টানা বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের হাওরে তলিয়ে গেছে একরের পর একর জমির পাকা ধান। কোথাও ভাসমান ধান কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা, আবার অনেক জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে এখন পর্যন্ত জেলায় প্রায় তিন হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে।
নদী ভরাট ও উজানের ঢলের কারণে সৃষ্ট এ জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। কেউ কেউ হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নেমে কষ্ট করে ধান কাটলেও অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছেন। পানির কারণে প্রয়োজনীয় শ্রমিকও মিলছে না। কোথাও শ্রমিক পাওয়া গেলে দিতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি মজুরি। ফলে লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচও উঠবেনা বলে আশঙ্কা তাদের।
কিশোরগঞ্জে আজ বুধবার বেলা ১২ টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবারও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জের নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আখতার ফারুক।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কলিমপুর গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে কলিমপুর হাওরের বেশিরভাগ জমির ধান তলিয়ে গেছে। জমিতে পানি জমে থাকায় হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে বাড়তি খরচে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে।
একই এলাকার কৃষক হযরত আলী বলেন, শিবপুর এলাকার খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। প্রশাসনকে আগে জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।
কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, ঋণ করে ধান চাষ করলেও ফসল ভালো হয়েছিল, কিন্তু পানিতে সব তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ পরিশোধের চিন্তায় অস্থির তিনি।
কৃষক রতন মিয়া বলেন, ঋণ নিয়ে ১০ একর জমিতে ধান চাষ করেছি, কিন্তু ফসল কাটতেই পারলাম না। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।
কৃষক এংরাজ মিয়া বলেন, পুরো ফসল পানির নিচে। পঁচে যাওয়া ধানও কেটে নিতে হচ্ছে, না হলে একেবারেই কিছু থাকতো না।
ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের কৃষক হারুন অর রশিদ জানান, কাকটেংগুর হাওরেও পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক জমির ধান এখনও কাটা হয়নি, ফলে এসব ফসল নিয়ে কৃষকদের আশা প্রায় শেষ।
কাকটেংগুর গ্রামের কৃষক ফেরদৌস মিয়া বলেন, সারাবছরের খোরাকের জন্য এক একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। হঠাৎ পানি বাড়ায় সব তলিয়ে গেছে। এখন ঋণের বোঝা আর সংসারের চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জানান, আজ বুধবার পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ তিন হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে। যত সময় যাচ্ছে আরো তলিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এখনো হাওরের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তবে টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগাম বন্যার ঝুঁকি এড়াতে ৮০ শতাংশ পাকলেই ধান কেটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