শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জুন, ২০১৯ ২৩:০১

যত উদ্বেগ নিখোঁজ-বিদেশে পলাতকদের নিয়ে

জঙ্গিবাদ

সাখাওয়াত কাওসার

যত উদ্বেগ নিখোঁজ-বিদেশে পলাতকদের নিয়ে

বিদেশে থাকা পলাতক জঙ্গিদের নিয়েই যত উদ্বেগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের। তবে নিখোঁজদের নিয়েও উৎকণ্ঠা কম নয় গোয়েন্দাদের। নিখোঁজের কারণ বের করার আগ পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নাওয়া-খাওয়া অনেকটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী, উগ্রবাদে জড়িত হয়ে দেশ ছাড়া ব্যক্তির সংখ্যা ২০-২৫ জন বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা অর্ধশতাধিক হবে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। তবে এই তালিকায় বাংলাদেশি বংশো™ভূত ভিনদেশি নাগরিকরাও রয়েছেন। তাদের দেশে ফেরা ঠেকাতে বিমান, সমুদ্র এবং সব স্থলবন্দরে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, জঙ্গিবাদ ঠেকাতে সরকারের নানা উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে পালন করা হচ্ছে ‘নাগরিক তথ্য সংগ্রহ সপ্তাহ’। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবীদের মধ্যে নেওয়া হয়েছে সফট অ্যাপ্রোচের প্রোগ্রাম। তবে রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে জঙ্গিদের একটি অংশ অতি গোপনে নীরব তৎপরতা চালাচ্ছে এমন খবর একাধিক সূত্রের।

জানা গেছে, গত বছরের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রাম থেকে সাদনান সৌমিক নামের এমআইএসটি থেকে পাস করা এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হন। জঙ্গিবাদে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি এপ্রিল মাসে সাদ্দাম হোসেন নামে এক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে সিলেটে গত তিন মাসের ব্যবধানে তিন যুবকের সন্ধান মিলছে না বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। নিখোঁজদের বেশির ভাগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সন্দেহজনক। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই উগ্রবাদের উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়েছেন।

