ঢাকাই চলচ্চিত্রের বয়স এখন প্রায় ৯৮ বছর। ১৯৫৬ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। তবে তারও আগে ১৯২৮ সালে প্রথম নির্বাক ছবি নির্মাণ করা হয়েছে এখানে। এই দীর্ঘ সময়ে নায়িকা হিসেবে এসেছে অনেক মিষ্টি মুখ। কিন্তু প্রথম নায়িকা এবং পরে যাঁরা এসেছেন তাঁদের অভিষেক হয় কীভাবে। সে কথাই তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
লোলিতা (দ্য লাস্ট কিস)
১৯২৯ সালে ঢাকায় প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’ নির্মিত হয়। অবশ্য তার কিছুদিন আগে ১৯২৮ সালে ‘সুকুমারী’ নামে চার রিলের স্বল্পদৈর্ঘ্যর একটি টেস্ট ফিল্ম নির্মিত হয়। সে সময় শৈল্পিক তাগিদে ঢাকার নওয়াব পরিবারের কয়েকজন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহী হয়েছিলেন অপেশাদারি মনোভাব নিয়ে। তাঁদের মধ্যে খাজা জহির, খাজা আজাদ, সৈয়দ সাহেব আলম প্রমুখের নাম স্মরণযোগ্য। সে সময় সামাজিক ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো মেয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে সম্মত হতো না। তাই পুরুষদেরই নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করতে হতো। এমনই একজন হলেন সৈয়দ আবদুস সোবহান। ‘সুকুমারী’ ছবিতে তিনি নারী সেজে অভিনয় করেন। এটি নওয়াব পরিবারে ঘরোয়াভাবে প্রদর্শিত হয়। এরপর নবাব পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বাক ছবি ‘দ্য লাস্ট কিস’ নির্মিত হয়। ১৯৩১ সালের শেষের দিকে মুকুল টকিজে (বর্তমানে পুরান ঢাকার আজাদ সিনেমা হল) মুক্তি পেয়েছিল। রক্ষণশীল সমাজের ভদ্রঘরের মেয়েদের জন্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করাটা যেহেতু ছিল গর্হিত কাজ, তাই সে সময় নায়িকা লোলিতাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ঢাকার বাদামতলীর পতিতালয় থেকে। মেয়েটির আসল নাম ছিল বুড়ি। ছবির নায়ক ছিলেন খাজা আজমল। চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষ হলে মেয়েটি আবার তার আগের পেশায় ফিরে যায়। একই ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য অন্য দুটি মেয়ে দেবমালা ও হীরামতিকেও পতিতালয় থেকে আনা হয়।
পূর্ণিমা সেনগুপ্তা, জহরত আরা ও পিয়ারী বেগম (মুখ ও মুখোশ)
১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’। খ্যাতিমান পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই এ ছবির নির্মাতা ও নায়ক ছিলেন। নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন চট্টগ্রামের রঙ্গনাট্য দলের অভিনেত্রী পূর্র্ণিমা সেনগুপ্তা। সেদিনের রক্ষণশীলতাকে উপেক্ষা করে সহ-নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্রী জহরত আরা এবং ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী পিয়ারী বেগম ওরফে নাজমা। মূলত ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পরেই এ দেশে ধারাবাহিকভাবে কাহিনিচিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সুমিতা দেবী (আসিয়া)
১৯৬০ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত ‘আসিয়া’ ছবির মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে অভিষেক হয় সুমিতা দেবীর। সুমিতা দেবীর আসল নাম হেনা লাহিড়ী। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের বেশ কটি ছবির নায়িকা ছিলেন তিনি। এই গুণী অভিনেত্রী প্রায় দেড় শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন।
শবনম (হারানো দিন)
১৯৬১ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মুস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে এই নির্মাতার ‘হারানো দিন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আসেন শবনম। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক ছবিতে জনপ্রিয়তার সঙ্গে অভিনয় করেন শবনম। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া কাজী হায়াত পরিচালিত ‘আম্মাজান’।
