছবাজারের তিন শতাধিক দোকানে অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করতেন। এ কারণেই বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর ঝামেলার সূত্রপাত।

এদিকে মাদক কারবার থেকে শুরু করে খুন-খারাবি পর্যন্ত নানা অপরাধে বার বার উঠে এসেছে এই মিজানের নাম। কয়েকবার জেলে গেলেও অল্প সময়েই ফের বেরিয়ে এসে ‘হাল ধরেছেন’ নিজের অপরাধ সাম্রাজ্যের। বর্তমানে ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন। সম্প্রতি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অনুসন্ধানে নেমে জানতে পারেন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের সম্পর্কের কথা। জানতে পারেন ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার অফিসে মিজান নিয়মিত অবস্থান করেন। বিষয়টি তারা সরকারের উচ্চ মহলে জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

যেভাবে পাগলা মিজানের উত্থান : জানা যায়, ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় আসেন মিজানুর রহমান। শুরুতে মিরপুরে হোটেল বয়ের কাজ নেন। এরপর মোহাম্মদপুর এলাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি শুরু করেন। চুরি করা সেই ঢাকনাই আবার বিক্রি করতেন সিটি করপোরেশনে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি খামারবাড়ি খেজুরবাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গেলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়ায় মসজিদের পাশে পুকুরে নেমে পড়েন। পুলিশ বার বার নির্দেশ দিলেও তিনি পুকুর থেকে উঠে আসেননি। কয়েক ঘণ্টা পর কোনো কাপড় ছাড়াই উঠে আসেন। এ কারণে পুলিশ তাকে ‘পাগলা’ আখ্যা দিয়ে ছেড়ে দেয়। তার নাম ছড়িয়ে পড়ে পাগলা মিজান হিসেবে। ওই বছরই ফ্রীডম পার্টিতে যোগ দেন। ফ্রীডম পার্টির সদস্য হিসেবে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে লিবিয়া যান। ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ নেত্রী রেজিয়া বেগমের খাবার লাথি মেরে ফেলে দিয়ে প্রথমবার আলোচনায় আসেন। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রীডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা চালায় একটি চক্র। তারা সেখানে গুলি করে এবং বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাড়ির ভিতর অবস্থান করছিলেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা চলে যায়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়। ১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৬ জনকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন। ১৯৯৫ সালে দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে তিনি মারা যান। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং এরও পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মিজানুর রহমান নিজের নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। ফ্রীডম পার্টি ছেড়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। তিনি এখন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা, আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গড়ে তুলেছেন বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য ও বিত্তের পাহাড়। সম্প্রতি কাউন্সিল হয়েছে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের। নতুন কমিটিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ পেতে যাচ্ছেন বলে গুঞ্জন।


আপনার মন্তব্য