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বিস্তারে অনেক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে নিখোঁজ হওয়া একটি। তবে আমরা আমাদের কাজটি করে যাচ্ছি। এর মধ্যে অনেক সফলতাও এসেছে। জঙ্গিবাদ রুখতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপকমিশনার মুহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘জঙ্গিবাদ রুখতে সফট্ অ্যাপ্রোচের সঙ্গে আমাদের কিছু রুটিনওয়ার্ক চলছে। তবে নিখোঁজ সবাই যে জঙ্গিবাদের কারণে তা কিন্তু ঠিক নয়। সিলেটের নিখোঁজগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জঙ্গিবাদে জড়িত হয়ে কতজন দেশ ছেড়েছেন এর সঠিক হিসাব নেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ধারণা করেন, এ সংখ্যা বিশের বেশি নয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। এদের নিয়েই যত উদ্বেগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। বিশেষ করে সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার চার্চে হামলার পর থেকে এই আতঙ্ক কাজ করছে তাদের মধ্যে। তদন্তে উঠে এসেছে আইএসের হয়ে ইরাক-সিরিয়ায় অংশ নেওয়া শ্রীলঙ্কান নাগরিকরাই এই হামলায় অংশ নিয়েছেন কিংবা নেপথ্যে মদদ দিয়েছেন। সিটিটিসি সূত্র বলছে, জঙ্গিবাদে জড়িত হয়ে দেশ ছেড়েছেন ২০ জনের মতো। তবে এদের বেশির ভাগই নিহত হয়েছেন। এখনো যারা ইরাক কিংবা সিরিয়ায় আছেন, তারা যাতে কোনোভাবেই দেশে প্রবেশ না করতে পারেন সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের নামের তালিকা ইমিগ্রেশন পয়েন্টগুলোতে দেওয়া আছে। তাদের ব্ল্যাক লিস্টেড করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন পুলিশও এ বিষয়ে সতর্ক। এরই মধ্যে গাজী কামরুল ইসলাম ওরফে সোহানকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। সর্বশেষ ৫ মে আইএসের হয়ে সিরিয়ার যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৌদি বংশো™ভূত বাংলাদেশি নাগরিক মুতাজ আবদুল মজিদ কফিল উদ্দিন বেপারি ওরফে মুতাজকে (৩৩) গ্রেফতার করেছে সিটিটিসি। বর্তমানে তাদের দুজনই কারাগারে। সূত্র আরও বলছে, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে অতি গোপনে কর্মকারাহিঙ্গাদের দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তাদের জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত করতে চলছে নানা কর্মকা । র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস্্) কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দেখুন’ আমরাই প্রথম পবিত্র কোরআনের অপব্যাখ্যার বিষয়টি তুলে এনেছিলাম। র‌্যাবের পক্ষ থেকে একটি বুকলেট প্রকাশ করেছিলাম। শিগগিরই আমরা প্রতিটি ব্যাটালিয়নের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করতে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে এটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের শেষ দিকে ‘এক্স-ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরাম’ নামে একটি গ্রুপ ইরাক-সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে বাংলাদেশি তরুণদের দেশগুলোতে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। ফেসবুকভিত্তিক এই গ্রুপটির অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক নওমুসলিম সাইফুল্লাহ ও’জাকি ওরফে সুজিত দেবনাথ। তার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আমিনুল ইসলাম বেগ, সাকিব বিন কামাল, জুন্নুন শিকদার, নজিবুল্লাহ আনসারী, আসাদুল্লাহ গালিব, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এটিএম তাজউদ্দিনসহ ২০-২৫ জনের একটি দল ছিল। সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করা ও পরবর্তীতে  সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডোর সদস্য থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর  নেওয়া মুহিব জাপানে গিয়ে নিখোঁজ হন। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি ওজাকি যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন তার প্ররোচনায় গাজী সোহান ও নজিবুল্লাহ আনসারী সিরিয়া গিয়েছিলেন। সিরিয়ায় অবস্থানকারী বাংলাদেশির মধ্যে ধানমন্ডির বাসিন্দা জুবায়েদুর রহিম দেশত্যাগ করেন ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি। তিনি ঢাকার ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে পড়াশোনা শেষে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে পড়তেন। ওই বছরেরই ৫ নভেম্বর ডা. আরাফাত হোসেন তুষার ইস্তাম্বুল হয়ে সিরিয়ায় যান। ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় যান তাহিমদ রহমান সাফি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে থাকা জঙ্গি জুন্নুন শিকদার দেশ ছাড়েন ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিরিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন ইব্রাহীম হাসান খান। সঙ্গে তার ভাই জুনায়েদ হাসান খানও  দেশ ছেড়ে সিরিয়ায় চলে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০১৫ সালের কোনো এক সময় সিরিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন কলাবাগানের বাসিন্দা আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম ও আসাদুল্লাহ গালিব। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এটিএম তাজউদ্দিন ঢাকা থেকে সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যান। এরপর  থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা ডা. রোকন উদ্দিন খন্দকার, তার স্ত্রী নাঈমা আক্তার ও দুই মেয়ে রেজোয়ানা রোকন, রমিতা রোকন এবং জামাতা সাদ কায়েস সিরিয়ার উদ্দেশে ২০১৫ সালের ১০ জুলাই  দেশ ছেড়ে যান। প্রায় একই সময়ে স্ত্রী রিদিতা রাহেলা ও শিশুসন্তানকে নিয়ে সৌদি হয়ে সিরিয়ায় চলে যান ব্যারিস্টার এ কে এম তাকিউর রহমান। ঢাকার কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা দুই ভাই মাইনউদ্দিন শরীফ ও রেজোয়ান শরীফ পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়ায় চলে গেছেন বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা। এ  ছাড়া আলামিন মোল্যা, সফিউল আলম, মেহেদী হাসান, শাহরিয়ার খান ওরফে শাজাহান, মাকসুদ ও এমদাদুল হক বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। এর বাইরে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে লন্ডন থেকে সিলেটে ফিরে  মোহাম্মদ আবদুল মান্নান নামে এক ব্যক্তি স্ত্রী মিনারা খাতুন, মেয়ে রাজিয়া খানম, ছেলে মোহাম্মদ জায়েদ হোসেন ও তৌফিক  হোসেন; আবুল কাশেম ও তার স্ত্রী সাইদা খান এবং ছালেহ  হোসাইন স্ত্রী রোশনারা বেগম তাদের তিন শিশুসন্তানসহ ১২ জন একসঙ্গে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় চলে যান।

ইরাক-সিরিয়ায় গিয়ে নিহত যারা : আমেরিকার বিমান হামলায় সিরিয়ার রাক্কায় লন্ডন প্রবাসী সাইফুল ইসলাম সুজনের মৃত্যুর পর আরও কিছু বাংলাদেশির নাম প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক সেনা কর্মকর্তার ছেলে আশিকুর রহমান জিলানীর নাম রয়েছে। আইএসের মুখপত্র ‘দাবিক’-এর ১৪তম সংখ্যায় জিলানীকে আবু জান্দাল আল বাঙালি নামে পরিচয় দিয়ে তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়। ২০১৫ সালের ৫ জুন ইস্তাম্বুল হয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা নিয়াজ  মোর্শেদ। ওই বছরের শেষের দিকে অক্টোবরে যুদ্ধরত অবস্থায় মারা যান আবু মরিয়াম আল বাঙালি নাম নেওয়া এক যুবক। বাংলাদেশ থেকে সাইপ্রাস গিয়েছিলেন তাজ রহমান নামে আরেক যুবক। পরবর্তীতে তাজের একটি ছবিসহ তার নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করে আত-তামকিন মিডিয়া। এর বাইরে ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল আবু দুজানা আল বাঙালি নামে এক যুবকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে আত-তামকিন মিডিয়া।


আপনার মন্তব্য