সুচন্দা (কাগজের নৌকা)
মেধাবী নির্মাতা জহির রায়হানের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন সুচন্দা। সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘কাগজের নৌকা’ ছবিতে তিনি প্রথমে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন। সেখান থেকেই জহির রায়হানের নজরে পড়েন। ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান ‘বেহুলা’ ছবিতে সুচন্দাকে নাম ভূমিকায় কাস্ট করেন। ছবিটা ব্যবসাসফল হয়।
কবরী (সুতরাং)
বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে কবরী চলচ্চিত্রে আসেন ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ ছবির মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে আসার আগে চট্টগ্রামের এই মিষ্টি মেয়ের আসল নাম ছিল মীনা পাল।
বাংলা ছবির সোনালি সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই নায়িকা প্রয়াত অভিনেতা ও পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘সারেং বৌ’ ছবিতে ‘নবীতুন’ চরিত্রে অভিনয় করে অর্জন করেছিলেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
শাবানা (নতুন সুর)
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকার মধ্যে অন্যতম শাবানা। মাত্র ৯ বছর বয়সে রত্না নামে ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে তিনি অভিনয় জীবন শুরু করেন। শিশু শিল্পী হিসেবে তাঁকে দেখা যায়, ‘ডাকবাবু’ ও ‘তালাশ’ ছবিতেও। প্র্রখ্যাত নির্মাতা এহতেশামের ‘চকোরী’ ছবির মাধ্যম নায়িকা হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। রত্না নাম পাল্টে রাখা হয় শাবানা। ঢাকার ছবিতে প্রায় ৩০ বছর ধরে শাবানা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়িকা। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে অভিনয় থেকে অবসর নেন তিনি।
ববিতা (সংসার)
বাংলা সিনেমার আরেক সুপারস্টার হিরোইন ববিতা। আসল নাম ফরিদা আখতার আর ডাকনাম পপি। ১৯৬৮ সালে সিনে ওয়ার্কশপের ব্যানারে নির্মিত ‘সংসার’ ছবির মাধ্যমে প্রথমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন তিনি।
বড় বোন সুচন্দাই তাঁকে চিত্রজগতে নিয়ে আসেন। জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়েই তাঁর নাম ববিতা হয়ে যায়। আর নায়িকা হিসেবে তাঁর উত্থান ঘটে ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির মাধ্যমে। ১৯৭০ থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথম পর্যন্ত শতাধিক ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন ববিতা। যার বেশির ভাগ ছবিই ছিল ব্যবসাসফল। দেশে-বিদেশে অর্ধশতাধিক পুরস্কারে
ভূষিত হয়েছেন চিরসবুজ এই অভিনেত্রী।
অলিভিয়া (ছন্দ হারিয়ে গেলো)
সত্তরের দশকের আরেক আলোচিত নায়িকা হলেন অলিভিয়া। তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি ১৯৭২ সালে এস এম শফী নির্মিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেলো’। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হলো-
‘দি রেইন’, ‘মাসুদ রানা’, ‘যাদুর বাঁশি’, ‘লুটেরা’, ‘বে-দ্বীন’, ‘বাহাদুর’, ‘চক্কর’ প্রভৃতি। তবে অলিভিয়া ১৯৯৪ সালে নিজেকে রুপালি পর্দা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
সুচরিতা (বাবুল)
টিনএজ ইমেজ নিয়ে রুপালি পর্দায় হাজির হয়েছিলেন এক মিষ্টি মেয়ে, নাম বেবী হেলেন। শিশু শিল্পী হিসেবে প্রথম অভিনয় ‘বাবুল’ ছবিতে ১৯৬৯ সালে। নায়িকা হিসেবে ১৯৭২ সালে ‘স্বীকৃতি’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর প্রায় ১০০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। সুচরিতা সফল হয়েছিলেন বলেই তিনি আজও এত জনপ্রিয়।
রোজিনা (জানোয়ার)
রোজিনা চলচ্চিত্রে আসেন ১৯৭৬ সালে ‘জানোয়ার’ ছবির মাধ্যমে। তাঁর অভিনীত ছবি হলো- ‘হারানো মানিক’, ‘রাজমহল’, ‘অভিমান’, ‘চোখের মণি’, ‘রসের বাঈদানী’, ‘সংঘর্ষ’, ‘পরদেশী’, ‘সোহাগ মিলন’, ‘তাসের ঘর’, ‘দুলারী’, ‘আঘাত’, ‘শত্রু’, ‘জীবনধারা’ প্রভৃতি।
অঞ্জু ঘোষ (সওদাগর)
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার মেয়ে অঞ্জু ঘোষ চলচ্চিত্রে আসেন ১৯৮২ সালে নির্মাতা এফ কবির চৌধুরীর হাত ধরে ‘সওদাগর’ ছবির মাধ্যমে। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অঞ্জু ঘোষ রাতারাতি তারকা খ্যাতি অর্জন করেন। এপার-ওপার বাংলায় ছবিটি ব্যবসাসফল হয়। তাঁর অভিনীত এই ছবিটিকেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া অঞ্জু ঘোষ অভিনয় করেছেন ‘খেলার সাথী’, ‘পদ্মাবতী’, ‘কোরবানী’, ‘সতী নাগকন্যা’, ‘আশীর্বাদ’ প্রভৃতি ছবিতে।
দিতি (আমিই ওস্তাদ)
১৯৮৪ সালের এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে আসেন নায়িকা পারভীন সুলতানা দিতি। তাঁর প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি আজমল হুদা মিঠুর ‘আমিই ওস্তাদ’। তিনি অল্প সময়েই বেশ সুনাম অর্জন করেন। ইলিয়াস কাঞ্চন ও সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে দিতি বেশ কিছু ভালো ছবি উপহার দেন।
চম্পা (তিন কন্যা)
বড় দুই বোন সুচন্দা ও ববিতার পথ ধরে চলচ্চিত্রে আসেন চম্পা। ১৯৮৬ সালে সুচন্দা পরিচালিত ‘তিন কন্যা’ ছবির মাধ্যমে সিনেমায় আসেন তিনি এবং জনপ্রিয়তাও পান খুবই অল্প সময়ে।
চম্পা ঢালিউডের সিনেমায় ব্যাপক সফল নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এ দেশে যে কজন হাতেগোনা শিল্পীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে; চম্পা তাঁদের অন্যতম।
শাবনাজ (চাঁদনী)
১৯৯১ সালে পরিচালক এহতেশাম চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন নায়িকা শাবনাজকে ‘চাঁদনী’ ছবির মাধ্যমে। প্রায় অর্ধশত ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৯৪ সালে সহ-অভিনেতা নাঈমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদায় জানিয়ে দেন রুপালি জগৎকে।
মৌসুমী (কেয়ামত থেকে কেয়ামত)
পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে মৌসুমীকে রুপালি পর্দায় নিয়ে আসেন। মৌসুমী অল্প সময়ে চলচ্চিত্রে নিজেকে নিয়ে যান জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
শাবনূর (চাঁদনী রাতে)
শাবনূর চলচ্চিত্রে আসেন প্রখ্যাত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে ১৯৯৩ সালে ‘চাঁদনী রাতে’ ছবির মাধ্যমে। শাবনূর তাঁর যোগ্যতা ও মেধাগুণে নিজেকে ঢালিউডের এক নম্বর নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পপি (কুলি)
পপি চলচ্চিত্রে আসেন ১৯৯৭ সালে নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত ‘কুলি’ ছবির মাধ্যমে। পপি অভিনীত আলোচিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘দরদী’, ‘কারাগার’, ‘পাহারাদার’, ‘মায়ের স্বপ্ন’, ‘জিদ্দি’, ‘মা আমার বেহেশত’, ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’, ‘গঙ্গাযাত্রা’, ‘মেঘের কোলে রোদ’ প্রভৃতি।
পূর্ণিমা (এ জীবন তোমার আমার)
১৯৯৭ সালে জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘এ জীবন তোমার আমার’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন চট্টগ্রামের মিষ্টি মেয়ে পূর্ণিমা। অল্প সময়েই তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পূর্ণিমা অভিনীত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘তুমি শুধু আমার’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘মনের মাঝে তুমি’, ‘ক্ষমতার গরম’, ‘হৃদয়ের কথা’ প্রভৃতি। মাঝখানে বিয়ে এবং সাংসারিক কাজে ব্যস্ততার জন্য অভিনয় থেকে দূরে সরে যান। এখন অনিয়মিত কাজ করছেন।
অন্যান্য
এ ছাড়াও ঢাকাই চলচ্চিত্রে বেশ কিছুসংখ্যক নবাগত নায়িকার অভিষেক হয়েছে। তাঁরাও তাদের যোগ্যতা ও ভালো কাজের মাধ্যমে প্রথম সারির নায়িকা হিসেবে পরিচিতি পান। এদের মধ্যে রয়েছেন অপু বিশ্বাস, বুবলী, নিপুণ, জনা, রেসি, বিন্দু, মিমো, শখ, মিম, পূজা চেরী প্রমুখ।